৬ ঘণ্টা আকাশে ১৪৯ জনের মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই

যাত্রী ১৪৯ জন। ক্যাপ্টেন (প্রধান পাইলট), ফার্স্ট অফিসার (পাইলট) আর পাঁচজন কেবিন ক্রু। দিনটি ছিল ২২ ডিসেম্বর। ওমানের স্থানীয় সময় তখন রাত তিনটা। গভীর রাতে দেড় শতাধিক আরোহী নিয়ে মাসকট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গর্জন করে আকাশে উড়াল দিতে যাচ্ছিল বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ। গন্তব্য ছিল চট্টগ্রাম। কিন্তু মাসকট বিমানবন্দরে রানওয়ে থেকে উড়াল দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে উড়োজাহাজটিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। মাইক্রোফোনে যাত্রীদের আতঙ্কিত না হতে বলেন ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম। তিনি ও ফার্স্ট অফিসার মেহেদী হাসান বুঝতেও পারছিলেন, কী ঘটেছে। ১৮ টন জ্বালানি আর উড়োজাহাজটির ওজন ৬০ টন। সব মিলিয়ে ৭৮ টন ওজনের বিশাল উড়োজাহাজের ওমানে জরুরি অবতরণ করাও অসম্ভব। একটু এদিক-সেদিক হলেই বিস্ফোরিত হতো উড়োজাহাজটি। প্রাণ যেতে পারত সব আরোহীর। তবে পাঁচ ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় জরুরি অবতরণ করান ক্যাপ্টেন নওশাদ। জীবন রক্ষা পায় দেড় শ যাত্রীর।

দুঃসহ অভিযাত্রার স্বীকৃতিও মিলেছে ক্যাপ্টেন নওশাদের। বৈমানিকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএফএএলপিএ) প্রশংসাপত্র পেয়েছেন ৪০ বছর বয়সী এই বৈমানিক। কানাডার মনট্রিলে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে বৈমানিকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আগামী মে মাসে। ক্যাপ্টেন নওশাদ সেখানে এই দুঃসহ যাত্রার বর্ণনা দেবেন। ৭ জানুয়ারি সকালে ঢাকায় দেশের প্রথম সারির একটি গণমাধ্যমের কাছে পুরো যাত্রাপথের কথা বলেছেন নওশাদ। প্রাণ বাঁচাতে পাঁচ ঘণ্টার আকাশপথে কী ছিল তাঁর ভাবনা—এর সবকিছুই জানা গেল।

উড়াল দিতেই অশনিসংকেত

মাসকট বিমানবন্দরের রানওয়ে ধরে ২৬০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলছিল উড়োজাহাজটি। এ সময় শব্দ শুনতে পান ক্যাপ্টেন নওশাদ। তবে সে সময় ফিরে আসার সুযোগ থাকে না। ইট-পাথর যা–ই সামনে আসুক না কেন, উড়তেই হবে। এ কথা জানিয়ে নওশাদ বলেন, ‘পেছনে যাত্রীরা শব্দ বেশি মাত্রায় শুনতে পান। তাঁদের চিৎকারের কথা কেবিন ক্রুরা আমাকে ও মেহেদী হাসানকে জানান। তখন মাইক্রোফোনে যাত্রীদের বিচলিত না হতে বলি।

৬০০ ফুট উঁচুতে উড়োজাহাজটি উড়লে মাসকট এয়ারপোর্টের নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখান থেকেও বিকট শব্দের কথা আমাদের জানানো হয়। সঙ্গে সঙ্গেই মাসকট বিমানবন্দরের কর্মীরা রানওয়েতে তল্লাশি করেন। ১০ মিনিট পর নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে জানানো হয়, রানওয়েতে টায়ারের অসংখ্য টুকরো তাঁরা পেয়েছেন। তবে উড়োজাহাজের কোন চাকার টায়ারের ক্ষতি হয়েছে, সে ব্যাপারে তথ্য দিতে পারেননি।’

যেভাবে খবর পাঠানো হয় বাংলাদেশে

টায়ার ফেটে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে ক্যাপ্টেন নওশাদের কপালে ভাঁজ আরও পড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘পুরো উড়োজাহাজের বিভিন্ন অংশ তন্নতন্ন করে চেক করি। ইঞ্জিনে কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। ফুয়েল ট্যাংকে সমস্যা নেই। তবে টায়ার বিস্ফোরিত হয়েছে জেনে চিন্তার মাত্রা বেড়ে যায়। কারণ, নোজ ল্যান্ডিং গিয়ারে (উড়োজাহাজের সামনে) দুটি চাকা, পেছনের দিকে দুই পাশে দুটি ল্যান্ডিং গিয়ারে দুটি করে আরও চারটি চাকা রয়েছে। কীভাবে উড়োজাহাজ রানওয়েতে নামাব ভেবে পাচ্ছিলাম না।’

নওশাদ কিছু সময় চিন্তা করতে থাকেন। তিনি প্রথমে ঠিক করেন, যেভাবেই হোক, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করাতে হবে উড়োজাহাজকে। কারণ, চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা হয়তো কম থাকতে পারে। আর টায়ার ফেটে গেলে জরুরি অবতরণের সময় উড়োজাহাজে আগুন ধরার আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ে তুলনামূলক দীর্ঘ। কিন্তু শুধু অবতরণ নয়, শাহজালাল বিমানবন্দরে তো জরুরি অবতরণের বার্তা দিতে হবে। এদিকে নওশাদদের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজে স্যাটেলাইট ফোনের ব্যবস্থা নেই। তবে আকাশপথে এক উড়োজাহাজ থেকে আরেক উড়োজাহাজের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করা যায়।

