মেইন ম্যেনু

রাজনীতি এবং অর্থনীতি

রাজনীতি ও অর্থনীতি। দু’টি ভিন্ন শব্দ। রাজনীতিতে অর্থনীতি কিংবা অর্থনীতিতে রাজনীতি। রাজনীতি এবং অর্থনীতি নাকি রাজনৈতিক অর্থনীতি। এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোনে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে রাজনীতি এবং অর্থনীতির সম্পর্ককে। পলিটিক্যাল ইকোনমিতেতো রাষ্ট্র ও সরকারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের স্বরুপ নির্নয়, সমস্যা, সম্ভাবনা ও বাস্তবায়ন নিয়েই আলোচনা পর্যালোচনা করা হয়। অর্থনৈতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের ধন সম্পদ আয় পন্যের উপকরন এবং জাতীয় আয়ের বন্টন সম্পর্কিত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা হয় যার মধ্য দিয়ে প্রমানিত হয়  রাজনীতি ও অর্থনীতি কর্মকান্ডের সম্পর্ক পারস্পরিক অর্থাৎ রাজনীতি প্রভাবিত করে অর্থনীতিকে আবার অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করতে দেখা যায় রাজনীতিকে। ইদানিং রাজনীতি এবং অর্থনীতির সম্পর্ক বেশ গাঢ় হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা পূর্ব পরাধীনতার যুগে, রাজনীতি এবং অর্থনীতি শব্দ দুটো সম্পর্কে এতটা গভীর বিশ্লেষনে না গেলেও আসলে স্বাধীনতা পূর্ব রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক শক্তি ছিল অর্থনীতির চালচিত্র। সেসময় শোষক পকিস্তানীরা অর্থনৈতিকভাবে বাঙ্গালীদের  প্রতি শোষন অব্যাহত রাখায় শোষিত বাঙ্গালী পিষ্ট হতে হতে ক্রমান্বয়ে রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠেছিলো। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে বাঙ্গালীরা প্রথমে সংগঠিত হয়ে উঠলেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে যখন গভীরভাবে আত্বস্ত করতে শুরু করছে তখনি রাজনৈতিক সচেতনতা, সম্পৃক্ততা বেড়ে গেছে দ্রুত।
শাসক পাকিস্তানীদের শোষনের মাত্রা অর্থনীতির বৈষম্যের ফলে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় বাঙ্গালীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করার চেতনা দৃঢ়তর হয়েছে। ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন-শ্রমিক আন্দোলন-সাংস্কৃতিক আন্দোলন তথা সরকার বিরোধী সব আন্দোলনের প্রানশক্তি ছিল অর্থনীতির বৈষম্যের করুন দশা। রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগে প্রকাশিত শাসক পশ্চিম পাকিস্তানীদের সৃষ্ট অর্থনৈতিক বৈষম্যের পোষ্টারগুলোর ইতিবাচক ভূমিকা ছিল ব্যাপক। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হলেও স্বাধীনতা পূর্ব রাজনীতিতে অর্থনীতির বিষয়টা একটি ফ্যাক্টর ছিল অর্থাৎ অর্থনীতিরি চালচিত্র রাজনৈতিক অংগগুলোকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এটা রাজনীতি এবং অর্থনীতির সর্ম্পকের একটা অংশ ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্থনীতি এবং রাজনীতির সম্পর্কটা বিশ্লেষন করার ক্ষেত্রে সে সময়ের জাতীয় অর্থনীতির চরিত্রের দিকে নজর দিতে হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির উপরি বেশি গুরুত্ব দেয়। জাতীয়করনের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার বিতর্কিত চেষ্টা চালায় তৎকালীন আওয়ামী সরকার। সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে তারা সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটানোর প্রয়াস চালায়। যার প্রমান