মেইন ম্যেনু

হে নারী, জেগে ওঠো রুখে দাঁড়াও

অনেক দিন পর রোববার সন্ধ্যার দিকে আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা মেলে । কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে রাষ্ট্র-সমাজের কথা, এক পর্যায়ে বর্ষবরণে টিএসসি চত্বরে এবং সর্বশেষ গাড়ো নারীকে যৌন হয়রানির প্রসঙ্গটি। এতে তিনি হাসলেন, নানা কথা বললেন, দোষলেন নারীকে। তার বক্তব্যের সারাংশ হলো এ জন্য নারীরাই দায়ি।

আমি বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলাম- কী দোষ ছিলো বর্ষবরণে টিএসসি চত্বরে যা্ওয়া আমার ওইসব মা-বোনদের, কী অপরাধ ছিলো কর্মশেষে কুড়িল বিশ্বরোড দিয়ে ঘরে ফেরা আমার সেই বোনটির? আমার এসব প্রশ্ন শুনে তিনি হাসলেন এবং তার জবাব একটাই নারীদের এতো বাড়াবাড়ি করতে নেই, শালীনভাবে চলতে হবে।

আমি তাকে বললাম, আমার-তোমার সহদোরবোন যদি এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়, তবে কী তখনো এই ঘটনা শুনে আমরা হাসবো? চুপ করে থাকবো ? কোনো জবাব না দিয়েই চলে গেলেন আমার সেই বন্ধুটি। আমার ধারণা, এটা শুধু আমার এই বন্ধুটির ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের অধিকাংশই এ ধরনের ঘটনার কথা শোনে হাসে, আর মেয়েদেরকে দোষারোপ করেন।

শুধু এখানেই শেষ নয়, ধর্ষণ কীভাবে করেছে, কতজন ধর্ষণ করেছে, আলামত পা্ওয়া হয়েছে কি না, এই কথাগুলো শোনার জন্য কত না এদের আগ্রহ। আর সেটাকে নিয়ে কত রসাত্মক গল্পগুজবের আড্ডা! আর পারিবারিক গণ্ডিতে তো নানা হিসেবনিকাশ- মেয়ে হয়ে জন্মেছো তো, তাই এটা করা যাবে না, ওটা বেলা যাবে না, একাকী ঘরের বাইরে যা্ওয়া যাবে না। এসব কাউকে বলতে নেই! এমনটি করতে নেই, অমনটি বলতে নেই! মেয়েদের অনেক কিছু মেনে নিতে হয়! এমনটিই যেন আমাদের সমাজের রীতিতে পরিণত হয়েছে। আর এরফলে কী হয়েছে, আমাদের মেয়েদের ঘরের ভেতরে আবব্ধ করার একটা প্রক্রিয়া আরো জোরদার হয়েছে।

ফলে এই সমাজ যেন পশুদের জন্য। যে সমাজে মানুষ লিঙ্গভেদ করে সম্মান দেয়; যে সমাজে মানুষ নির্ভয়ে মানুষ আকৃতির পশুদের কাছ থেকে বাঁচতে পারে না, সে সমাজ মানুষের জন্য নয়, সে সমাজ পশুর জন্য।

তবে আজকে সমাজের পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে, ধর্ষণ-যৌনহয়রানি প্রতিটি নারীর ক্ষেত্রে ঘটতে পারে। আজ ওর বোন, কাল ওর বোন, পরশু আমার বোন, তারপর আপনার বোন, এভাবেই চলবে। এই পুরুষরুপী নরপশুদের যেন কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। তবে প্রতিটি ধর্ষককে একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই যথেষ্ঠ হতে পারে। ঠিক তেমনি কোথাও এদেরকে ধরা মাত্রই গণধোলাই দেয়া।এছাড়া ধর্ষক-যৌনহয়রানিকারীদের বাড়ির সামনে একটি করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিতে হবে। দেখবেন, এই নরপশুরা মানুষ হয়ে গেছে।

মেয়েরা যে জেগে ওঠছে না তা নয়, ইতোমধ্যেই অনেক বাঙালী নারীর তৎপরতায় যেন সেই প্রতিবাদী ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। ক্রমেই জেগে ওঠছে সব ধরনের অন্যায় রুখে দিতে। এখানে এমনই দু’একজন নারীর প্রতিবাদের পদধ্বনির কথা তুলে ধরা হলো-

আমেরিকার স্টেট ইউনিভার্সিটিতে মহাকাশ বিদ্যা নিয়ে গবেষণারত ফারহানা জেরিন নামে এক নারী তাঁর স্ট্যাটাসে বলেন, ‘আমাকে দেখলে কি তোমার শুধুই কামজ্বালা জাগে? কেন, আমার মগজটার কথা বিবেচনা করতে পার না? আমাকে দেখতে কি শুধু সেক্সিই লাগে? মা’য়ের কথা মনে হয় না?’

