মেইন ম্যেনু

খরস্রোতা তিস্তা এখন ধু-ধু বালুচর

উজানে গজলডোবা ব্যারেজের মাধ্যমে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়। এ বছরেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

এ সময় তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট বন্ধ করে রেখেও প্রধান খালে নেওয়ার মতো পানি মেইনহেড রেগুলেটরে পাওয়া যায় না। ফলে প্রতি বছর প্রকল্প এলাকা কমিয়েও স্বাভাবিকভাবে সেচ কার্যক্রম চালাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ ।

১৯৭৯ সালে দেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। মূল নদী থেকে পানি নিয়ে ক্যানেলের মাধ্যমে মরুময় উত্তরের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুরসহ ৫ জেলার ৩৫টি উপজেলার ৫ লক্ষ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করাই ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এ জন্য নীলফামারী জেলার ডালিয়ায় তিস্তা নদীর উপর নির্মাণ করা হয় তিস্তা ব্যারেজ।

এক সময়ের প্রমত্তা তিস্তা এ বছর জানুয়ারি মাস থেকে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তিস্তার পানি প্রায় শূন্যের কোটায় নেমেছে। সামান্য কিছু এলাকায় হাঁটু পানি থাকলেও বেশিরভাগ এলাকায় পানিশূন্যতা বিরাজ করছে।

খরস্রোতা তিস্তা এবার ভয়াবহ পানি সংকটে পড়েছে। পানি স্বল্পতার কারণে সেচ সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে রংপুর ও দিনাজপুর জেলাকে। ফলে দুই জেলার ৫৭ হাজার হেক্টর জমি সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এবার তিস্তার পানি দিয়ে সেচ দেওয়া সম্ভব নয়। চলতি বোরো মৌসুমে নিজস্ব ব্যবস্থ্যাপনায় কৃষকদের সেচ দিতে হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।

চলতি খরিপ-১ মৌসুমে (বোরো) দেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে রবিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে। দুই সপ্তাহ আগেও তিস্তায় পানি ছিল ২ হাজার কিউসেকের মতো। সেটা গত সোমবারে নেমে ৭শ’ কিউসেকে দাঁড়িয়েছে। ফলে তিস্তা এখন ধু-ধু বালুচর।

২০১৪ সালে বোরো মৌসুমে নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেচ দেওয়া হয় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে তা আরও কমে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হয়। এবার আরও কমে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলের ৫৭ হাজার হেক্টর জমি সেচ কার্যক্রম বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নীলফামারী, ডিমলা, জলঢাকা ও কিশোরগঞ্জ উপজেলাকে সেচের আওতায় রাখা হয়েছে। এরমধ্যে নীলফামারী সদরে ৮ শত হেক্টর, ডিমলায় ৫ হাজার, জলঢাকায় ২ হাজার ও কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ২শত হেক্টর জমি। তবে উজান থেকে পানি পাওয়া গেলে সেচের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে বলে জানিয়েছেন ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ।

ব্যারেজের সেচ প্রকল্পের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী জানান, চলতি রবি ও খরিপ-১ মৌসুমে শুরুতে সেচ দেওয়া হয়েছে জলঢাকা উপজেলার হরিশচন্দ্র পাট এলাকায়। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে লক্ষমাত্রা অনুযায়ী সেচ প্রদানের চেষ্টা করা হবে। উজানের পানি দিন দিন কমে আসায় তিস্তা নদীর পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে তিস্তা ব্যারেজের কমান্ড এলাকায় সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। সেখানে কৃষকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেচ দিতে হবে।

শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি প্রবাহ ধরে রাখতে তিস্তা ব্যারেজের সেচ প্রকল্পের জন্য ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন। কিন্ত সেচের জন্য পাওয়া যাচ্ছে ৭ থেকে ৮ শত কিউসেক পানি। আগামীতে পানি প্রবাহের পরিমাণ আরও কমবে বলেও তিনি জানান।

ডালিয়া ব্যারেজের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পানি স্বল্পতার কারণে রংপুর-দিনাজপুর জেলায় সেচ দেওয়া সম্ভব নয়। পানি প্রবাহ বাড়লে সেচ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেচের আওতা বাড়তে পারে।

তিস্তা অববাহিকায় প্রায় সারে ৫ হাজার গ্রামের মানুষ তাদের জীবিকার জন্য এই নদীর উপর নির্ভরশীল। তাই তিস্তার পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকায় নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।

শুকনো সময়ে যে সামান্য পরিমাণ পানি ভারতের প্রত্যাহারের পর পাওয়া যায় তার সবটুকুই সেচ চাহিদা মেটানোর লক্ষে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের সেচ খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হয়। এ কারণে ডালিয়া পয়েন্টে ৯৭ কিলোমিটার বিস্তৃত তিস্তা নদীতে ১ কিউসেক পানিও থাকছে না। যার ফলে তিস্তা অববাহিকার এই বিশাল পরিমাণ নদীগর্ভ পরিণত হচ্ছে ধু-ধু বালুচরে।






মন্তব্য চালু নেই