মেইন ম্যেনু

পাহাড় ধস ট্র্যাজেডির সাত বছর

১১ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ৬৬৬ পরিবারের বাস

চলতি বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামে ফের ভয়াবহ পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে। অতিবৃষ্টি ও শক্তিশালী ভূমিকম্পে যে কোনো মুহূর্তে মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থিত ১৩টি পাহাড় ধসে পড়তে পারে বলে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির এক প্রতিবেদনেও নগরীর ৩০টি পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বরাবর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হলেও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে এখনো ১১টি ঝুকিপূর্ণ পাহাড়ে ৬৬৬টি পরিবার বসবাস করছে।

দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট পারফরমেন্সের (সিডিএমপি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, শুধু বর্ষণের কারণে নয়, ভূমিকম্পেও চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের ব্যাপক জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত। চট্টগ্রাম মিয়ানমার সীমান্তবর্তী। ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট প্রতিবছর ৬ সেন্টিমিটার এবং বার্মাপ্লেট ২ সেন্টিমিটার করে বাংলাদেশকে ধাক্কা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারে টেকটোনিক প্লেটের অবস্থান। এই প্লেটটি কক্সবাজার থেকে ৩০ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই প্লেট থেকে ১৭৬২ সালে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এ পর্যন্ত ওই ফল্ট লাইনে আর কোনো বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি। এই ফল্ট লাইনে ২৪৮ বছর ধরে শক্তি সঞ্চিত থাকায় যে কোনো মুহূর্তে চট্টগ্রামে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। যার ফলে মুহূর্তে ঘটতে পারে পাহাড় ধস। এতে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হবে। বৃষ্টির সময় ভূমিকম্প হলে কাদামাটির কারণে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে বহুগুণ।

চট্টগ্রাম মহানগর এবং সংলগ্ন এলাকার পাহাড়গুলোর মধ্যে ১৩টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড়গুলো হচ্ছে: বাটালি হিল, টাইগারপাস ইন্ট্রাকো সংলগ্ন পাহাড়, বিআইটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, ইস্পাহানি পাহাড়, শেরশাহ মীর পাহাড়, একে খান পাহাড়, টাইগারপাস জেলা পরিষদ পাহাড়, লেকসিটি আবাসিক এলাকার সংলগ্ন পাহাড়, সিডিএ অ্যাভিনিউ পাহাড়, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট পাহাড়, চটেশ্বরী জেমস ফিনলে পাহাড়, কবইল্যাধাম পাহাড় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পাহাড়।

এসব পাহাড়ে বালির পরিমাণ বেশি। বৃষ্টির সময় বালিতে পানি ঢুকে নরম হওয়ার পর ধসে পড়ে। বৃষ্টি ছাড়া ভূমিকম্পেও যে কোনো মুহূর্তে পাহাড়গুলো ধসে পড়তে পারে। বাটালি হিলের বর্তমান অবস্থান সমতলের সঙ্গে ৭৫ ডিগ্রিতে। কোনো দেয়াল নির্মাণ করে এ পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দরকার আধুনিক এবং সঠিক পরিকল্পনা। আর এ ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ কঠিন, সময় সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুলও নয়। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নেপাল ও চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সঠিক নিয়মে পাহাড় সংরক্ষণ করছে। তাতে তারা সুফলও পাচ্ছে। যারা চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর মালিকদের সঠিক নিয়মে পাহাড় সংরক্ষণে বাধ্য করতে হবে। যে পাহাড় ন্যাড়া তাতে ঘাস ও গাছ লাগিয়ে আচ্ছাদন তৈরি করার কথা দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর মধ্যে প্রতিটি পাহাড়ে গড়ে দেড়শ’ থেকে দু’শ পরিবার বসবাস করে থাকে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা। এসব স্থাপনায় রয়েছে অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ। দুর্যোগ দেখা দিলে এসব পাহাড়ে উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা অসম্ভব হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাতে পাহাড় ধসে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার শুরু করা যায় না বলে প্রাণহানী বেশি ঘটে। পাশাপাশি বিভিন্ন মালামাল রক্ষা করার তেমন সুযোগ না থাকায় চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ধসে প্রাণহানীর পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে কেড়ে নেয় প্রায় দেড়শ’ নিরীহ প্রাণ। এরপর বিভিন্ন মহলের নানা তৎপরতা শুরু হলেও এখনো পর্যন্ত কোনো সুফল মেলেনি। পাহাড় ধস প্রতিরোধ কমিটি নানা জরিপ চালিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব দিলেও বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘ দিন ধরে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের জুন মানে বাটালি হিলে আবার পাহাড় ধসে ১৭ জনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে প্রতিবছর প্রাণহানীর ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্ট মহল এ নিয়ে নানা উদ্যোগের কথা বললেও এখনো পাহাড় ধস রোধে চট্টগ্রামে কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি।

এদিকে গত রোববার বিকেলে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ১৩তম সভায় পাহড় ধসে প্রাণহানী ঠেকাতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই সভায় নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি পাহাড়কে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া ১১টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী ৬৬৬টি পরিবারকেও চিহ্নিত করা হয়। বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে বসবাসকারী পরিবারগুলোর অবৈধ বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ভিসি ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি পাহাড় ধসের ফলে ফের ব্যাপক প্রাণহানীর শঙ্কা আছে। সমীক্ষা অনুযায়ী শুধু ১৩টি নয়, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর সব পাহাড়ই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতি রোধে পাহাড়কে পাহাড়ের স্বরূপে থাকতে দিতে হবে। সেখানে বসবাসকারীদের অতি দ্রুত সরিয়ে দিতে হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়গুলোকে যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে না পারলেও ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে।’

পাহাড়ধস রোধে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অনেক সুপারিশ করা হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। যার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড়ধসে প্রাণহানী ঘটছেই। এছাড়া পাহাড় ধসে দুর্যোগে যে পরিমাণ ক্ষতি হবে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে আমাদের প্রস্তুতি না থাকার কারণে। জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রস্তুতির কারণে বিভিন্ন দুর্যোগের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছে। আমাদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ, সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা, পিডিবি ও স্বাস্থ্য বিভাগসহ কারো কোনো প্রস্তুতি আছে বলে আমার জানা নেই। তাই যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলা আমাদের জন্য দুরহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ জনসাধরণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সবচেয়ে বড় কাজ বলে মনে করেন এ বিশেষজ্ঞ।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এসএম আব্দুল কাদের বলেন, ‘পাহাড়ে যারা অবৈধভাবে বসতি স্থাপন করছে তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া পাহাড় ধস ঠেকাতে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি সচেতনামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করেন তাদের পুনর্বাসনে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সেটি আসলে পুরোপুরি বাস্তাবায়ন সম্ভব হয়নি। কিছু জটিলতার কারণে সেটিও আটকে আছে। এছাড়া এগুলো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।’






মন্তব্য চালু নেই