মেইন ম্যেনু

সমাজসেবক জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান

মোঃ বদরুজ্জামান, বিশেষ প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা : আগামীকাল ১ আগস্ট প্রবাদ প্রতীম শিশু চিকিৎসক, শিশুবন্ধু, সমাজ হিতৈষী, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসাক্ষেত্রে দক্ষ প্রশাসক, চিকিৎসা-শিল্প উদ্যোক্তা, সদালাপী, সদা সংস্কার মনস্ক এবং সমাজসেবায় একুশে পদক প্রাপ্ত জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রফি খান ( যিনি এম আর খান হিসেবে অতি পরিচিত) এর আটাশিতম জন্ম জয়ন্তী । এ সুবাদে তাঁকে আমাদের সকলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন- জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শিশুরা দেশ ও জাতির ভবিষ্যত। মানুষের সৃজনশীল সম্ভাবনার সত্ত্বা তাকে পুষ্টি দিয়ে মননশীল করে সুচিকিৎসা দিয়ে সুস্থভাবে বড় হবার সুযোগ দিতে হবে- এ সুযোগলাভ তার অধিকার। ডা. এম আর খান শিশু চিকিৎসার ওপর বিদেশে বড় ডিগ্রি অর্জন করে সেখানে উচুঁ মাপের চাকুরীর সুযোগ ও সুবিধা পরিত্যাগ করে চলে এসেছেন নিজ দেশে। দেশে শিশু চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় অবতীর্ণ হয়েছেন পথিকৃতের ভূমিকায়। কর্মজীবনে ডা. এম আর খান দেশে-বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার কেন্ট এবং এডিনবার্গ গ্র“প হাসপাতালে যথাক্রমে সহকারী রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রার হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তারপর দেশে ফিরে ১৯৬৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তিনি সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেন।

১৯৬৪ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (শিশুস্বাস্থ্য) পদে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগে যোগদান করেন এবং এক বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৭০ সালে তিনি অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন এণ্ড রিসার্চ বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এর অধ্যাপক ও ১৯৭৩ সালে এই ইনস্টিটিউটের যুগ্ম-পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

১৯৭৮ সালের নভেম্বরে ডা. খান ঢাকা শিশু হাসপাতালে অধ্যাপক ও পরিচালকের পদে যোগদান করেন। একই বছর অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে পুনরায় তিনি বিএসএমএমইউ-এর শিশু বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং দক্ষতা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালে অধ্যাপক (ডা.) এম আর খান তাঁর সুদীর্ঘ চাকুরী জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

সরকারী চাকুরী হতে অবসর নিলেও তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবরে বিভিন্ন সময়ে পেশা ভিত্তিক কর্মকাণ্ড ও সেবা সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে অধ্যাপক (ডা.) এম আর খান নিজেকে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত রেখেছেন। তিনি দেশে-বিদেশে উল্লেখযোগ্য মেডিকেল কলেজের উচ্চতর ডিগ্রী/সম্মান প্রদানের ক্ষেত্রে পরীক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন।

বাংলাদেশ শিশু স্বাস্থ্যের ওপর এফসিপিএস, ডিসিএইচ এবং এমসিপিএস ডিগ্রী পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে অধ্যাপক (ডা.) এম আর খান গুরু দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া নভেম্বর’৮৮ থেকে অদ্যবধি বিএসএমএমইউ-এর ভিজিটিং প্রফেসর, জুন’৮৯ থেকে আইসিডিডিআর’বি এর সিনিয়র ভিজিটিং প্রফেসর, আগস্ট’৮৯ থেকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ এবং জানুয়ারি ১৯৯১ থেকে অদ্যাবধি বারডেম এর অনারারি উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সময় সচেতন অধ্যাপক (ডা.) এম আর খান তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ব্যয় করেছেন গুরুত্বপূর্ণ কাজে। বিএসএমএমইউ-এ পেডিয়াট্রিক শিক্ষায় পোস্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রী চালুর ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অন্যদিকে ১৯৭৮ সালে ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও তাঁর ছিলো অনন্য ভূমিকা। এ হাসপাতালে তিনি নতুন নতুন ইউনিট খোলেন যেমন আউটডোর, প্যাথোলজি, রেডিওলজি ডিপার্টমেন্ট, পেয়িং ইউনিট, ইউনেটোলজি এন্ড নিউট্রিশন ইউনিট ইত্যাদি স্থাপনসহ বেডের সংখ্যা ১৫০ থেকে ২১৫-এ উন্নীত করেন। তিনি বিএসএমএমইউ-এ পেডিয়াট্রিক পোস্টগ্রাজুয়েট কোর্স চালু করেন।

১৯৮৬ থেকে এ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ একাডেমী অব সাইন্স-এর কাউন্সিলর, ১৯৮৮ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন বিভাগের ‘এমএসসি’ ‘এমফিল’ ও পিএইচডি কোর্সের তিনি পরীক্ষক। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য এবং ১৯৯৩ সাল থেকে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের কার্যবিধায়ক কাউন্সিলের সিনিয়র সদস্য অধ্যাপক এম আর খান আহ্ছানউল্লা ক্যানসার হাসপাতালের অন্যতম উপদেষ্টা সদস্য এবং বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস এর বোর্ড অব ট্রাস্ট্রিজ এবং প্রবীনতম সদস্য। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের নতুন পেডিয়াট্রিকস ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে উপযোগী এফসিপিসি, ডিসিএইচ এবং এমসিপিএস নতুন পোস্টগ্রাজুয়েট কোর্স প্রবর্তন করেন। তাছাড়া বাংলাদেশের হাসপাতাল সমূহে চিকিৎসা, প্রশাসন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে ডা. খান-এর অবদান অনস্বীকার্য।