‘আমায় দেখলে তোমার জীবে শুধু পানিই আসে? কেন, শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে না? তুমি কি জান? তুমি যা পারনি আমি তাই করছি, মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করছি। তারপরও তোমরা শুধু আমার বাহ্যিক সৌন্দর্যটাই দেখবে? আমার মগজের ভেতরের বস্তুটার কদর করবে না? সারা পৃথিবী আমাকে সম্মান করবে, একদিন হয়তো বাঙালী বলে তোমরা শুধু মুখে গর্বই করবে! আমার জন্মভূমির তোমাদের জন্য দুঃখ হয়, তোমরা আমাকে হিজাবী বানাতে উঠেপড়ে লেগেছো। সমসাময়িক তোমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দেখে আমি তো হতাশ! ’

শারমিন শামস লিখেছেন, ‘১৪ই এপ্রিল থেকে ২২শে মে। মাস খানেকের মধ্যে ধর্ষণ করে করে সাড়া ফেলে দিলেন আমাদের পুরুষরা। পারফরমেন্স ভালোই! ধর্ষণ তো প্রতিনিয়তই হয়। পাটক্ষেতে, জঙ্গলে, পাকা বাড়িতে, অফিসে, হোটেলে, রান্নাঘরে, বাথরুমে, পাহাড়ে, বাগানে। কোথায় নয়? বাদ ছিল এই মাইক্রোবাস। প্রতিবেশি দেশকে দুবেলা গালি দিয়ে আজ আমাদের বীর পুরুষরাই লুঙ্গি তুলে নেমে পড়লেন। এবার ধর্ষণ হবে বাসে, সিএনজি অটোরিক্সায়, টেম্পুতে, ট্রেনে, ফেরিতে। ’

তদন্ত, গ্রেফতার, চার্জশিট, বিচার, শাস্তি, ফাঁসি, যাবজ্জীবন… নাহ, আর কিছুই দিতে পারেন না আপনারা। শুধু অপেক্ষায় আছি কবে হিজাব পরার, সংযমী হয়ে চলার, ‘মেয়েমানুষ মেয়ে মানুষ হয়ে’ থাকার উপদেশ আসবে আপনাদের কাছ থেকে। আমি নিশ্চিত, এই উপদেশ আসবে শিগগিরই। যাই হোক, বসে থাকবো না আর। মেয়েকে স্কুলে পাঠাবো, নিজে অফিসে যাবো, রাস্তায় চলবো, পথে ঘুরবো, দোকানে-বাজারে-বাসে-ট্রেনে পুরুষাঙ্গধারীরা ধর্ষণ করতে এগোলে সঙ্গে রাখা ছুরি-কাচি-ব্লেড দিয়ে পুরুষাঙ্গ কেটে নেবো। মেয়েকে স্কুলে পাঠাবো অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে। আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে। যদি জন্মেছিই এই দেশে, যেখানে নারীর প্রতি রাষ্ট্রেরও ন্যুনতম মর্যাদাবোধ, সম্মানবোধ নাই, সেখানে আর কী-ইবা করার আছে আমার? আমাদের? এবার তবে নেমে পড়ছি পুরুষাঙ্গ কর্তনে। আর কোন বিকল্প নেই। আর হ্যাঁ, চোখ দিয়ে ধর্ষণ করবে যারা, সেই সব পুরুষকে বলছি, সাবধান হোন, খুঁচিয়ে চোখ তুলে উপড়ে নেবো এইবার!’
আমরা্ও মনে করি, যতদিন পর্যন্ত এই সমাজের মানুষ অন্যায় দেখা মাত্রই প্রতিবাদ করবে না, ততদিন পর্যন্ত এই সমাজে মানুষরূপী পশু বাড়তেই থাকবে। অনেক সময় পার হয়েছে।

হে নারী, অনেক অন্যায়-নির্যাতন-হয়রানি সহ্য করেছো, আর নয়, এবার রুঁখে দাঁড়াও, কোনো ভয় নেই। জয় তোমাদেরই হবে।

হে নারী, তোমরা রুঁখে দাঁড়াও, তোমাদের অধিকার তোমরা আদায় করে নাও। যারা তোমাদের দিকে কুদৃষ্টিতে তাকাবে, প্রতিবাদ করো, তাদের বাড়িতে গিয়ে অভিযোগ দাও। তোমরা জাগো। সময় হয়েছে তোমাদের জাগার। যে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে তোমারা পুরুষদের কাউকে গভীর শ্রদ্ধায় বাবা, কাউকে চাচা-জেঠা, মামা-খালু সম্বোধন করো, আবার কাউকে গভীর ভালোবাসার ছুঁয়ায় জীবন সাথী করে নিতে পারো, সেই হৃদয় দিয়েই পুরুষরূপী নরপশুদের ঘৃণা কর, যে কণ্ঠে ভালো কথা বলে পুরুষদের আপন করে নিতে পারো সেই কণ্ঠে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ধ্বনি উচ্চারণ করো। আর যে হাত দিয়ে প্রিয় মানুষটির মুখে হাত বুলাতে পারো, সে হাত দিয়ে তোমাদেরকেও জুতোও তুলো।

মনে রেখো, এ সমাজ শুধু পুরুষের না, এ সমাজ তোমাদেরও, এ জীবন শুধু পুরুষের না, এ জীবন তোমাদেরও; এই পৃথিবীতে বাঁচার অধিকার শুধু পুরুষের নয়, এই বাঁচার অধিকার তোমাদেরও। মানুষকে ভালোবাসো, আর পশুকে শিক্ষা দাও। জয় হবেই হবে। তাই জেগে ওঠো রোকেয়ার মতো, প্রতিবাদ কর প্রীতিলতার মতো, রুখে দাঁড়াও আমার বোন ইসমত জাহানের মতো।

লেখক: শিক্ষা ও সমাজবিষয়ক গবেষক। ই-মেইল:[email protected]






মন্তব্য চালু নেই