খালেদার মামলার প্রভাব পড়বে রাজনীতিতে!

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলো সচল হলে এর প্রভাব পড়বে দেশের রাজনীতিতে- এমনই ধারণা করছেন সচেতন মহল। মামলাগুলো চালু হলে রাজনীতির পাশাপাশি সরগরম হয়ে উঠবে আদালত পাড়াও।
আদালত সূত্র জানিয়েছে, আগামী এপ্রিলে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ৯টি আবেদনসহ গুরুত্বপূর্ণ আরো বেশ কয়েকটি মামলা শুনানির জন্য কার্যতালিকায় থাকছে। মাসের শুরুতেই দুর্নীতির মামলাগুলোর অধিকাংশই উচ্চ আদালতে শুনানির জন্য ধার্য রয়েছে। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দু’টি দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা স্থগিতের আবেদনসহ কমপক্ষে ৮টি আবেদনের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা রয়েছে । এ মামলাগুলোর আদেশ দেশের বিরাজমান পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে দুর্নীতির বিষয়ে এতোগুলো গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানির দিন নির্ধারিত হওয়ায় এ মাসজুড়ে অনেকেরই নজর থাকবে আদালতের দিকে ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে যে সব মামলা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সচল করার উদ্দ্যোগ নেয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক।’
তিনি বলেন, ‘গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এ অভিযোগ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে কিন্তু খালেদা জিয়াকে অব্যাহতি দেয়া হয়নি। এতেই বোঝা যায়, খালেদা জিয়াকে মানসিক চাপে রাখার জন্যই দুদক ও সরকার এ মামলাগুলো সচলের উদ্দ্যোগ নিয়েছে।’
জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিবরণে কোথায়ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি অর্থ আত্মসাতের কথা উল্লেখ নেই জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের এ আইনজীবী বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে তা কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন, কারণ খালেদা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের কর্তপক্ষের কেউ নন।
রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ করছে এই মামলায় বেগম খালেদা জিয়া ৬৩ দিন হাজিরার মধ্যে মাত্র ৭ দিন আদালতে হাজিরা দিয়েছেন-এ অভিযোগ সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন এই আইনজীবী।
তিনি বলেন, ‘কোনো মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতে স্থগিত থাকলে সে মামলায় সংশ্লিষ্ট আসামি তার আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে হাজিরা দেন। বেগম খালেদা জিয়াও এ মামলায় নিম্ন আদালতে তার আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা দিয়েছেন এবং তিনি আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এটি করেছেন।’
তবে খালেদা জিয়ার আইনজীবীর এ মন্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন রাষ্টপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোমতাজ উদ্দিন ফকির।
তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির এ মামলাগুলোর ব্যাপারে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা যে বক্তব্য দিচ্ছেন সঠিক নয়।’
মানসিক চাপে রাখার জন্য খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলো সচলের উদ্দ্যোগ নেয়া হয়েছে- খালেদার আইনজীবীদের এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ অভিযোগও সঠিক নয়। কারণ কারো বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করা থাকলে সে মামলাগুলো একদিন না একদিন সচল হবেই।’
গ্যাটকো দুর্নীতি মামলার অভিযোগ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে কিন্তু খালেদা জিয়াকে দেয়া হয়নি- খালেদার আইনজীবীদের এ অভিযোগ তাদের রাজেনৈতিক বক্তব্য বলেও মন্তব্য করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল।
তিনি বলেন, ‘গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় সিআরপিসির (৫৬১-এ) অনুযায়ী কোয়াশমেন্ট এর আবেদন করলে প্রধানমন্ত্রী শেখে হাসিনাকে আদালত অব্যাহতি দেন। এ মামলায় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো উপাদান না থাকায় আদালত তাকে অব্যাহতি দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়াও গ্যাটকো মামলায় কোয়াশমেন্ট এর আবেদন করেছিলেন, কিন্তু আদালত তার আবেদন মঞ্জুর করেননি। কারণ গ্যাটকো মামলার অভিযোগে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রাথমিক উপাদান পাওয়া গেছে। ফলে আদালত তাকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেননি। কাজেই আমি বলবো বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলাগুলো নিয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছেন তা সঠিক নয়, পুরোপুরি রাজনৈতিক। খালেদার আইনজীবীরা এ রকম বক্তব্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।’
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা, পরোয়ানা স্থগিত চেয়ে আবেদন, আদালত পরিবর্তন ও সাক্ষ্যগ্রহণের শুনানি ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাকে কেন্দ্র করে এ বিষয়গুলো বিচারাধীন আছে। এ মামলায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজির না হওয়ায় বেগম খালেদা জিয়াসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আবু আহমেদ জমাদারের বিশেষ আদালত।
এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি এ বিচারকের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে মামলা দুটি অন্য কোনো আদালতে স্থানান্তরের জন্য হাইকোর্টে পৃথক দুটি আবেদন করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।
পরে তা ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে শুনানির জন্য উত্থাপন করা হয়। পরে তিন মার্চ খালেদা জিয়া বিচারিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে পৃথক দুটি সম্পূরক আবেদন করেন। হাইকোর্ট এসব আবেদনের ওপর সুপ্রিমকোর্টের অবকাশ শেষে অর্থাৎ ৩১ মার্চের পরে শুনানি করবেন বলে আদেশ দিয়েছেন।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা বাতিল আবেদনের রায়:
এক এগারোর সময় বেগম খালেদা জিয়া ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ মামলায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতি হয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির অনুমোদন দিয়ে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছিল খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। পরে এ মামলা ও অনুমোদনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে বাতিল আবেদন করেন খালেদা। শুনানি শেষে ২০০৮ সালের ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট এ মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। একই সঙ্গে মামলা কেন বাতিল ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে রুলও জারি করেন। সম্প্রতি এ মামলাটি সচল করার জন্য রুলের চূড়ান্ত শুনানির উদ্যোগ নেয় দুদক।
দুদকের আইনজীবীর শুনানি গ্রহণ করে আদালত ৫ মার্চ রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন। এ অবস্থায় ৮ মার্চ খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত বেঞ্চ ১৫ মার্চ শুনানি ও রায়ের জন্য ধার্য করেন। কিন্তু ১৫ মার্চ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন থাকায় এবং ওই নির্বাচনে খালেদার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় সেদিন তাদের পক্ষে শুনানি সম্ভব না হওয়ায় আগামী ৫ এপ্রিল পরবর্তী শুনানি ও রায়ের জন্য ধার্য করেছেন আদালত।
এদিকে ১১ মার্চ হাইকোর্টের উপরোক্ত বেঞ্চে ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে খালেদা জিয়ার একটি আবেদন ও এ বিষয়ে জারি করা রুল শুনানির জন্য অন্য কোনো বেঞ্চে পাঠাতে প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি আবেদন করা হয়েছে।

