মেইন ম্যেনু

পৃথিবীর নতুন ইতিহাস লিখবে তুরস্ক!

রস্কে ২০০১ সালের জুনে সাংবিধানিক আদালত নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে ভার্চু পার্টির দুটি অংশ তৈরি হয়: সংস্কারপন্থিদের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টি; ঐতিহ্যবাদীদের ফেলিসিটি পার্টি। তুরস্কের সাংবিধানিক আদালত কোনো দলের কার্যক্রম সেক্যুলার বিরোধী বলে মনে করলে সে দলের রাজনৈতিক চাঁদা সংগ্রহ এমনকি দলকেও নিষিদ্ধ করতে পারেন। ইসলামপিন্থ ভার্চু পার্টির ক্ষেত্রে এ আইনই প্রয়োগ করা হয়েছে।

দল নিষিদ্ধ হওয়ার পরই আব্দুল্লাহ গুল, রিচেপ তাইয়েপ এরদোগানদের নেতৃত্বে গঠিত নতুন দলটিতে বাম, ডান সব অতীতের লোকজনই জড়ো হয়। কিন্তু এটা মূলত ইসলামি ঐতিহ্যের ধ্বজাধারী দল হিসেবেই রাজনীতি চর্চা করে। যদিও তারা কৌশলগত কারণে নিজেদের রক্ষণশীল গণতন্ত্রী বলে দাবি করে। যারা দেশীয় ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করেই তুর্কি জাতীয়তাবাদের পুনপ্রতিষ্ঠার লড়াই করছে।

প্রকৃতপক্ষে একে পার্টি সেলজুক তুর্কিদের উত্তরাধিকার হিসেবে ইসলামি ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনেই বেশি আগ্রহী বলে নেতাদের কথা ও কাজে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পরেই তারা অসীম ক্ষমতাবান সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে দুর্দান্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। অবশ্য এর জন্য জমি তৈরিই ছিল। কারণ কামাল আতাতুর্কের ইউরোপীয় সেক্যুলারিজমে অন্ধ আস্থা এবং পরে উন্নয়নের স্বার্থে বৈদেশিক নীতিতে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রতি আনুগত্য তুরস্কে অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাহাড় গড়ে দিয়েছিল। আর এ কারণেই মূলত সাম্যবাদী ইসলামপন্থিদের জন্য সহজ শূন্যস্থান তৈরি হয়েই ছিল।

রক্ষণশীল গণতন্ত্রী বলতে একে পার্টি কী বুঝিয়েছে তা মনে হয় ক্রমেই স্পষ্ট করছেন প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়েপ এরদোগান। ইসলামি/মুসলিম জাতীয়তাবাদের আবেগ থেকে তারা এক চুলও নড়েননি। সম্প্রতি মুসলিম নেতাদের এক সম্মেলনে এরদোগান দাবি করেন, ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের তিনশ বছর আগে মুসলিম নাবিকরা আমেরিকা আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু ইউরোপীয়দের সংকীর্ণতায় চাপা পড়ে গেছে। এতোটুকু বলে থেমে থাকেননি, বলেছেন এর প্রমাণ হিসেবে সেখানে কলম্বাস নাকি একটি মসজিদের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন।

এধরনের কথা এরদোগানের এটাই প্রথম নয়। নির্দিষ্ট অঞ্চলের মুসলিমদের সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে মিলিত হলে তিনি সেই অঞ্চলের সঙ্গে ইসলামের আত্মীয়তার তথ্য দিতে ভুল করেন না। যেমন ইউরোপ, আফ্রিকায় গেলে তিনি সেখানে মুসলিম আগমন ও অবদান তুলে ধরে সবাইকে চমৎকৃত করেন। তেমনি ১৫ নভেম্বর লাতিন আমেরিকার মুসলিম নেতাদের সম্মেলনে ওই বিতর্কিত তথ্যটি দেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট।

তার বক্তব্য নিয়ে তুরস্কের ভেতরে যেমন তেমনি ইউরোপেও প্রতিবাদ হয়েছে। তাকে কম ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করাও হয়নি। অনেকে আবার এরদোগানের আদর্শিক ডিগবাজী প্রমাণেরও চেষ্টা করছেন।

নাইন-ইলেভেন পরবর্তী পরিস্থিতিতে মার্কিন বুদ্ধিজীবী স্যামুয়েল হান্টিংটনের উসকানিমূলক সন্দর্ভ ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ ভুল প্রমাণিত করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে তৎকালীন স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী হোসে লুই হোপাতেরোর সঙ্গে মুসিলম-খ্রিস্টান-ইহুদি সম্প্রীতি আন্দোলনের ডাক দেন এরদোগান। এসময়টাতে মুসিলম খ্রিস্টান আর ইহুদি উত্তেজনা চরমে। পরে এই উদ্যোগটিতে জাতিসংঘ সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে শুরু করেছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় এটি এখন জাতিসংঘের মতোই অকার্যকর।

