মেইন ম্যেনু

জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে টাঙ্গাইলের আবুল কাশেম ব্যবসা

জাতিসংঘ সদর দপ্তরের প্রবেশমুখের কাছে ফুটপাতে দোকানদারি করেন টাঙ্গাইলের আবুল কাশেম। তিনি মৌসুমি পণ্যের ব্যবসায়ী। গ্রীষ্মে মোবাইল কাভার, টুপি, উপহারসামগ্রী বিক্রি করেন। শীতে গরম টুপি, হাতমোজা ও মাফলার।

২৬ বছর ধরে এই ব্যবসা আবুলের। ম্যানহাটনে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের প্রবেশমুখের অতিপরিচিত ইস্ট ৪৪ স্ট্রিটের সেকেন্ড অ্যাভিনিউয়ে তাঁর দোকান। আবুল বলেন, গাড়ির আলো-আধাঁরিমাখা কাচের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘে ঢোকার মুখে তিনি দেখেছেন নেলসন ম্যান্ডেলা, গাদ্দাফি, ইয়াসির আরাফাত, মাহমুদ আব্বাস, নওয়াজ শরিফ, আই কে গুজরাল, বেনজির ভুট্টুকে। দেখেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও।

আবুল কাশেম বলেন, ‘কতশত মন্ত্রী আমার দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে গেছেন, তার কোনো হিসাব রাখিনি। অনেকেই আবার বাংলাদেশি মনে করে হাতও মিলিয়েছেন। যাঁরা আমার দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে গেছেন, তাঁদের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়া (আমার এলাকার মন্ত্রী ছিলেন) লতিফ সিদ্দিকী, সড়ক ​পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী এম কে আনোয়ার, সাবেক মন্ত্রী নাজমুল হুদা, সাবেক মন্ত্রী মোর্শেদ খান, জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ অনেকে রয়েছেন।

অনেক বছর বিদেশে থেকেও এত মন্ত্রীকে চেনেন কীভাবে, তা জানতে চাইলে আবুল কাশেম বলেন, ‘আমরা গরিব হলেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।’ হেসে বলেন, তিনি বাঘা সিদ্দিকীর (কাদের সিদ্দিকী) এলাকার লোক।

গত বুধবার আবুল কাশেমের সঙ্গে যখন এসব কথা হচ্ছিল, তখন ভরদুপুর। নিউইয়র্কের আকাশে মেঘ। হিমেল হাওয়া বইছে। গরম টুপি দিয়ে মাথা ঢেকে পণ্যের পসরা নিয়ে আবুল কাশেম বসে আছেন সেকেন্ড অ্যাভিনিউতে। প্রথমে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে পরিচয় পেয়ে বলে ফেললেন অনেক কিছু।

আবুল কাশেম বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিনই জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে অনেক সমাবেশ হয়। প্রতিবাদী মানুষ জড়ো হয়। কিন্তু তারা খুব শান্ত থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যখন প্রতিবাদ সমাবেশ করে, তখন বিরোধীপক্ষও একই স্থানে শান্তি সমাবেশ করতে আসে। দুই পক্ষ গালমন্দ করে, পচা ডিম ছোড়ে। এসব দেখে বিদেশিরা আমাদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে।’

পরিবারের কথা জানতে চাইলে আবুল বলেন, ‘সুখে আছি। আমি ও স্ত্রী দুজনে মিলে কাজ করি। আমি ফুটপাতে, স্ত্রী একটি রেস্তোরাঁয়। দুই মেয়ে ভালো পড়াশোনা করছে। বড় মেয়ে পড়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ছোট মেয়ে স্কুলে।’

ফুটপাতে ব্যবসা করতে কোনো সমস্যা হয় কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলোতে দেখেছি, প্রায় প্রতিদিনই হকার উচ্ছেদ করা হয়। প্রশাসনের লোকজন হাজার হাজার টাকার মালামাল রাস্তায় ফেলে দেয়। হকাররা রাতারাতি ফকির হয়ে যান। কিন্তু নিউইয়র্কের অবস্থা পুরোটাই ভিন্ন। ফুটপাতে ব্যবসা করার জন্য লাইসেন্স নিতে হয়। সবার মতো আমিও লাইসেন্স নিয়েছি। আমাদের জায়গা নির্ধারণ করা থাকে।’

আবুল দূরের জাতিসংঘ সদর দপ্তর দেখিয়ে বলেন, ‘দেখছেন না, ওটা জাতিসংঘ সদর দপ্তর। এখানে দুনিয়ার বড় বড় মানুষ আসেন। এই ভবনের কত কাছে বসে ব্যবসা করছি, আর আমাদের দেশের “পাতি নেতাদের” অফিসের সামনেও কি বসা যাবে?’

জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন চললে সেকেন্ড অ্যাভিনিউ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানালেন আবুল। কর্তব্যরত অনেক পুলিশ সদস্য তাঁকে চেনেন। তাই ব্যবসা গুটিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে আবার বসেন। কখনো একটু দূরে বসেন।

আবুল আরও বলেন, ‘আমি ফুটপাতের দোকানদার হলেও ক্রেতারা বেশ বড় মাপের। গেল সপ্তাহে আফ্রিকা ও নাইজেরিয়ার দুজন মন্ত্রী আমার কাছ থেকে দুটি শীতের টুপি কিনেছেন হেঁটে যাওয়ার সময়। পাঁচ ডলার দামের টুপিতে দিয়েছেন কয়েক গুণ বেশি। এভাবে কতশত মন্ত্রী, এমপি, রাষ্ট্রদূত, মিশনের কর্মকর্তারা আমার দোকানের টুপি আর হাতমোজা পরেছেন, তা ভাবলেই ভালো লাগে।’

আর সময় নেই আবুলের। এবার ক্রেতা সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।






মন্তব্য চালু নেই