মেইন ম্যেনু

দলটির ব্যাপ্তি দেখে জিয়া অনেক খুশি হতেন!

সাবেক রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমানের ৩৪তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ । জাতি আজ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। দিবসটি পালনে বিএনপি ও এর অঙ্গন বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দিনব্যাপী পালন করা হবে নানা কর্মসূচি । তবে জিয়ার মৃত্যুর পর এতোটা প্রতিকূল পরিবেশে আর কোন মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

সেই ১৯৮১ সালের ৩০ মে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়া হয় তাকে । সেসময়কার কথা তেমন কিছুই স্মরণ নেই, তখন আমি খুবই ছোটছিলাম, জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না, ফলে ছোট একটি ঘটনা ছাড়া তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করার মতোও আমার ঝুড়িতে আর তেমন কোনো কিছু নেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকেই আজ দু’কলম লিখতে বসলাম। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে নিজের কিছু কথা দিয়ে শুরু করি।

সেই আশির দশকের গোড়ার দিকের কথা, একেবারেই অবুঝ ছোটবেলা, আমার ৬-৭ বছর, ক্লাশ প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি । আমাদের বাড়িতে তখন গরু-ছাগল পালন করা হতো। যতদূর মনে পড়ে বছর চুক্তি কাজের লোকের পাশাপাশি আমাদের দুই ভাইয়ের অন্যতম কাজ ছিলো গরু ছাগলের দেখাশোনা করা । ফলে স্কুল থেকে ফিরেই খাওয়া সেরে আমরা গরু-ছাগল চড়াতে যেতাম। স্মরণে আছে তখন গ্রামবাংলার প্রতিটি এলাকায় খাল খনন কাজছিল। ওইসব খালের পানি সেচ দিয়ে শুষ্ক মওসুমে ফসল আবাদ করতেন কৃষকরা। সম্ভবত এর মাধ্যমেই জিয়াউর রহমান বাংলার কৃষকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। যে কারণে বেশী বয়সী কৃষকদের মুখেসেই জিয়ার প্রশংসা আজো শুনতে পাওয়া যায়।

যা বলছিলাম, তেমনি আমাদের এলাকায় একটি বড় খাল ছিলো্। ওই খাল পাড়েই আমাদের অনেক জমিজমা ছিল, মূলত সেই খালপাড়ে আমরা গরু-ছাগল চড়াতে যেতাম, গরুর জন্য ঘাস কাটতাম, সেখানে খেলাধূলাও করতাম। যতদূর মনে পড়ে ৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের গ্রামের অন্য প্রান্ত দিয়ে অপর একটি খাল খননকাজের উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। সেদিন আমাদের এলাকার আবাল-বৃদ্ধ, বনিতা নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর এক কথায় সবাই জিয়াকে একনজর দেখার জন্য সেই খালপাড়ে ভিড় জমিয়েছিল।

সেদিন অন্যদের সাথে জিয়াকে দেখতে আমিও গিয়েছিলাম। সম্ভবত: তিনি দৃপৃর সাড়ে ১২টার দিকে হেলিকপ্টার থেকে নেমে খাল খনন কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। যা দেখেছি তাতে এখনকার মতো রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী-এমপিদের মতো জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এতো নিরাপত্তা বলয় ছিল না, তিনি সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে নিজের হাতে কুদাল নিয়ে খাল খনন কাজ করতেন। যা অনেক ছবি থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রসঙ্গত, আমার এক মামা ছিল, তিনি জিয়ার খুব ভক্ত ও তার দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এখানে নামটি উল্লেখ না করলেই নয়, ময়মনসিংহ ত্রিশালের সেই সবারপ্রিয় দেশপ্রেমিক বরেণ্য রাজনৈতিক মরহুম আবুল মুনসুর আহমেদের শিষ্য জালাল উদ্দিন আহমেদ, তিনিও আজ জীবিত নেই, তবে দলমত নির্বিশেষে ত্রিশালের মানুষ তাকে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে ।