স্পেনের পত্রিকাগুলো যুক্তি দিচ্ছে, এরদোগান তার সেই আদর্শ থেকে সরে গেছেন। তিনি এখন মুসলিম জাতীয়তাবাদ উসকে দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করছেন। এমনকি সে অনুযায়ী দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পাঠ্যবইও পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

এছাড়া নারী-পুরুষের সমানাধিকারের বিষয় নিয়ে আরেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি। তার মতে, নারী ও পুরুষকে সমান করা প্রকৃতি বিরুদ্ধ। কারণ তারা প্রাকৃতিকভাবেই আলাদা। এখন প্রাকৃতিকভাবে আলাদা বলতে তিনি শুধুই শারীরিক গঠন দিয়ে ডেস্কটপ-ল্যাপটপ কর্মক্ষমতার অবাস্তব পার্থক্য হাজির করার চেষ্টা করেছেন কি না তা স্পষ্ট নয়। তার এক রাজনৈতিক সহকর্মী অবশ্য বলেছেন, এরদোগান তেমন লোক নন যে নারী-পুরুষের মর্যাদায় তিনি বৈষম্য সমর্থন করেন। তিনি শারীরিক পার্থক্যের কথাই বলেছেন বলে তার দাবি।

এই প্রসঙ্গগুলো সামনে আনার কারণে এ প্রশ্নও উঠছে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট তাহলে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছেন কি না। নিজেকে তাহলে বিশ্ব মুসলিম নেতা মনে করছেন তিনি যে ইসলামি ঐতিহ্য ও মোসলমানদের অর্জন নতুন করে তাকে বিশ্ববাসীর সামনে হাজির করতে হবে? এবং একবিংশ শতকে এসে নতুন করে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রয়োজন বোধ করছেন তিনি? রক্ষণশীল গণতন্ত্রী ইসলামি রাজনীতির স্বরূপটা সম্ভবত দেখিয়ে দিচ্ছেন এরদোগান।

তবে এরদোগান যদি নিছক একটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও আস্থার ভিত্তিতে ইতিহান নতুন করে লিখতে চান সেটার পরিনাম হবে ভয়াবহ। এছাড়া এমনিতেই মুসলিম বিশ্বের গায়ে মৌলবাদের কলঙ্ক সেঁটে দেয়া হচ্ছে, এরদোগানের এই ইতিহাস আবিষ্কার পশ্চিমাদের জন্য নতুন অভিযোগের জোগান দেবে। ওদিকে তুর্কি প্রকৌশলীরা ইরাকে আইসিসকে অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করছে। সেখানে মূল টার্গেট তাদের অধিকৃত তেল সম্পদ। অপরদিকে ক্রমেই পরাক্রমশালী হয়ে ওঠা আইসিসকে দমন করতে ইরাকে মার্কিন বিমান অভিযানের পক্ষে থাকলেও সিরিয়াতে তারা এমন অভিযান চায় না। এ কারণে অবশ্য মার্কিন অভিযোগের হিসাবটা মেলানো কঠিন। তারপরও এখানে তুরস্কের জঙ্গি সম্পর্ক প্রমাণের চেষ্টা যে হবে না তা বলা যাবে না।

তবে কথা এখানেই শেষ নয়। ১৫ নভেম্বরের ওই বক্তব্য অনেক গণমাধ্যমে বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হওয়ার অভিযোগও আছে।

একটি বয়ানে আসছে দেশে ফিরে এরদোগান বলেন, ‘আমি বলেছি, কলম্বাসের তিনশ বছর আগে মুসিলমরা আমেরিকা আবিষ্কার করেছে। এটা নতুন কোনো কথা নয়; জার্মানবাসী তুর্কি অধ্যাপক ফুয়াত সেজিনের বইয়ে বিষয়টি আছে। অন্য লেখকেদর বইয়েও পাওয়া যায়। প্রমাণ স্বরূপ, অনেক বিজ্ঞানীই এটা দেখিয়েছেন। এবং মজার ব্যাপারে হলো, বিদেশিদের আগে আমাদের তরুণরাই এই তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে। এমনকি উদীয়মান কলামিস্ট, কার্টুনিস্ট এর বিরুদ্ধে লিখছে। কেন? কারণ তারা বিশ্বাস করতে পারে না যে, একজন মুসলিম এমন একটি কাজ করতে পারে…এটা আত্মবিশ্বাসের অভাব ছাড়া কিছুই নয়।’

এ বয়ানটিতে সরাসরি মুসলিমদের আমেরিকা আবিষ্কারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অপর একটি ভাষ্যে এরদোগানের উদ্ধৃতি হলো: মুসলিম নাবিকরা আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছান কলম্বাসের ৩১৪ বছর আগে, ১১৭৮ সালে। ক্রিস্টোফার কলম্বাস তার আত্মজীবনীতে কিউবা উপকূলে একটি পাহাড়ের চূড়ায় একটি মসজিদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

