মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যাচার করে পাকিস্তানের ভিডিও প্রকাশ

ফেসবুকে একটি ভিডিও তোলা হয়েছে পাকিস্তান ডিফেন্সের পেজে। যেই ভিডিওর মূল বক্তব্য হলো মুক্তিযুদ্ধ ভারত এবং রাশিয়ার যোগসাজসে একটা ষড়যন্ত্রের চেয়ে বেশি কিছু না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ৩০ লাখ বাঙালি মারা যায়নি, যারা মারা গিয়েছিলো তাদের ৯০ শতাংশই বিহারি এবং পাকিস্তানি।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ৪৬তম বার্ষিকীতে যখন বাংলাদেশ আনন্দের বন্যা বইছে, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাকিস্তানের এই ভিডিওতে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। ভিডিওটি পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা সংস্থা স্পন্সর করে ব্যাপক প্রচারের চেষ্টা করছে এই অঞ্চলে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাঙালিদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। খুনে মনোভাব নিয়ে তারা হামলে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। নির্মম হত্যাকাণ্ডে ছারখার করে দেয়ার চেষ্টা করে বাঙালির নিজ দেশের স্বপ্ন।

অথচ পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হয়ে গিয়েছিল। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি। মূলত ছাত্রের ছদ্মবেশ নিয়ে ভারতীয় সেনা সদস্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল এবং তারাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল ১৯৭১ সালে।

‘দি ফরগটেন চ্যাপ্টার- স্টোরি অব ইস্ট পাকিস্তান’ শিরোনামের সাত মিনিটের ভিডিওতে ড. জুনাইদ আহমেদ নামের এক পাকিস্তানি লেখকের ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ: এক্সপ্লোডিং মিথস’ এর উপর ভিত্তি করে ভিডিওটি তৈরি করা হয়। এই ভিডিওতে জুনাইদ আহমেদসহ কয়েকজন পাকিস্তানির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা মূলত ভারত এবং রাশিয়ার ষড়যন্ত্রের ফলাফল। কয়েক লাখ নয়, মাত্র কয়েক হাজার লোক সেসময় বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের চালানো নির্মম গণহত্যার পুরোটাই অস্বীকার করা হয়েছে এই ভিডিওতে। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়নি বলে দাবি করেছে তারা। যুদ্ধের পর পরাজয়ের তদন্ত করতে গঠন করা হামিদুর রহমান তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সেনারা ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষকে হত্যার কথা স্বীকার করলেও এই ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে এই সংখ্যাটা নগণ্য।

ভিডিওতে দাবি করা হয়, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা আসলে ছিলো ৫০ হাজার এবং তাদেরকে সামনে রেখে শুরু থেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়।

জুনায়েদ আহমেদ নামের এই লেখক আরো দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধে যারা মারা গিয়েছিলো তারা আসলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং এরা সবাই ছিলো দুষ্কৃতিকারী। তারা পাকিস্তানি সেনাদের উপর গুলি চালায় বলেই পাকিস্তানি সেনারা তাদের মেরে ফেলেছিলো।

ভিডিওটিতে আরো বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকার পাকিস্তান বিরোধী হওয়ায় ১৯৭১ সময়ে যেসব রাজনৈতিক নেতারা পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলো, তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ভারতের হুকুমত কায়েমের চেষ্টায় আছেন বলেও দাবি করা হয় এই ভিডিওতে।

ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীরা তীব্র প্রতিবাদ করছেন। পাকিস্তান ডিফেন্সকে এ ধরনের একটি মিথ্যাচারে ভরা ভিডিও তৈরি এবং প্রচারের জন্য মন ভরে গালাগাল করছেন তারা। ভিডিওর নিচে আ ন ম রাসেল মন্তব্য করেন, ‘আমি শুধু জানতে চাই অপারেশন সার্চ লাইট কি? আর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান বাহিনী কি করেছিল?’

মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন লেখেন,‘মগজহীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পয়সা খরচ করে মিথ্যা অপপ্রচারের সেই পুরোনো চেষ্টা।’

এমনকী পাকিস্তানের নাগরিকরাও এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন ফেসবুকে। আব্দুল্লাহ সাইদ নামে একজন পাকিস্তানি লিখেছেন, ‘আমরা যে বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করেছি তাদের পাওনা অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছি সেটা অস্বীকার করতে পারবো না। তাছাড়া পাকিস্তানের জন্মই হয়েছিলো বাঙালিদের কারণে।’

ইমরান উল্লাহ খাট্টাক নামের আরেক পাকিস্তানি লিখেছেন, ‘যদি সত্যিটা জানতে চান তাহলে ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিকের ‘ম্যায়নে ঢাকা ডুবতি দেখা’ বইটা পড়ুন। তাহলেই বুঝবেন বাঙালিদের ওপর কি পরিমাণ নির্যাতন চালিয়েছি সেসময়।’

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানোর পর পাকিস্তানের প্রতি নতুন করে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে। এ রকম চক্ষুলজ্জাহীন মিথ্যাচারের জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিৎ বলেই মনে করেন তারা।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন



মন্তব্য চালু নেই