মেইন ম্যেনু

পা নেই তবুও ব্যাটমিন্টনে দুর্দান্ত তরুণী

হুইল চেয়ারে বসে শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছেন কোর্টের কাছে৷ হাতে র‌্যাকেট৷ শ্যাডো করছেন৷ ব্যথায় কখনো মুখ কুঁচকে যাচ্ছে৷ আবার পরক্ষণেই শ্যাডো ঠিক হলে হাসছেন বছর ত্রিশের তরুণী৷

হাঁটুর নিচ থেকে বাঁ-পা নেই৷ ডান পায়ে বিশেষ জুতো৷ রাজ্যের একমাত্র প্রতিবন্ধী মেয়ে ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় বৈশাখী দেব৷ সপ্তাহখানেক আগে বেঙ্গালুরুতে জাতীয় প্যারা ব্যাডমিন্টনে ব্রোঞ্জ জিতে নেন বৈশাখী৷ সেই ব্রোঞ্জ জয়ের পর ব্যাডমিন্টন নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন তিনি৷

আট বছরে ১৮বার অস্ত্রোপচার হয়েছে তার শরীরে৷ ঘাড় থেকে পা পর্যন্ত ৯৮ খানা স্টিলের পাত বসানো৷ সঙ্গে অসংখ্য স্ক্র৷ তবুও বৈশাখীকে দমানো যাচ্ছে না কোর্টে৷ হুইলচেয়ারে খেলে পদক জেতা এমন উদাহরণ প্রচুর থাকলেও বাংলায় নেই৷

নয় বছর আগে সায়েন্স সিটির কাছে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় গোটা জীবনটাই পাল্টে গেছে বৈশাখীর৷ কাকডাকা ভোরে বিপিওকর্মী বৈশাখী যাচ্ছিলেন অফিসে৷ টাটা সুমোয় ছিলেন প্রেমিক ও সহকর্মী কৌশিক পান্ডে৷

দু’মাস পরই ছিল তাদের বিয়ে৷ গাড়ি দুর্ঘটনায় সেদিন মারা যান কৌশিক ও আর এক সহকর্মী৷ ড্রাইভার ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে লাফ দেয়ায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান৷ বৈশাখী বেঁচে ফেরেন ঠিকই কিন্ত্ত একটি পা হারিয়ে৷ ২০০৬ সালের ২৭ অগস্ট দিনটা ভুলবেন কী করে তিনি?

স্নাতক মেয়েটি আট বছর বিছানায় শুয়েছিলেন প্রায়৷ চাকরিও চলে যায়৷ এখন যে ব্যাডমিন্টন তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন তা সম্বল করেই নতুনভাবে বাঁচার রাস্তায় গাঙ্গুলিবাগানের অশোক ট্রাস্টের মেয়ে৷

এ অবস্থায় ব্যাডমিন্টন? প্রশ্ন সবারই উত্তর আছে বৈশাখীর কাছে৷ কেন পারব না? অবশ্যই পারব৷ আমি চিকিত্‍সার জন্য গোটা দেশ ঘুরেছি৷ শেষ পর্যন্ত ঠিক করেছি ব্যাডমিন্টনই খেলব৷ খেলাটা আমার জানা৷ বাড়িতে বসে জোর গলায় বললেন বৈশাখী৷

একটা সময় সাব-জুনিয়র জাতীয় ব্যাডমিন্টনে রানার্সও হয়েছিলেন৷ একবার নয়, দু’বার৷ একাধিক রাজ্য প্রতিযোগিতায় খেলেছেন৷ প্র্যাক্টিস করতেন রায়পুর কোর্টে, কোচ বিমল পোদ্দারের কাছে৷ পড়াশোনার চাপে আর ব্যাডমিন্টন বেশিদূর হয়নি৷ কিন্ত্ত ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেননি, একদিন এই র‌্যাকেট হাতে ফের তাকে কোর্টে নামতে হবে৷ মাঝে বদলে যাবে জীবনের যাবতীয় দিক৷

দক্ষিণ কলকাতার গাঙ্গুলিবাগানে অশোক ট্রাস্টের নিজের বাড়ির ছাদে চলে একান্তে শ্যাডো প্র্যাক্টিস৷ নিজের হুইল চেয়ার নেই৷ সতীর্থদের কাছ থেকে চেয়ে চিন্তে কাজ চালান৷

একটি হুইলচেয়ারের দাম প্রায় দেড় লাখ টাকা৷ কোথায় পাবেন সেই টাকা? তবু থামছে না তার নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই৷ বৈশাখী বললেন, এক বছর আগে থেকে প্র্যাক্টিস শুরু করেছি৷ তার মধ্যেই জাতীয় মিটে ব্রোঞ্জ৷ বেঙ্গালুরুতে কোচ হিসেবে পেয়েছি আনন্দ কুমারকে৷ তিনি বিশ্বের এক নম্বর প্যারা ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়৷

তার কাছে তালিম নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বড় বাধা টাকা৷ বৈশাখীর জীবনটা এখন প্রখর বৈশাখের মতো৷ প্রখর গরমে শান্তি এনে দিতে পারে একঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া৷ বৈশাখীর জীবনে সেটা হলো চাকরি৷

দুর্ঘটনার তিন বছরের মধ্যে মায়ের মৃত্যু৷ বাবা জীবন দেব কেএমডিএ’র অবসর প্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার৷ জমানো টাকার সবশেষ একমাত্র মেয়ের চিকিত্‍সা করাতে গিয়ে৷ পেনশনের টাকা দু’জনের সংসার চালাতে হিমসিম অবস্থা৷ একটা চাকরি হলে সমস্যা অনেকটাই মিটত৷

গ্র্যাজুয়েট হলেও চাকরি নেই৷ বিভিন্ন মিটে যাওয়ার জন্য ছুটি নেয়ার আব্দার কোনো কোম্পানি কি মেনে নেবে? সবটাই জানেন বৈশাখী৷ বললেন, একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছি৷ কিন্ত্ত সে রকম সুযোগ পাচ্ছি না৷ একটি কোম্পানিতে কাজ করতাম৷ অল্প বেতনে৷ কিন্ত্ত খেলার জন্য ছুটি নিলেই বেতন কাটত৷ তাই ছেড়ে দিতে হলো৷

চিকিত্‍সা একেবারে শেষ, তা নয়৷ শরীর থেকে স্টিলের পাতগুলো বের করতে হবে৷ বের করতে হবে স্ক্রুগুলো৷ চিন্তায় রাতের ঘুম ছুটেছে৷ একসঙ্গে চিন্তা প্যারা ব্যাডমিন্টন সংস্থাকে নিয়ে৷ কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রীর নির্দেশে, জাতীয় প্যারা অলিম্পিক কমিটিকে সাসপেন্ড করা হয়েছে৷

নতুন কমিটি না হওয়া পর্যন্ত কেয়ারটেকার কমিটির হাল দেখে তিতিবিরক্ত বৈশাখী৷ এ রাজ্যের প্যারা অলিম্পিক কমিটি অনেকটা ‘পদ্মপাতায় জল’-এর মতো৷ সবাই বলছে সংস্থা আছে৷ মাঝে-সাঝে দেখা যায়৷ তারপর ভোঁ ভা৷

নাছোড়বান্দা বৈশাখীর নজর এখন আন্তর্জাতিক মিটে খেলা৷ সেখান থেকে পদক নিয়ে দেশে ফেরা৷ জীবনকে এখানেই সার্থক করতে চান বৈশাখী৷

সূত্র : এই সময়






মন্তব্য চালু নেই