মেইন ম্যেনু

যাবেন নাকি সাপের দেশে

ভাবুন, চারপাশে অথৈ পানি আর মাঝে শুধু জেগে আছে একটি দ্বীপ। অদ্ভুত সবুজ সে দ্বীপের গাছের পাতার রঙ। প্রকৃতি যেন এখনও সেখানে সেই গুহাবাসী মানুষের কালেই পড়ে আছে।
ঘুরতে ঘুরতে সেই দ্বীপে না হয় আপনি চলেই গেলেন। ভাবলেন নগর জীবনের যন্ত্রণা থেকে বেশ খানিকটা রেহাই পাওয়া গেল শেষ পর্যন্ত। মন্দ কী? তারপর দেখলেন এ তো আর দশটা দ্বীপের মতো সাধারণ কোনো দ্বীপ নয়। এ তো রীতিমতো সাপেদের স্বর্গরাজ্য। তাও আবার ভয়ঙ্কর রকমের বিষধর সব সাপদের।
ব্রাজিলের সাও পাওলোর উপকূলে রয়েছে সত্যিকার অর্থেই এমনই এক দ্বীপ। ওই দ্বীপে এমন এমন সব ভয়ঙ্কর সাপের বাস যে ব্রাজিল সরকার বাধ্য হয়ে দ্বীপটিতে সাধারণ মানুষের ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কারণ, দ্বীপটিতে আপনি যাবেন তো ঠিকই জীবন নিয়ে তবে ফেরার নিশ্চয়তা নেই।
পৃথিবীর মধ্যে ডি কুইমাডা গ্র্যান্ডিই একমাত্র দ্বীপ যেখানে গোল্ডেন ল্যান্সহেডকে পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা এ সাপটিকে মহাবিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এদের শরীরের নির্দিষ্ট একটা অংশ হালকা হলদে বাদামী রঙের। গড়ে এদের দৈর্ঘ্য ২৮ ইঞ্চির মতো। তবে সাপগুলো সর্বোচ্চ ৪৬ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। এ সাপটির নামে ‘ল্যান্সহেড’ শব্দটি এসেছে এদের মাথার বিশেষ আকারের কারণে। উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকায় সাপের দংশনে যত মানুষের মৃত্যু হয় তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় এদের দংশনে। এ সাপের দংশনের পর চিকিৎসা নিয়েও মানুষের মৃত্যুর হার ৩ শতাংশ। এরা সাধারণত পাখি ও টিকটিকি খেয়ে জীবনধারণ করে। চূড়ান্ত রকমের ভয়ঙ্কর এই দ্বীপটির নাম ইহা ডি কুইমাডা গ্র্যান্ডি। দ্বীপটিতে যে শুধু পৃথিবীর বিষধর সাপগুলোর প্রায় হাজার চারেকের মতো বাস তাই নয়, বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সবচাইতে বিষধর সাপ গোল্ডেন ল্যান্সহেডেরও বাস এই দ্বীপটিতেই। গোল্ডেন ল্যান্সহেডকে এ দ্বীপটি ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না।
গোল্ডেন ল্যান্সহেডের বিষ এতটাই শক্তিশালী যে এই বিষ মানুষের শরীরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তা শরীরের মাংস পর্যন্ত গলিয়ে দিতে পারে। সাও পাওলো থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে এই নির্জন দ্বীপে কেউ যদি গোল্ডেন ল্যান্সহেডের দংশনের শিকার হয় তবে তার মৃত্যু প্রায় অনিবার্য। তবে ঠিক কীভাবে এই সাপগুলো এতটা বিষধর হয়ে উঠেছে তা একরকমের রহস্যই রয়ে গেছে।
এ তো গেল গোল্ডেন ল্যান্সহেডের কথা। এ দ্বীপের বাকি সাপগুলোও কিন্তু কম নয়। উড়ন্ত পাখি ধরে এরা দিব্যি খেয়ে ফেলতে পারে।
ইহা ডি কুইমাডা গ্র্যান্ডির আয়তন ৪৩০ বর্গমিটার। দ্বীপটিতে ভ্রমণে ব্রাজিল সরকারের নিষেধাজ্ঞা তো রয়েছেই, মানুষ এমনিতেই পারতপক্ষে কুইমাডা গ্র্যান্ডি মুখী হয় না। তবে ওই দ্বীপের ভয়ঙ্কর সাপগুলো নিয়ে গবেষণা করেন এমন কিছু বিজ্ঞানীর দ্বীপটিতে ভ্রমণের অনুমতি রয়েছে। এছাড়া ব্রাজিলীয় নৌবাহিনীর সদস্যদেরও দ্বীপটিতে যেতে হয় প্রায়ই।
ভয়ঙ্কর এ দ্বীপে ভ্রমণ যেন সাক্ষাত মৃত্যুদূতের মুখোমুখীই হওয়া। তারপরও গোল্ডেন ল্যান্সহেড শিকারের আশায় এ দ্বীপটিতে চোরাকারবারীরা প্রায় ঢুঁ মারেন বলেও ধারণা করা হয়। আর কালোবাজারে একটি গোল্ডেন ল্যান্সহেড এরা ২৩ লাখ টাকারও বেশি দামে বিক্রি করেন।
গোল্ডেন ল্যান্সহেডের এতটা বিষধর হয়ে ওঠা নিয়ে যে তত্ত্বগুলো প্রচলিত রয়েছে তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যটির মতে- আজ থেকে প্রায় ১১ হাজার বছর আগে সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ব্রাজিলের মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথক হয়ে যায় ইহা ডি কুইমাডা গ্র্যান্ডি। এতে এই দ্বীপের সাপগুলো একরকমের খাদ্য সঙ্কটে পড়ে। খাবার হিসেবে তাদের হাতের কাছে থেকে যায় সামান্য কিছু অতিথি পাখি।
কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যা ছিল এই বিষ কাজ করতে কখনো কখনো কয়েক দিনও লেগে যেত। ফলে দেখা যেত শিকারের উদ্দেশ্যে এই দ্বীপের সাপগুলো যেসব পাখিকে দংশন করতো সেগুলো মারা যেত অনেক দূরে যেয়ে, কখনো কখনো কয়েকদিন পরও। আর এ সমস্যার কারণে দ্বীপের সাপগুলোর কালের বিবর্তনে নিজেদের এমন বিষধরে সাপে বিকশিত করে ফেলে যা দংশনের কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শিকারের প্রাণনাশে সক্ষম।
বর্তমানে গোল্ডেন ল্যান্সহেডের বিষ অন্য বিষধর সাপগুলোর চেয়ে পাঁচগুণ বেশি শক্তিশালী। আর এর দংশনে মানুষের মৃত্যুর হার সাত শতাংশ।
ভয়ঙ্কর এ দ্বীপটিকে ঘিরে ব্রাজিলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে মুখরোচক নানা কেচ্ছা-কাহিনী।






মন্তব্য চালু নেই