মেলে তৎকালীন বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে তাদের স্পেশাল সখ্যতা গড়ে তোলার আগ্রহের মাধ্যমেই। সে সময় কম্যুনিজম দেশগুলোর সাথে সরকারের সখ্যতা কম্যুনিজম রাজনীতি, অর্থনীতির প্রতি দুর্বলতারি ফল। ’৭৫ পরবর্তী সরকার তার রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় অর্থনীতিকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে জাতীয়করন, সমাজতান্ত্রিক মন মানসিকতার বিপরীত ধারার প্রতি আগ্রহ দেখায়। তারা বেসরকারীকরন প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়। যার ফলশ্রুতিতে মুক্তবাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রসার ঘটতে থাকে। এভাবেই রাজনীতির সাথে অর্থনীতি জড়িয়ে যায়। সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, ধনতান্ত্রিক তথা মুক্ত বাজার অর্থনীতি যে ব্যবস্থাই হোক না কেন তা রাজনীতি-অর্থনীতির সম্পর্কের  লক্ষণ। এটা রাজনীতি, অর্থনীতির একদিক। এর বাইরে রাজনীতি-অর্থনীতির মাঝে ভিন্ন মাত্রায় সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। অর্থনীতি বিতর্কিতভাবে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করতে পারে রাজনীতিকে, রাজনীতিবিদদেরকে। রাজনীতিবিদরা অর্থনীতির দ্বারা অনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়লে রাজনীতি কলুষিত হয়ে পড়তে বাধ্য। ইদানিং এ কাজও হচেছ। বড় বড় রাজনৈতিক দলের বড় মাপের অনেক নেতারাও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার লোভে কিংবা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধা নিয়ে রাজনীতিকে কলুষিত করার অপচেষ্টা চালাচেছ বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অর্থনীতি-অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে রাজনীতি-রাজনৈতিক দল-রাজনীতিবিদরা প্রভাবিত হলে কিংবা জিম্মী হয়ে গেলে তখন লুটপাটের রাজনীতি কায়েম হয়ে যেতে পারে। যা কোনভাবেই রাজনৈতিক পরিবেশকে স্বচছ-সুন্দর রাখতে পারে না। রাজনীতি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে অর্থনীতি যদি রাজনীতিকে অনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রন করে তবে তার খেসারত গোটা দেশ-জাতিকে দিতে বাধ্য। রাজনীতির প্রতি জনগনের বিশ্বাস ভেংগে যায়। জাতীয় রাজনীতি-রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকান্ডের গতি বৃদ্ধিতে অর্থনীতি টনিক হিসাবে কাজ করতে পারে। সরকার দলের কর্মকান্ডে জাতীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে থাকলে বিরোধী দলগুলোও নড়া চড়া করে উঠে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জাতীয় সেবামূল্য বৃদ্ধিতে ভূক্তভোগী জনমনে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, রাজনীতির মাঠ গরম হয়। ন্যায্য মজুরীর দাবিতেও সুযোগ খুঁজে রাজনৈতিক দলগুলো পরিনতিতে রাজনীতির মাঠ গরম হয়। অর্থনীতি এবং রাজনীতির সম্পর্কের অবনতির কারনে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়ে থাকে। সমাজতন্ত্রের ভাষায় অর্থ বৈষম্য তথা অর্থনীতিই সমাজ বদলের রাজনীতির মূল উৎস। সমাজতান্ত্রিকদের দৃষ্টিতে শোষক বুর্জোয়াদের হাত থেকে ক্ষমতা নিজেদের অনকুলে নেয়ার টার্গেটেই শোষিতরা বিপ্লবী হয়ে উঠে। বিপ্লবী দল গড়ে বিপ্লবের রাজনীতির প্রচার-প্রসার ঘটায়। কিন্তু অর্থলোভী সুবিধাভোগী এক শ্রেনীর নেতা-কর্মীদের কাছে রাজনীতি এখন বিনা পূঁজিতে