ট্রাফিক আইন অমান্যে জেল, বাতিল হবে ড্রাইভিং লাইসেন্স

ট্রাফিক আইন অমান্যে এখন পর্যন্ত পুলিশ যে ব্যবস্থা নেয় সেটি হলো মামলা। সেই মামলায় সাজা হচ্ছে জরিমানা। নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট অংকের টাকা জমা দিলে বাজেয়াপ্ত করা কাগজ ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এই পদ্ধতি থেকে সরে সরকার উন্নত বিশ্বের মতই একটি পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে, যাতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে জেল-জরিমানার পাশাপাশি কাটা যাবে পয়েন্ট। এক পর্যায়ে বাতিল হবে ড্রাইভিং লাইসেন্স।

একই ব্যক্তি একই ধরনের অপরাধ এর আগেও করেছেন কি না, সেটি বিবেচনা করা হয় না বর্তমান জরিমানা পদ্ধতির বেলায়। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে একই অপরাধ আবার করলে সাজা হবে কমপক্ষে দ্বিগুণ।

নতুন বিধান অনুযায়ী প্রতিটি ড্রাইভিং লাইসেন্সে থাকবে ১২ পয়েন্ট। আইন অমান্য হলে অন্যান্য কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের পাশাপাশি কাটা যাবে একটি করে পয়েন্ট। আর কারও লাইসেন্সে পয়েন্ট শূন্য হয়ে গেলে তিনি আর গাড়ি চালাতে পারবেন না। আর পয়েন্ট কাটা যাবে মোট ১৪টি অপরাধে।

প্রতিটি অপরাধেই জেল-জরিমানার বিধানকে বাড়াবাড়ি বলছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে আছে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক সংকেত অমান্য, মোটরযানের নকশা পরিবর্তন, উচ্চ শব্দে হর্ন বা ইঞ্জিন দূষণ করলেই জরিমানার পাশাপাশি হতে পারে কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দুর্ঘটনা গবেষণা সেন্টারের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান এত বেশি পরিমাণে শাস্তির বিষয়টিতে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জেল-জরিমানা করলেই তো সমস্যার সমাধান হবে না। আগে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমাদের আইনটি অস্পষ্ট। এতে শুধু শাস্তির কথা বলা আছে, কিন্তু সেটাও এক পক্ষের। যানবাহন মালিকের দায় আছে, পথচারীর দায় আছে, এসব বিষয় এখানে নেই।’

তবে আইনে ট্রাফিক আইন অমান্য করলে চালকের পয়েন্ট কাটা যাওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছেন এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, পৃথিবীর উন্নত দেশেও এই পদ্ধতি আছে। এতে ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা কমবে।

মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া সড়ক পরিবহন আইনের খড়সায় এমন বিধান রাখা হয়েছে। তবে আইনটি এখনও সংসদে পাস হয়নি। তাই এই পদ্ধতিতে এখনও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

তবে মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন দেয়ার পরও আরও কিছু প্রক্রিয়া বাদ আছে। এখন খসড়াটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে আইন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে ভেটিং শেষে আবার আসবে মন্ত্রিসভায়। সেখানে চূড়ান্ত অনুমোদন হলে পাঠানো হবে সংসদে। সেখানে পাস হলে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হবে আইনটি।

সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, খসড়ায় শাস্তির কথা একটু বেশিই লেখা আছে। ভেটিং এবং চূড়ান্ত অনুমোদন আর সংসদে পাসের আগে এটি কমতেও পারে।

যেসব ক্ষেত্রে কাটা হবে পয়েন্ট

এই আইনে মোট ১৪টি কারণে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটার কথা বলা আছে। এর মধ্যে ১৩টি ক্ষেত্রে অপরাধ করলে একটি করে পয়েন্ট এবং একটি ক্ষেত্রে দুটো পয়েন্ট কাটার কথা বলা আছে আইনে।

এই ১৪টি অপরাধেই আবার পয়েন্ট কাটার পাশাপাশি জেল, জরিমানা অথবা উভয় দ- হতে পারে। এর মধ্যে নিবন্ধন ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ দণ্ডের কথা বলা আছে। এ ক্ষেত্রে দণ্ড হতে পারে তিন বছরের জেল অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।

রুট পারমিট অনুযায়ী যে সড়ক ধরে চলার কথা তার বদলে অন্য সড়ক দিয়ে চললে অনধিক তিনমাসের কারাদ- বা ৩৫ হাজার টাকা জরিমানার পাশাপাশি কাটা যাবে এক পয়েন্ট কাটা যাবে।

ব্যক্তিগত মোটরযানের বাণিজ্যিক ব্যবহার হলেও একই দণ্ডের কথা বলা আছে।

সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করলেও এক বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। পাশাপাশি কাটা যাবে একটি পয়েন্ট।

মোটরযানের নকশা বহির্ভূত পরিবর্তন করা হলেও ছয়মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এ ক্ষেত্রেও টাকা যাবে কাটা যাবে একটি পয়েন্ট।

ট্রাফিক সংকেত অমান্য করে গাড়ি চালালে দুই বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি দুই লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। এই অপরাধেও এক পয়েন্ট কাটা যাবে।

নির্ধারিত গতিসীমার চেয়ে বেশি গড়িতে গাড়ি চালালেও সাজা হবে। এ ক্ষেত্রেও দুই বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি দুই লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। পাশাপাশি কাটা যাবে আরও একটি পয়েন্ট।

গাড়িতে নির্ধারিত ওজনসীমার চেয়ে বেশি মালামাল বহন করলে সাজা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছরের কারাদণ্ড অথচা তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ড। এই অপরাধেও কাটা যাবে এক পয়েন্ট।

নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে উচ্চশব্দে হর্ন বাজালে অনধিক তিনমাসের কারাদ-ের পাশাপাশি ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এ ক্ষেত্রেও কাটা হবে এক পয়েন্ট।

ইঞ্জিন পরিবেশ দূষণ করলেও তিনমাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এ ক্ষেত্রেও কাটা যাবে এক পয়েন্ট।
যেখানে সেখানে পার্কিং বা যেখানে গাড়ি থামানো নিষেধ সেখানে দাঁড়ালে তিনমাসের কারাদ-র পাশাপাশি জরিমানা হতে পারে ৩৫ হাজার টাকা। এই অপরাধেও ড্রাইভিং লাইসেন্সের এক পয়েন্ট কাটা যাবে।

মহাসড়কে চলাচল করা নিষিদ্ধ এমন গাড়ি নিয়ে উঠলে এক মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। পাশাপাশি কাটা হবে এক পয়েন্ট।

স্যালো মেশিন বা এ জাতীয় যন্ত্র নিয়ে যানবাহন তৈরি করে যাত্রী বহন করলে একমাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। সেই সঙ্গে কাটা যাবে একটি পয়েন্ট।

যানবাহনের বিমা করা না থাকলে ছয়মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এ ক্ষেত্রেও কাটা হবে একটি পয়েন্ট।

এ ছাড়া মোটরযানের নিবন্ধন না থাকলে তিন বছরের কারাদণ্ডে এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। এই অপরাধে কাটা হবে দুই পয়েন্ট।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মফিজ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘এই আইনটা আমি এখনও দেখিনি। তবে আইনটি পাস হওয়ার পরে পুলিশ যখন রাস্তায় কাজ করবে তখন এ বিষয় নিয়ে কথা বলা যাবে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘নট ব্যাড, কেউ অপরাধ করলে তার শাস্তি পাবে। এতে আমাদের কিছু বলা নেই।’



মন্তব্য চালু নেই