মেইন ম্যেনু

মুক্তিযোদ্ধা থেকে রাজাকার অতঃপর আগামীর ইতিহাস

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে পুরো পৃথিবীর মানুষ। সেক্ষেত্রে আপনাকে আমাকে চলতে হবে। তার মানে কী? ইতিহাস পাল্টে ফেলা। বদলে ফেলতে হবে আপন অস্তিত্ব, বেড়ে ওঠার গল্প? আফসোস! সেই কাজটি চলছে নির্লজ্জ ও বেয়াকুৃবের মতো। সাম্প্রতিক কালের বাংলাদেশের কিছু চিত্র তুলে ধরলে বিষয়টা আরো স্পষ্ট হবে। ড. পিয়াস করিম ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়েও দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ড. পিয়াস করিম স্যার গত ১৩ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। ভক্ত অনুরাগীদের দু’চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। তবে এর মাঝেও থেমে থাকেনি নোংরা রাজনীতির খেলা। ড. পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়। সাথে সাথে অবাঞ্চিত হন আরো কয়েকজন গুণী ব্যক্তিত্ব। তারা হলেন- সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার, মানব জমিন সম্পাদক ও জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরী, নিউ এজ সম্পাদক ও টক শো আলোচক নূরুল কবির। সাপ্তাহিক এর সম্পাদক গোলাম মোর্তজা, আইনজীবী ড. তুহিন মালিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিক নজরুল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী। কারা শহীদ মিনারে ড. পিয়াস করিম এর লাশ নিতে দিল না; কী তাদের পরিচয়? সিপি গ্যাং নামে একটা সংগঠন। যাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসও জানে না। একটা বিষয় স্পষ্ট করতে চাই- সবাই কী একই মতাদর্শের অধিকারী হবে? একেকজন একেক মতের হতে পারে। তাই ভিন্ন মতের কারণে একজন গুণীব্যক্তিত্বকে কী আমরা মূল্যায়ন করব না? শহীদ মিনারে ড. পিয়াস করিম এর লাশ নিলে শহীদ মিনার অপবিত্র হয়ে যাওয়ার আশংকায় সেখানে তার লাশ আনতে অনুমতি দেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এদিকে সিপি গ্যাং গ্রুপের নাচানাচিতে শহীদ মিনার পবিত্র হওয়ার দৃষ্টান্তও দেখতে হলো জাতিকে। ব্যক্তির কারণে ইতিহাস কী পরিবর্তন হবে? এভাবে চলতে থাকলে ইতিহাস বলতে কোনো বিষয় থাকবে কী! এক মাঘে শীত যায় না। প্রবাদটি যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে সময়ের পরিবর্তনে আগামী দিনে বিপরীত শ্রোতের অনেক গুণী ব্যক্তিত্ব ড. পিয়াস করিম এর মতো কী অবমূল্যায়িত হবে না? এভাবে কী আমাদের ইতিহাসের পাতা উলোট পালোট হয়ে যাবে? চারিদিকে শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও শ্লোগানের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা কী একজন গুণী মানুষকে ইতিহাসের ডায়েরী থেকে মুছে ফেলা, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বানানো? ধিক এই সব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসায়ীদের।এদিকে আইন মন্ত্রী এ্যাড. আনিসুল হক ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ড. পিয়াস করিম এর অবদান তুলে ধরে বলেন- মরহুম ড. পিয়াস করিম মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লিফলেট বিতরণ করতেন। তখন তার বয়স ছিল ১৩ বছর। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ২ মাস আগে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে আটক করে। তার বাবা এ্যাড. এম এ করিম মুচলেকা দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে তাকে ছাড়িয়ে আনেন। ১৯ অক্টোবর ২০১৪ সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সাথে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, পিয়াস করিমের বিষয়ে আমি অনেক কিছু জানি। আমি যা বলেছি তার প্রমাণ করতে পারব। আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি । অনেকে বলছেন-পিয়াস করিমের দাদা রাজাকার ছিলেন। একথা সঠিক নয়। তার দাদা ছিলেন ড.আবদুর রউফ। তিনি ১৯৫৭ বা১৯৫৮ সালে মারা যান। একজন মৃত ব্যক্তি রাজাকার হন কিভাবে? আর তার নানা ছিলেন-লীল মিয়া । বাড়ি বাঞারামপুর । তিনি যুক্তফ্রন্ট্রের সাথে যুক্ত ছিলেন । স্বাস্থ্যমন্ত্রীও হন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তিনি মারা যান । কোথাও রাজাকার হিসেবে তার নাম নেই। আমি শুনেছি তিনি কুমিল্লা জেলা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন । আইনমন্ত্রীর একথা থেকে বুঝা যায় মহান মুক্তিযদ্ধে ড. পিয়াস করিম ও তার পরিবারের অগ্রণী ভূমিকাকে কোন ভাবে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা কী দেখলাম !যারা মুক্তিযদ্ধু করেনি এবং মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি তাদের দাম্ভিকতায় আজ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে লজ্জায় মুখ ঢাকতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধে ড. পিয়াস করিমের ভূমিকার বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে ষড়যন্ত্র দেখেছেন যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক। আসলে বিষয়টা হলো সত্য কথা বললে সবাই রাজাকার হয়ে যায়। সেটা আবারও প্রমাণিত হলো। এ কে খন্দকার ১৯৭১ সালে রনাঙ্গনের একজন অগ্রসৈনিক ছিলেন। মুক্তিযদ্ধে তার অসাধারণ অবদানও রয়েছে। কিন্তু একাত্তরের ভিতর বাহিরে বইটি লিখে তিনিও রাজাকার বনে গেলেন। বইটিতে তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার অনেক বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন। আর এই কারণেই তাকেও আজ রাজাকারের খাতায় নাম লেখাতে হলো। এটাই হলো আজকের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তব দৃষ্টান্ত। শহীদ মিনারে ড. পিয়াস করিমের লাশ নিতে না দেওয়া ও শহীদ মিনার চত্ত্বরের বর্তমান হালচিত্র দেখে ব্যারিষ্টার রফিকুল হক বোধ হয় আফসোস করে বলেছেন – শহীদ মিনার আজ আওয়ামীলীগের দখলে, শহীদ মিনার এখন নেশাখোর আর নষ্টা মানুষের আস্তানা। তাই আমি যখন মারা যাবো আমার মরদেহ শহীদ মিনারে নিবেন না। বায়তুল মোকাররম মসজিদে জানাযা শেষে আমার মরদেহ সোজা আমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাবেন। স্যারের সদিচ্ছা শুনে সত্যিই ভালো লাগলো। আল্লাহ যেন স্যারের মনের বাসনা পূর্ণ করেন। আর শহীদ মিনার এলাকার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার জন্য স্যারকে ধন্যবাদ। সেই সাথে সাথে দেশপ্রেমিক জনতাকে এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকা ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানাচ্ছি।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ই-মেইল : [email protected]






মন্তব্য চালু নেই