সদাশয় সরকার তাঁর এই মহৎ অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৫ সালে তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক পদবীতে ভূষিত করেছেন এবং তাঁর পরিকল্পনায় ও প্রযত্নে শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দিয়েছেন সক্রিয় ও সার্বিক সহযোগিতা। তাঁর মহান ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার কারণেই এই দেশে শিশু চিকিৎসা ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা সম্ভব হয়েছে। তিনি শেরে বাংলা জাতীয় স্মৃতি সংসদ স্বর্নপদক (১৯৯২); কবি কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় স্বর্নপদক (১৯৯৩); কবি সরোজিনী নাইডু স্মৃতি পরিষদ স্বর্নপদক (১৯৯৭); খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা স্বর্নপদক (১৯৯৮); বাংলাদেশ সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক সমাজসেবা স্বর্নপদক (১৯৯৯); ইবনে সিনা স্বর্নপদক (১৯৯৯); নবাব সলিমুল¬াহ পুরস্কার (২০০৬) একুশে পদক (২০০৯) সহ বিভিন্ন পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হন।

অনেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন-আমেরিকায় যান। কিন্তু পড়াশুনা শেষ করে আর দেশে ফেরেন না। ওখানেই স্থায়ী হয়ে যান। উন্নত দেশে গিয়ে ভুলে যান পেছনে ফেলে যাওয়া এই জন্মভূমির জনগোষ্ঠীর কথা। কিন্তু ভুলতে পারেননি ডা. এম আর খান। নিজ জেলা সাতক্ষীরার প্রতি তাঁর অদম্য আকর্ষণ। কখনও কোন প্রসঙ্গে তাঁর জন্মস্থান সাতক্ষীরার কথা উঠলে সুযোগ মত একটি কবিতার ক’টি চরণ দরদ দিয়ে প্রায়ই তিনি শোনান সবাইকে-

‘‘দেশের সীমানা, নদীর ঠিকানা
যেথায় গিয়েছে হারিয়ে,
সেথা সাতক্ষীরা, রুপময় ঘেরা
বনানীর কোলে দাঁড়িয়ে।’’

১৯৫৬ সালে ডা. এম আর খান সস্ত্রীক লন্ডনে যান। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলছিলেন-পড়াশুনা শেষে চাকুরীর অফার পেয়েছিলেন লন্ডনের হাসপাতালেই। কিন্তু নাড়ির টানে তিনি চলে আসেন দেশে। এমআরসিপি পাস করার পর সিক চিলড্রেন হাসপাতালের প্রধান ডা. ডিকশন ডাকলেন এম আর খানকে। তিনি ওখানে ভাল সুযোগ দিতে চাইলেন। বললেন- তোমার মেয়ে ম্যান্ডি এখানে পড়ে। তোমার স্ত্রীও এই সমাজে সম্মানিতা। তুমিও ভাল ইনকাম করো। কেন দেশে ফিরতে চাও? তিনি বলেছিলেন, আমার দেশ খুব গরীব। এই গরীবদের চিকিৎসা করার কেউ নেই। আমরা এদেশ পড়ে থাকলে তাদেরকে দেখবে কে? সেই মুহুর্তে তার মনে পড়ে গিয়েছিলো জেনারেল মন্টেগোমারীর কথা। তিনি ক্যাডেটদের বলেছিলেন, ডু নট ফরগেট লেড মাই গড. মাই কাউনরিটি এ্যান্ড মাই কুইন’ এই তিনটি কখনো ভুলো না। হ্যাঁ, এ ধরনের দেশাত্ববোধ এবং জাতীয়তাবোধ তাঁকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছিলো বলেই তিনি সকল লোভ-লালসাকে জলাঞ্জলি দিতে পেরেছিলেন সেদিন। ডা. ডিকশন বললেন, দেশে তোমাকে খুব স্ট্রাগল করতে হবে। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত ধর্মপ্রাণ তরুন ডা. এম আর খান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা রেখে উত্তরে বলেছিলেন- গড উইল হেল্প আছ।

অধ্যাপক (ডা.) এম আর খান একজন লেখক এবং গবেষকও বটে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর ৩৭টি গবেষণাধর্মী রচনা প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া তিনি শিশুরোগ চিকিৎসা সংক্রান্ত বই লিখেছেন ৭টি। যা দেশে ও বিদেশে বহুল প্রসংশিত। বইগুলো হচ্ছে: ‘ইসেন্ছ অফ পাডিয়েট্রিছ’ (প্রকাশকাল: জানুয়ারি ১৯৮৯) ‘পকেট পাডিয়েট্রিছ প্রেসক্রাইবার’ (প্রকাশকাল: জানুয়ারি ১৯৮২), ‘ইসেন্ছ অফ ইনডোক্রাইনোলোজি’, ‘প্রাথমিক চিকিৎসা’, ‘মা ও শিশু’ (প্রকাশকাল: ২১ ফেব্র“য়ারি ১৯৮৬), ‘আপনার শিশুর জন্য জেনে নিন’ (প্রকাশকাল: ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬), ‘শিশুকে সুস্থ রাখুন’ এবং ‘ড্রাগ থেরাপি ইন চিলড্রেন (প্রকাশকাল জুন ২০০৬)






মন্তব্য চালু নেই