লাভজনক ব্যবসাতে পরিণত হচেছ। পুজিবাদী-ভোগবাদী গণতন্ত্রের রাজনীতিতে অর্থনীতির নৈতিক স্খলনজনিত ভূমিকা কখনোই প্রকৃত শোষিত বঞ্চিত শ্রেনীর সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনতে সক্ষম নয় বলে সমাজতন্ত্রীরা মনে করে থাকে। সমাজতন্ত্রীদের ভাষায়  বুর্জোয়াতন্ত্রে অর্থই সব কিছুর নিয়ন্ত্রক, রাজনীতিও। পশ্চিম পাকিস্তানীদের সীমাহীন অর্থনৈতিক বৈষম্য আমাদেরকে স্বাধীনতার প্রবল চেতনায় উদ্ধুদ্ধ করেছিল। রাজনীতিকে গতিশীল করেছিল। ত্রিশ লক্ষ শহীদের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, মানচিত্র পেয়েছি, পতাকা পেয়েছি, ভূ-খন্ড পেয়েছি, কিন্তু আজো আমাদের রাজনীতি আমাদের অর্থনীতিকে বৈষম্যহীন করতে পারে নি। আমরা রাজনীতি-অর্থনীতির সম্পর্কে ইতিবাচক ভূমিকা দেখাতে পারছি না। আমাদের রাজনীতি অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারছে না। রাজনীতি প্রায় ক্ষেত্রে অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে। সরকারী দলের ব্যর্থতার লুজ বল বিরোধী দলকে ছক্কা মারার সুযোগ করে দেয়ায় বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধে অর্থনীতি ধ্বংস  হচেছ। অবাধে ব্যাংক লুটপাট, শেয়ার বাজারের ধ্বস বিনিয়োগে নিরুৎসাহ এসব ঘটনা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ার দায়ভার  সরকারের ঘাড়ে চাপছে। জাতীয় রাজনীতির মেরুদন্ড ভেংগে যাচেছ। রাজনীতি-রাজনৈতিক দলগুলো অর্থনীতির চাকাকে সচল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারছে না। কিন্তু বাস্তবিক কারনেই এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের স্বার্থে রাজনীতিকে পরিচালিত করা। এ লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত কর্মসূচী প্রনয়ন করা অর্থাৎ অর্থনীতির উন্নয়ন স¤পৃক্ত  কর্মসূচী গ্রহন করা। যাতে অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়ক হয়।  আজকে আমাদের পতাকা আছে, মানচিত্র আছে-স্বাধীনতা আছে-সার্বভৌমত্ব-গণতন্ত্র আছে কাজেই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম লক্ষ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক উন্নয়নে, অর্থনীতির বিপ্লব সাধনে কর্মকান্ড পরিচালিত করা। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতির সম্পর্কটা একে অপরের পরিপূরক। রাজনীতি এবং অর্থনীতির সম্পর্কের বিষয়টা নিয়ে অতীতের চেয়ে বর্তমানে সময় আরো বেশি করে ভাবা হচেছ। বিশেষ করে অর্থনীতিবিদদরা এ ব্যাপারে বাস্তব উপলব্দি করছে বেশি।

রাষ্ট্রের প্রান শক্তি হলো  অর্থনীতি। অর্থনীতির চাকা সচল হলে রাষ্ট্র সচল থাকে। স্থিতিশীল রাজনীতি সচল অর্থনীতির বিকাশে সহায়ক হয়। অপরদিকে অস্থিতিশীল রাজনীতি অর্থনীতির গতি মন্থর করে দিতে পারে। এ কারনেই আজকাল অর্থনীতির উন্নয়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপরি জোর দেয়া হচেছ বেশি। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারনে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসে যা কারোই কাম্য হতে পারে না।  তাই সরকারী দলর বিরোধী দলকে জাতীয় স্বার্থে, অর্থনীতির উন্নয়নকে মৌলিক স্বার্থ হিসাবে চিহ্নিত  করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এই মূহূর্তে অর্থনীতির উন্নয়নের বিকল্প রাজনীতি নেই, পথ নেই, মত নেই।

লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি, জিয়া সংসদ।






মন্তব্য চালু নেই