চোখের জলে ভিজল কাঁটাতারের বেড়া

প্রায় ২০ বছর পর দেখা হলো মা-মেয়ের। আনন্দে-আবেগে দুজনের চোখ বেয়ে নেমে এল জল। হলো কুশলবিনিময়ও। কিন্তু পরস্পরকে ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হয় না তাঁদের। কেননা, দুজনের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করে দিয়েছে কাঁটাতারের বেড়া।

বেড়ার এপাশে (বাংলাদেশে) বৃদ্ধা মা সরলা রানী (৮০)। ওপাশে (ভারতে) মেয়ে ফুলমতি (৪০)। মা-মেয়েতে দেখা দীর্ঘদিন পর দেখা হলো। কিছুক্ষণ পরপরই দুজনই থেমে থেমে কেঁদে উঠছেন। ২০ বছর আগে বিয়ে হওয়ার পর থেকে পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের উৎকুড়া বানিয়াপাড়া গ্রামের ফুলমতি (৪০) থাকছেন ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার ভক্তিনগর থানার আশিঘর গ্রামে। সরলা রানীর ভাষায়, ‘ওয় দুনিয়াত আসিবার (জন্ম) পর যেনং শরীরটা হালকা লাগিছিল, আইজকা দেখা হবার পর বুকটা ওনং আরও হালকা হইল। মনে হছে, বুকের উপর থিকা বড় একটা পাথর নামে গেল।’

একইভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির ইজারউদ্দিন (৬০) এসেছেন পঞ্চগড়ের শামসুল হকের সঙ্গে দেখা করতে। দুজনে সম্পর্কে ভাই। যখন দেখা হলো, দুজনের চোখ বেয়ে গড়িয়ে এল জল। তারপর ছেলে-মেয়েসহ নানা বিষয়ে দুজন দুজনের খোঁজখবর নিলেন।

পয়লা বৈশাখে দুই দেশের সীমান্তে জড়ো হয়ে কুশল বিনিময় করেন দুই বাংলায় বসবাসকারী স্বজনেরা। ছবি: প্রথম আলো
পয়লা বৈশাখে দুই দেশের সীমান্তে জড়ো হয়ে কুশল বিনিময় করেন দুই বাংলায় বসবাসকারী স্বজনেরা। ছবি: প্রথম আলো
দুই দেশকে আলাদা করতে নির্মাণ করা হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। এ বেড়া ভূখণ্ডকে আলাদা করলেও দুই দেশের মানুষের হৃদয়কে বিভক্ত করতে পারেনি। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে পঞ্চগড়ের অমরখানা সীমান্তে কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়েই মনের ভাব প্রকাশ করেছেন দুই বাংলার মানুষ।

সদর উপজেলার অমরখানা বিওপির অমরখানা সীমান্তে ৭৪৩, ৭৪৪ ও ৭৪৫ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের মাঝে বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে আজ শুক্রবার এভাবেই হয় দুই বাংলার মানুষের অনানুষ্ঠানিক মিলনমেলা। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নির্ধারণকারী কাঁটাতারের দুই পাশ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত স্বজনদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

এ সময় দেখা যায়, স্বজনদের দেওয়ার জন্য কেউ কেউ কাঁটাতারের ওপর দিয়ে বিস্কুট, চানাচুর, কোমল পানীয়, ইলিশ মাছ ও নতুন জামা কাপড় ছুড়ে দিচ্ছেন একে অপরকে। কেউ কেউ বেড়ার এপার-ওপার হাত নাড়িয়ে এবং উচ্চ স্বরে কথা বলে স্বজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। স্বজন ও পরিচিতদের দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠেন। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে এ কান্না বিরহের নয়, মধুর মিলনের।

সীমান্ত এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এদিন ভোর থেকে দুই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন এসে জড়ো হন। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ করে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা দুই দেশের লোকজন একে অপরের সঙ্গে দেখা করেন। স্বজনদের মিলনে আর দুই দেশের অগণিত মানুষের উপস্থিতিতে এখানে এক বিরল দৃশ্যের অবতারণা হয়। যেন এ দিনের অপেক্ষায় সবাই উন্মুখ ছিলেন। বাংলা বছরের প্রথম দিন এ দেশের মানুষ ওপার বাংলায় থাকা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করেন। যাঁরা অর্থাভাবে পাসপোর্ট, ভিসা করতে পারেন না, তাঁরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তাঁদের অনেক আত্মীয়স্বজন ভারতীয় অংশে পড়েন। এর ফলে অনেকেরই যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে তারা উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর অলিখিত সম্মতিতে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে সীমান্তবর্তী এলাকায় এসে দেখা সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান।

ভারতের শিলিগুড়িতে থাকা আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসা পঞ্চগড়ের আবদুল লতিফ জানান, ‘প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে ওপার বাংলায় থাকা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের খোঁজখবর নিই। খালাতো ভাইকে মাছ দিয়েছি, ওরা শাড়ি দিয়েছে।’ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এদিন আমরা সীমান্তে জিরো লাইনে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করি।’

পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আল হাকিম মোহাম্মদ নওশাদ বলেন, প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে অনুমতিক্রমে এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের ১৫৫ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাঁটাতারের পাশে দুই দেশের নাগরিকদের দেখা করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। বিজিবি সদস্যদের নজরদারিতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই লোকজন যে যাঁর মতো করে কুশল বিনিময় করেছেন। নির্ধারিত সময়ের পর সবাই যে যার গন্তব্যে চলে যান।



মন্তব্য চালু নেই