আমাদের গ্রামে রাজা এসেছে তাই আমরা শিশুরা মহাখুশি, দলবেধে মিছিল করতে করতে সেখানে যাই। ছোটকাল থেকেই আমি একটু দুষ্টু প্রকৃতির ছিলাম, আমার মামা জালাল উদ্দিন আহমেদ জিয়াউর রহমানের সাথেই ছিলেন। তাই দৌড়াদৌড়ির এক পর্যায়ে মামা মামা বলে একেবারে জিয়ার কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম, আমাকে অনেকে যখন ধরে আটকানোর চেষ্টা করছিলেন তখন জিয়াই আমাকে ডেকে নিয়ে পিঠে হাতবুলিয়ে আদর করেছিলেন। আর এভাবেই জিয়ার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আমার পিঠে জিয়ার সেই হাত বুলানোর ছুঁয়া কেন জানি আজোও অনুভব করতে পাই। এছাড়া খাল খননের জন্যই গ্রামবাংলায় জিয়ার খুব সুনাম-সুখ্যাতি ছিল। বাপ-দাদাদের কাছে থেকে জিয়ার অনেক গুণের গল্প শুনেছি।

আজ জিয়া নেই, তাঁর স্ত্রী, সন্তান-সন্তুতি আছে, তার গড়ে যাওয়া দল আছে। আমি মনে করি, বিএনপি আজ দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল, যাদের সারা দেশে মোট জনগোষ্ঠীর গড়ে ৫০ ভাগের বেশী কর্মী-সমর্থক রয়েছে। এই হিসাবে দেশের ১৬-১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৮-৯ কোটি মানুষ কম-বেশি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত অথবা দলটিকে সমর্থন ও সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। এটা কম ব্যাপার নয়।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বাংলাদেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দল প্রতিষ্ঠা করেন। ৩০ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান তার শাসনকে বেসামরিক করার উদ্দেশ্য ১৯ দফা কর্মসূচি শুরু করেন। জেনারেল জিয়া যখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি রাষ্ট্রপতির পদের জন্য নির্বাচন করবেন তখন তার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। জাগদলকে বিএনপির সাথে একীভূত করা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়া এই দলের সমন্বয়ক ছিলেন এবং এই দলের প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এর প্রথম মহাসচিব ছিলেন। জিয়ার এই দলে বাম, ডান, মধ্যপন্থি সকল প্রকার লোক ছিলেন। বিএনপির সবচেয়ে প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিয়োগ পদ্ধতি। প্রায় ৪৫ শতাংশ সদস্য শুধুমাত্র রাজনীতিতে যে নতুন ছিলেন তাই নয়, তারা ছিলেন তরুণ।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টায় রমনা রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যাত্রা শুরু করেন। সংবাদ সম্মেলনে নতুন দলের আহ্বায়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রথমে ১৮ জন সদস্যের নাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ওই ১৮ জনসহ ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন। সেই থেকে যাত্রা এই দলটির।

এরপর দলটি মোট চারবার ক্ষমতায় আসে। আজ দলের ব্যাপ্তি অনেক দূর। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে ৮০-৯০ বছরের বৃদ্ধও নিজেকে এই দলের লোক বলে দাবি করতে দেখা যায়।এটা কম কথা নয়।

তবে এই দলের বিশালতা সত্ত্বেও ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দলটি বর্তমান সময়ের মতো এতটা সংকটে ইতোপূর্বে কখনো পড়েছিল বলে আমার জানা নেই। অন্যদিকে সুদীর্ঘকালের ইতিহাসে বর্তমান সময়ের মতো তাদের এত সমর্থনও কোনোকালে ছিল বলে মনে হয় না। এমন কি জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশাতেও নয়। ফলে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যদি আজ জীবিত থাকতেন তবে নিশ্চয়ই তিনি তার দলটির বিশাল ব্যাপ্তি ও অগণিত কর্মী-সমর্থক দেখে সত্যিই অনেক খুশি হতে, আনন্দিত হতেন। রাজনীতিকে উপভোগ করতে অন্যভাবে। অন্যদিকে বর্তমান দুরাবস্থার জন্য ব্যথিত না হয়ে এর পেছনের কারণ জানার চেষ্টা করতেন। এবং সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য পথ খুজতেন। দেশপ্রেমিক বিচক্ষণ জিয়া হয়তো বা একটা সুন্দর মসৃণ পথ পেয়েও যেতেন।

