মেইন ম্যেনু

অদ্ভুত চুলো হুলি উইগম্যান

প্রতিদিন পৃথিবী পাল্টে যাচ্ছে তার নিজের গতিতে। আর পৃথিবীর এই চলমান গতির সঙ্গে তাল মেলাতে মানুষকেও প্রতিনিয়ত বদলাতে হচ্ছে। এই পালাবদলের মাঝে কখনও মানুষ অর্জন করে অনেক নতুন অনুসঙ্গ। আবার কখনও নিজের অতীত ঐতিহ্যের অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলে অবচেতন মনে। আর এভাবেই ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের উৎস এবং তার পরম্পরা। তেমনি নিজেদের জন্মের উৎস হারিয়ে যাওয়া এক আদিবাসী গোষ্ঠি হুলি উইগম্যান। পাপুয়া নিউগিনির গহীন অঞ্চলে বসবাস এই আদিবাসী গোষ্ঠির।

পাপুয়া নিউগিনির মধ্যবর্তী পাহাড়বেষ্টিত অঞ্চলে বসবাস হুলি উইগম্যানদের। সাগর থেকে প্রায় ১৫০০ মিটার উচ্চতায় তাদের জীবনের গল্প বাধা। সর্বশেষ ১৯৮১ সালে তাদের উপর একটি জরিপ করা হয়। সেই জরিপে তাদের জনসংখ্যা দেখানো হয় মাত্র ৬৫ হাজার। কিন্তু বর্তমানে ঠিক কত সংখ্যক উইগম্যানরা জীবিত আছেন তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। এই আদিবাসী গোষ্ঠিটির উৎপত্তি ঠিক কোথায় সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তবে উইগম্যানদের মতে তারা পাপুয়া নিউগিনিতে কমপক্ষে এক হাজার বছর ধরে বাস করছে। হরেক রংয়ের পোশাক এবং চুলের বাহারী ডিজাইন বিশ্লেষণ করে তাদের উৎস সম্পর্কে কিছু ধারনা করা যায়। হুলি উইগম্যানদের উৎস সম্পর্কিত কিছু মিথ সাহিত্যে বলা আছে, পাপুয়া নিউগিনির সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার বছর আগে। আর তাদের সৃষ্টি হয়েছে কমপক্ষে ৫ হাজার বছর আগে। তাদের বিশ্বাস মতে হুলি নামের এক পুরুষ ধর্মযাজক থেকে তাদের উৎপত্তি। বহু বছর আগে ঈশ্বরের কাছ থেকে বর পেয়ে প্রধান পুরুষ হুলি পৃথিবীতে নেমে আসেন বসতি গড়ার জন্য। পৃথিবীতে এসে তিনি পাপুয়া নিউগিনির গহীন জঙ্গলে নিজের আশ্রয় খুঁজে নেয় এবং এখানেই বংশবিস্তার করতে শুরু করেন।

শৃঙ্খলতায় বিশ্বাসী উইগম্যানদের সমাজে নেই কোনো গোত্রপিতা কিংবা একক নেতৃত্ব। ধর্মীয় আচার পালনের জন্য গোষ্ঠির মধ্য থেকে একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে সকলের সম্মতিতে প্রধান পুরোহিত হিসেবে নির্বাচন করা হয়। কিন্তু প্রধান পুরোহিত হিসেবে তিনি গোষ্ঠির অন্যান্য বিষয়গুলোতে কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এই সমাজব্যবস্থায় মূল গোত্রকে বলা হয় হামিগিনি এবং শাখা গোত্রকে বলা হয় হামিগিনি এমেনে। শাখা গোত্র তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রনে ভূমিমালিকানা নিশ্চিত করে, আর মূল গোত্র পুরো অঞ্চলের ভূমিমালিকানা নিশ্চিত করে। মোট উৎপাদিত শস্যের সমান ভাগ করে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় উৎসবের ভেতর দিয়ে সকল পরিবারকে বন্টন করা হয়।