এরদোগান কিন্তু দাবি করছেন না মুসলিমরাই আগে আমেরিকা আবিষ্কার করেছে বরং তারা ওই মহাদেশে পৌঁছেছে। এবং প্রমাণ হিসেবে কলম্বাসের উদ্ধৃতিই দিয়েছেন। এখানে তার ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের আবেগমথিত অযৌক্তিক দাবি নেই।

তবে একথা সত্য যে, কলম্বাস সমুদ্র অভিযান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। এই ভদ্রলোক নতুন ভূখণ্ড ও অধিবাসীদের যেভাবে নির্বিচারে ইন্ডিয়া আর ইন্ডিয়ান বলে চিহ্নিত করেছেন তাতে মনে হয় তিনি ইন্ডিয়া ছাড়া আর কিছুই চিনতেন না বা জানতেন না।

এরদোগানের তথ্যটি কিন্তু অন্যদের দ্বারাও সমর্থিত। যেমন: ফ্রেডারিক স্টার মনে করেন মুসলিম বিজ্ঞানী আবু রাইহান আল বিরুনীই প্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করেন। অ্যারাবিক ইসলামিক সায়েন্সের প্রফেসর এমেরিটাস ফুয়াত সেজিনও এর সমর্থক। অনেকে এও দাবি করেন, মুসলিমরাই প্রথম আটলান্টিক অতিক্রম করে।

এবার একটা তত্ত্বের কথা বলা যাক: ধরে নেয়া যাক কলম্বাস ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার করেননি। ১৪ হাজার বছর আগে সেখানে কোনো মানুষ বসবাস করতো না। মনে করা হয়, এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে জাহাজ বা নৌকাযোগে পারাপারের সময় একটি মানবগোষ্ঠী বেরিং প্রণালী পাড় হয়ে গেছে আরেকটি পূর্ব আমেরিকায় গিয়ে উঠেছে।

১০০০ সালে ভাইকিংরা গ্রিনল্যান্ডে যায়। তারা বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ডের উপকূলে অবতরণ করে। তারপর তারা আবার গ্রিনল্যন্ডে ফিরে যায়।

এবার জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস ফ্রেডেরিক স্টারের কথায় আসা যাক তিনি বলেছেন, আমেরিকা আবিষ্কার করেছেন একজন মুসলিম তুর্কি।

এটা হতেই পারে। কারণ মুসলিমদের এক সময় শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল। তারা নানা দেশে জলপথে ব্যবসা বাণিজ্য করতো।

এছাড়া জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ, ভূতাত্ত্বিক, ওষুধবিজ্ঞানী এবং ইতিহাসবিদ আবু আল রাইহান আল বিরুনী বেঁচে ছিলেন ৯৭৩ থেকে ১০৪৮ সাল পর্যন্ত। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর ব্যস প্রায় নির্ভুলভাবে মাপতে সক্ষম হন। নিউটনের ৭০০ বছর আগেই তিনি মহাকর্ষ বলের তত্ত্ব দেন। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন আমেরিকা নামে একটি ভূখণ্ড আছে। কিন্তু তিনি সেখানে কখনো সশরীরে যাননি। তিনি ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার নির্ভুল মানচিত্র আঁকেন। জানা ভূখণ্ডের বাকি অংশ শুধুই সমুদ্র এ তত্ত্বও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝামাঝি প্রচুর মানুষের বসতি আছে- এটা তিনিই প্রথম দাবি করেছিলেন। আল বিরুনী উজবেকিস্তানের মানুষ হলেও বসবাস করতে সেলজুক সীমান্তে। সে হিসেবে তিনি অফিসিয়ালি তুর্কি!

ফলে আমেরিকা আবিষ্কার পর্যন্ত হয়ত এরদোগান ঠিকই আছেন। কিন্তু কিউবা উপকূলে পাহাড়ের চূড়ায় কলম্বাসের মসজিদ দেখতে পাওয়ার তথ্য নিয়ে বিব্রত হতে হচ্ছে।

তবে এ কথা ভুললে চলবে না যে, বিজয়ীরা সব সময় ইতিহাস লেখে এবং সঙ্গতকারণেই নিজেদের পক্ষে। এ জন্য ঔপনিবেশিক আর উপনিবেশ, শাসক আর শাসিতের বয়ানে ইতিহাস আজ আলাদা করে লেখার চল হয়েছে। মানুষ নিম্নবর্গের ইতিহাস লিখছে সম্পূর্ণ ওই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বয়ানে। তাতে হয়ত সত্য ইতিহাসের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হচ্ছে কারণ সেখানে আরোপের সুযোগ কম।

লেখক: মুহিব হাসান, সাংবাদিক






মন্তব্য চালু নেই