গ্যাটকো মামলা:
খালেদা জিয়া ও তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ ১৩ জনকে আসামি করে ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর মতিঝিল থানায় এ মামলা করে দুদক। মামলায় চট্টগ্রাম বন্দর ও কমলাপুরের কনটেইনার টার্মিনালে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য মেসার্স গ্লোবাল অ্যাগ্রো ট্রেড কোম্পানি লিমিটেডকে (গ্যাটকো) ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রের কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়। মামলাটির অনুমোদনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের ১৫ জুলাই আদালত মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন এবং রুল জারি করেন। এছাড়া এ মামলা জরুরি ক্ষমতা বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৭ সালে আলাদা একটি রিট আবেদন করা হয়। হাইকোর্ট এ বিষয়েও রুল জারি করেন। ওই দুটি রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানির জন্য দুদক আলাদা আবেদন করে, যা শুনানির জন্য হাইকোর্টের কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

নাইকো মামলা:
কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ১০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি সাধনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুদক। এ মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ৯ জুলাই মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত করেন হাইকোর্ট এবং রুল জারি করেন। ওই রুলের ওপর শুনানির জন্য দুদক আবেদন করেছে, যা হাইকোর্টের উপরোক্ত বেঞ্চের কার্যতালিকায় রয়েছে।



মন্তব্য চালু নেই