ক্যাপ্টেন নওশাদ বলেন, ‘ভাগ্য ভালো, আমরা যখন টেক–অফ (উড্ডয়ন) করি, সে সময়ই দুবাই থেকে বাংলাদেশ বিমানের আরেকটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের উড়োজাহাজ চট্টগ্রামের দিকে রওনা দেয়। ওই উড়োজাহাজটি ছিল অত্যাধুনিক। ৭৩৭-৮০০ মডেলের হলেও উড়োজাহাজটিতে রয়েছে স্যাটেলাইট ফোন সিস্টেম। আমাদের দুটি উড়োজাহাজ নিয়ে আমরা ভারত পর্যন্ত একসঙ্গে আসতে পেরেছিলাম।’

আকাশপথে দুই উড়োজাহাজের মধ্যে তিন ঘণ্টা অসংখ্য মেসেজ (বার্তা) আদান-প্রদান করা হয়। ক্যাপ্টেন নওশাদ বলেন, ‘পাশের উড়োজাহাজের পাইলটকে মেসেজ দিই যে ঢাকায় আমরা জরুরি অবতরণ করব—সে কথা যেন শাহজালাল বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষকে জানানো হয়। আমাদের মেসেজ পেয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরে তিন ঘণ্টা ধরে জরুরি অবতরণের প্রস্তুতি চলে।’

ফার্স্ট অফিসার মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন, ‘একটা চাকা বিস্ফোরণের পর অন্য কিছু বিস্ফোরিত হতে পারে। আমরা চিন্তা করছিলাম ল্যান্ডিং গিয়ারে অন্য ক্ষতি হয়েছে কি না। ওমান থেকে আসার পুরোটা সময় বইপত্র পড়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম ক্ষতির মাত্রা কতটুকু হতে পারে। সেই ক্ষতি থেকে কীভাবে উড়োজাহাজ ও যাত্রীদের বাঁচানো যেতে পারে—এসব বিষয় আলোচনা করছিলাম।’

জরুরি অবতরণেও ছিল বিপত্তি

৭৮ টন ওজনের উড়োজাহাজটি যতটা হালকা করা যাবে, জরুরি অবতরণে ঝুঁকি ততটাই কমে আসবে। এ জন্য জ্বালানি কমাতে হবে। ক্যাপ্টেন নওশাদ বলেন, ‘ঢাকার আকাশে আসতে আসতে জ্বালানি কমে যায় ১২ টন। উড়োজাহাজের দুই ডানার ফুয়েল ট্যাংকে আরও ছয় টন জ্বালানি ছিল। তা আরও কমাতে হবে। তাই সকাল নয়টার দিকে ঢাকার আকাশে এক ঘণ্টা চক্কর দিতে থাকি। কুয়াশায় ঢাকা ছিল শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ে। উড়োজাহাজের অবতরণও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তখন।’

উড়োজাহাজের ঢাকায় আসার কথা শুনে যাত্রীরা কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। ক্যাপ্টেন নওশাদ বলেন, ‘চাকার সমস্যা ও কুয়াশার কথা বলে ঢাকায় ল্যান্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত জানাই যাত্রীদের। বড় বিপদে আছি, সেটি বুঝতেই দিইনি।’

বাতাসের বেগ সামলে অবতরণ

শাহজালাল বিমানবন্দরের সাড়ে ১০ হাজার ফুট দীর্ঘ রানওয়েতে উত্তর প্রান্ত থেকে উড়োজাহাজগুলোকে নামতে হয়। কিন্তু উত্তর দিক থেকে সেদিন সকালে প্রচণ্ড বাতাস বইছিল। চাকার সমস্যা থাকায় ৩০০ কিলোমিটার গতিতে থাকা উড়োজাহাজে ব্রেক করাও যাবে না। ক্যাপ্টেন নওশাদ বলেন, ‘সামনের চাকার ল্যান্ডিং গিয়ার ও টায়ারে সমস্যা যদি থাকে, তবে ব্রেক করলে উড়োজাহাজ আছড়ে পড়তে পারে। পেছনের চাকায় সমস্যা হলে উড়োজাহাজ কাত হয়ে রানওয়ের সঙ্গে ডানার ঘষা লাগবে। এতে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে নিচ দিয়ে চক্কর দিতে বলা হয়। এতে কোন চাকার টায়ার ফেটেছে, তা ধরা পড়বে। দুবার চক্কর দিলে বলা হয়, পেছনের বাঁ দিকে ল্যান্ডিং গিয়ারের ডান পাশের চাকার টায়ার ফেটেছে। বাঁ পাশের চাকা ঠিক আছে।’

এক চাকা ঠিক থাকায় ঝুঁকি কিছুটা কমে আসে। ক্যাপ্টেন নওশাদ বলেন, ‘বাতাস থাকায় উত্তর প্রান্তের বদলে রানওয়ের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে সকাল ১০টা ৭ মিনিটে অবতরণ করে উড়োজাহাজটি। এ জন্য রিভার্স করে উড়োজাহাজের গতি কমানো হয়। এ সময় বাঁ পাশের চাকার টায়ার ফেটে যায়। সৌভাগ্য যে, ল্যান্ডিং গিয়ার থেকে টায়ারটি ছুটে যায়নি। আর ১০ মিনিট চলে গেলে জ্বালানিও ফুরাত, বিপদও বাড়ত।’ #প্র/আ



মন্তব্য চালু নেই