উইগম্যানদের মূল বিনিময়ের উপাদান হলো শূকর। তারা অন্যান্যদের সঙ্গে শূকরের বিনিময়ে অন্যান্য দ্রব্যাদি সংগ্রহ করে। মাঝে মধ্যে বিয়েতে কনে পক্ষকে শূকর দিয়েও সম্মানিত করা হয়, তবে সেটা উইগম্যান পরিবারের সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে। এছাড়াও তারা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কিছু শস্য বপন করে। তবে জঙ্গলে জন্ম নেয়া বিভিন্ন উদ্ভিদই তাদের খাবারের অন্যতম উৎস।

হুলি উইগম্যানহুলি ভাষার একটি শব্দ হলো ‘আমবুয়া’, যার অর্থ হলুদ কাদামাটি। আমবুয়া উইগম্যানদের সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। হলদে মাটির সঙ্গে লাল মাটি মিশিয়ে হুলি যোদ্ধাদের শরীরের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন চিত্র আঁকা হয়। এছাড়াও যেসব হুলিদের বিয়ে হয়নি তাদের পূর্ণবয়স্ক হওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়মের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এরমধ্যে তাদের প্রায় তিনবছর নিজস্ব স্কুলে যাতায়াত করতে হয়, সেই স্কুল থেকে তারা প্রাণী এবং প্রাণ বিষয়ক শিক্ষা গ্রহণ করে। এই শিক্ষাগ্রহনের সময় ছেলে শিক্ষার্থীরা তাদের মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকে শুধু তাই নয় এসময়ে তারা কোনো নারীর সঙ্গে শারিরীক সম্পর্কেও যেতে পারে না। কারণ পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর সমাজের সকল সুবিধাই সে ভোগ করতে পারবে। আর চূড়ান্ত সেই ভোগের জন্য অল্প কিছুদিনের ত্যাগ তাদের করতে হয়।

আদিভৌতিক কিছু আচার অনুষ্ঠান এবং খাবার নিয়ন্ত্রন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একজন ‍হুলি পূর্ণবয়স্ক হয়। আর পূর্ণবয়স্কের খেতাব পাওয়ার পর থেকেই মূলত তারা ঐতিহ্যবাহী কায়দায় চুল রাখতে পারে। এসময় হুলি গোষ্ঠির প্রধান ধর্মযাজকের তত্ত্বাবধানে পূর্ণবয়স্ক হতে যাওয়া হুলির শরীরের অন্যান্য পশমগুলো তুলে ফেলা হয়। পরবর্তীতে বিশেষ পানি দিয়ে পুরো শরীর ধুয়ে অনেকটা দেখতে মাশরুমের মতো করে চুল বেধে দেয়া হয়। এভাবে টানা ১৮মাস চুল বেধে রাখার পর চুলগুলো হুলিদের ঐতিহ্যবাহী উইগের রূপ পায়। চুলগুলো উইগের রূপ পাওয়ার পর সেখানে বিভিন্ন পাখির পাখা দিয়ে শোভিত করা হয়। ভিন্নভাবে চুল বাধার ধরণ এবং যুদ্ধে পারদর্শীতার জন্য বিশ্বের অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠি তালিকায় নিজেদের স্বতন্ত্রতা প্রমাণ করেছে হুলি উইগম্যানরা।

উইগম্যান পুরুষের পরনের পোশাকের নাম দাম্বেল, যা কোমরের নিম্নাংশে পরা হয়। আর দাম্বেলের সঙ্গে কোমরবন্ধনীতে ঝোলানো থাকে হঙ্গোইয়া নামের ছুরি। এছাড়াও প্রত্যেক হুলি উইগম্যানের কাছে একটা ছোটো চামড়ার ঝোলা থাকে, যে ঝোলায় তারা জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা বিভিন্ন শস্যাদি এবং তামাক বহন করে। আর নারী হুলিদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নাম হুওরা। তবে ইগিরিগিজা কিংবা তেগে পুলু নামের পোশাকও তারা পরিধান করে।






মন্তব্য চালু নেই