স্বস্তির নিঃশ্বাস বিদায়ী ইসির

আলোচনা-সমালোচনায় বিদ্ধ কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ নেতৃত্বাধীন ইসি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ও ইউপি নির্বাচনে প্রাণহানির রেকর্ড গড়ে বুধবার বিদায় নিচ্ছে। আর নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ বিদায় নেবেন আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। তবে বিতর্কিত এই কমিশন পদত্যাগ করতে চেয়েছিল দ্বিতীয় বছরেই। এরপর পদত্যাগ না করে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে বিদায়ী এই কমিশন।

বিদায়ের আগে গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘আমরা যে শপথ নিয়েছিলাম, আমরা সে শপথ রক্ষায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশের রাজনৈতিক অবস্থার কারণে আমরা পদত্যাগের কথা ভাবছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরে অনেক ভালো লাগছে। শেষ সময়ে মনে হচ্ছে আমরা ভালোই করেছি। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে দেশের জন্য ভালো হতো। পরবর্তী নির্বাচনগুলো আরো ভালো যেত।’

ইসি কর্মকর্তারা জানান, দশম সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৪ সালের ৩ মার্চ উপজেলা নির্বাচনে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের মধ্যে বিদেশ সফরে যান সিইসি। এরপর ১৫ এপ্রিল দেশে ফিরে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ।

তবে নানা সমালোচনা সহ্য করে রকিব কমিশন পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে বিদায় নিচ্ছেন স্মার্টকার্ড বিতরণ, ছিটমহলবাসীদের ভোটাধিকার উপহার, নারায়ণগঞ্জে স্বস্তির ভোট আর নতুন নির্বাচন ভবনে যাত্রার তৃপ্তি নিয়ে। মেয়াদপূর্তির শেষ দিন আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিদায় সংবর্ধনা দেবে ইসি সচিবালয়। এ বিদায় সংবর্ধনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনাররা নিজেদের অনুভূতি তুলে ধরবেন।

রকিব কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, বিদায়ী কমিশনের পাঁচ বছর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এটা প্রমাণিত হয়েছে- ভোট ইসির শুধু একার নয়। সবার সহযোগিতা থাকলেই সুষ্ঠু ভোট সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোকে এ মনোভাব নিয়ে এগোতে হবে। কোনো দল ভোট বর্জন করলে বা নৈরাজ্য করলে যেমন নির্বাচন ভালো করতে পারবে না ইসি, তেমনি অন্যদল নিজেদের খেয়ালখুশি মতো আচরণ করলেও তা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় হবে বলে মনে করেন তিনি। অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, এখন নতুন কমিশন হবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সবার প্রচেষ্টা নতুন কমিশনকেও উদ্বুদ্ধ করবে। নিশ্চয়ই শক্তিশালী কমিশনকে সবার সহযোগিতা করার মনোভাব থাকবে।

নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ বলেন, নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক দলের আস্থাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে ইলেকশন কমিশনের একটা বড় স্টেকহোল্ডার। তাদের যদি আস্থা না থাকে, তাহলে সে নির্বাচন কমিশন যত ভালোভাবেই নির্বাচন পরিচালনা করুক না কেন সেই আস্থার সংকট থেকেই যাবে। তবে নির্বাচন কমিশন হান্ড্রেড পার্সেন্ট গ্রহণযোগ্য সবার কাছে করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে আমরা যা করেছি এতে রাজনৈতিক চর্চা ভালো থাকলে আরো ভালো করা যেত। রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধের কারণে আমরা বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। তার দাবি, সার্বিকভাবে আমরা যা করেছি ভালোই করেছি।

দায়িত্ব নেয়ার পর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন শেষ করেছে বিদায়ী এই ইসি। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ও স্থানীয় নির্বাচনে নিহতের নতুন রেকর্ড, হামলা-সংঘর্ষ রোধে ব্যর্থতা ও বেপরোয়া আচরণবিধি লঙ্ঘন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনায় দিন কেটেছেন তারা। ২০১৩ সালে রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড গড়ে আর কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ করতে পারেনি রকিব কমিশন।

এদিকে ৬ ধাপে উপজেলা নির্বাচন শেষে ২০১৫ সালে আচরণবিধি লঙ্ঘন, হামলা-সংঘর্ষের মধ্যে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌরসভা ভোট হয়। এরপর ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করে ইসি। গত ফেব্রুয়ারিতে ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ২২ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চলে ছয় ধাপের ভোট। সব ধাপ মিলে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি নির্বাচনী অনিয়ম রোধে ইসির কার্যকর ভূমিকা না পেয়ে সব মহলে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে। শতাধিক ইউপির সাড়ে ৩০০ কেন্দ্র স্থগিত করা হয়। কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপারে প্রকাশ্যে সিল মারাসহ নানা অনিয়ম দেখে ক্ষমতাসীন দল ছাড়া অধিকাংশ দল ও পর্যবেক্ষকরা কমিশনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। অসহায়ত্ব ছিল কমিশনেরও। ভোট শেষে প্রতিক্রিয়া দেখাতে সিইসির সঙ্গে পাঁচ নির্বাচন কমিশনারের অন্তত দুইজনকে পাওয়া যায়নি সংবাদ সম্মেলনে। ভোট শেষে কাজী রকিব বলেছিলেন, ভোট নিয়ে সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির ব্যাপার নেই। আমরা দায়িত্ব পালন করেছি। সুষ্ঠুভাবে তা করে আনতে চেষ্টা করেছি, সব থেকে ভালোটা করতে চেয়েছি আমরা।

ভোটে অনিয়মের কারণে ক্ষমতাসীন দলের এমপি-মন্ত্রীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের চিঠি, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধানদের ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় সতর্ক করে চিঠি দেন এই ইসি। এ ছাড়া পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার, ইসিতে ডেকে এনে শুনানি, বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষের জন্য বিএনএফের আবেদন নিয়ে বিতর্ক, জাসদের ভাঙনের মুখে মশাল প্রতীক নিয়ে সিদ্ধান্ত, জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন কাজী রকিব। এ সবের মধ্যেই নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আদালত অবমাননার সাজা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন সিইসি ও চার নির্বাচন কমিশনার।

এরই মধ্যে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের ভোটার করে জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয় গত জুলাইয়ে। তাদের তালিকাভুক্ত করে স্মার্টকার্ড দেয়ার ঘোষণা আসে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দিয়ে ৩ অক্টোর থেকে শুরু হয় এ কার্ড বিতরণ। এ নিয়ে সাধারণ ও বিলুপ্ত ছিটে ছিল উৎসবের আমেজ। তবে বিতরণ সঠিকভাবে না হওয়ায় অসন্তোষও প্রকাশ করেছেন অনেকে।

এ ছাড়া মনোনয়নপত্র জমা দিতে চালু হয়েছে অনলাইন পদ্ধতি। শেষ সময়ে গত ২২ ডিসেম্বরে এসে দলীয় প্রতীকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের শান্তিপূর্ণ ভোট করতে পেরে শেষ বেলায় প্রশংসা পেয়েছে ইসি। মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে প্রথমবারের মতো পরোক্ষ ভোটে জেলা পরিষদ নির্বাচন হয়, যা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ছাড়া অন্য দলগুলোর তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি।

উল্লেখ্য, প্রথমবারের মতো দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান সার্চ কমিটির মাধ্যমে বাছাই করে ২০১২ সালে বিদায়ী ইসির নিয়োগ দেন। নতুন ইসিও গতবারের মতো শিগগির নিয়োগ দেয়া হবে।



মন্তব্য চালু নেই