কেননা, জিয়া সেই ব্যক্তি, যখন ১৯৭১সালে জাতীয় ইতিহাসের চরম দুর্যোগময় কাল। যখন সকলেই ২৫ মার্চ মধ্যরাত ইতিহাসের পৈশাচিক গণহত্যার ভয়াবহতায় হয়ে পড়েছিলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আক্রান্ত অসহায় দেশবাসী হতবিহবল এবং অনেকে আত্মসমর্পণ কিংবা দালালির মাধ্যমে বেছে নিয়েছিলেন আত্মরক্ষার পথ। সেই সময় কালুরঘাটের বেতার কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার সেই কন্ঠস্বর ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’। দেশের রাজনৈতিক বিভাজনে এ নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বির্তক যাই করা হোক না কেন, সবকিছু উপেক্ষা করে সেদিন যে জীবন বাজি রেখে জাতির পক্ষে জিয়াউর রহমান মহান স্বাধীনতার যুগান্তকারী দু:সাহসী ঘোষণা দিয়েছিলেন এটা অস্বীকার করার মতো কারো সুযোগ নেই। কেবল ঘোষণার মধ্যেই নিজের কর্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। স্বাধীনতাকামী সৈনিক জনতাকে সংগঠিত করে বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের লড়াইকে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উন্নীত করেছিলেন।

অনেক প্রত্যাশা নিয়ে এদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অবশেষে ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসলে সবাই তাকে বরণ করে নেন। যতদূর জানি, জিয়ার অকৃত্রিম দেশপ্রেম আর মহান মুক্তিযুদ্ধে দু:সাহসিকতার জন্যই বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান করেছিলেন।এ থেকেই বুঝা যায় বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে সম্পর্ক কতটা সৌহার্য্সপূর্ণ ছিলো।

কিন্তু আজ যখন দেশের রাজনৈতিক দৈন্যতায় পরস্পর বিরোধী দু’পক্ষের লোকজনের কাছ থেকে যখন বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান সম্পর্কে নানা কথা, নানা নতুন তথ্য শুনি তখন মনোকষ্ট পাওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার থাকে না।

অবশ্য পরে সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশের পরিকল্পনায় ১৯৭৫ এর মধ্য-আগস্টে রক্তক্ষয়ী এক সশস্ত্র সেনাঅভ্যুত্থানে ঘটে যায় রাষ্ট্রক্ষমতার পটবদল। খন্দকার মোশতাক আহমদ দেশজুড়ে সামরিক শাসন বলবৎ ও শাসনতন্ত্র স্থগিত করে রেখে তাঁর নিজস্ব মর্জি মাফিক শাসন চালাতে থাকেন। সবমিলেই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগুচ্ছিল জাতি।

যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, রাজনীতিহীন ওই সময়ে জাতীর ঐক্য ও আশা-আকঙ্ক্ষার প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীতে সৃষ্টি করা হচ্ছিল নানা দল-উপদল, ভেঙ্গে পড়ছিল শৃংখলা ও সংহতি। এরই মধ্যে কতিপয় উচ্চাভিলাষী সেনা অফিসার ৩ নভেম্বর ঘটিয়ে দেয় আরেকটি স্বল্পমেয়াদী ক্যু। তদানীন্তন সেনাপ্রধান জিয়া তাদের হাতে বন্দী হন। তবে সেটা বেশীদূর এগুতে পারেনি।

৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহর থেকেই সারাদেশের সেনা ছাউনিগুলোর চেহারা বদলে যায়, ওইদিন ভোরে সেনা সদস্যরা ভোরে রাস্তায় নামলে তাদের প্রতি স্বত:স্ফুর্ত সমর্থন জানাতে সারাদেশের সাধারণ মানুষও বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। যেটাকে আমরা জাতীয় বিপ্লব বা সংহতি দিবস বলে থাকি। বির্তক থাকলেও ওই সময়ে জিয়ার ক্ষমতায় আসার বিষয়টি ছিল অনেকটাই দেশবাসীর বহুল কাঙ্খিত বিষয়। মুরুব্বিদের ভাষ্যমতে, ওই জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ না করলে হয়তো দেশে বিশৃঙখলা ও রক্তপাত আরো দীর্ঘ হতে পারতো।

এরপর জিয়া দেশ শাসন করেন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। এই সময়ের মধ্যে তিনি দেশের জন্য অনেক কিছুই করেন, তবে সবচেয়ে বড় এবং যুগান্তকারি বিষয় ছিলো বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে ফেরা। কেননা, দেশ স্বাধীনের স্বল্প সময়ের ব্যাবধানেই জনগণের রাজনৈতিক অধিকার শৃঙ্খলিত হয়ে পড়েছিল। এরপর পরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা।

জিয়ার মৃত্যুর পর নদীর ঘাটের জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ৩৬ বছর বয়সে বিধবা খালেদা জিয়া অবুঝ দুই ছেলেকে নিয়ে পথচলা শুরু করেন। এরপর নিয়তিই ডাকেই রাজনীতিতে আসা। দলে স্বামীর শূন্যতা পূরণে সেই দশকের গোড়ার দিকে রাজনীতির মাঠে আসেন। স্বামীর হত্যাকারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বেগম জিয়ার আপোষহীন নেতৃত্বেই ’৯০-এর পটপরিবর্তন ঘটে। তাঁর আপোষহীন অসাধারণ নেতৃ্ত্বের আকৃষ্ট হয়ে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। এরপর আরো দুইবার ক্ষমতায় বসেন বেগম জিয়া।

সেই সময়টাই খালেদা জিয়ার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত’। এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে তিনবার ক্ষমতায় আরোহণের সময়টি যদি বেগম জিয়ার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সময়’ হয়ে থাকে তবে পরবর্তীতে শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে ‘অন্ধকার সময়’।

কেননা, সেই আপসহীন নেত্রী বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্বাধীনভাবে চিন্তার মাধ্যমে পরিস্থিতির মূল্যায়ন, দ্রুত সমন্বয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে ব্যর্থ হন। এমনকি ১৯৯১ থেকে ৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকার চালানোর সময় নিজেরা যে ভুল করেছেন তা পর্যালোচনা করে নতুনভাবে এগুতে পারেননি। তা খতিয়ে দেখার চেষ্টাও করেননি। যার ফলে আজ দলটির এই দৈন্যতা বলে অনেকে ধারণা করেন।

কেননা, তিনবার ক্ষমতা থাকাকালীন অনেক অপার সুযোগ ছিল- দেশ, দল ও জনগণের স্বার্থে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া ছাড়াও দুর্নীতি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে নিজে এবং দলকে জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়ার।কিন্তু সেই সুযোগটা সেভাবে ব্যবহার করেননি।

১৯৮১ থেকে ২০১৫ এই ৩৫ বছরে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে জিয়া পরিবারকে। চড়াই-উৎরাই পাড় করতে হয়েছে তাদের। এরশাদের শাসনামলে ’৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় তাকে চরম জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হয়। অতঃপর ২০০৭ সালের ১/১১ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়। দুই ছেলেকেও পাঠানো হয় কারাগারে। ছেলেদের উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।

এরপর শেখ হাসিনার আমল শুরু হয়, বেগম জিয়ার নেতৃত্বে চলছে ৮ বছর ধরে আন্দোলন। আন্দালনের মধ্যেই গেল ২৫ জানুয়ারি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো নির্বাসনে থাকাবস্থায় মারা যান। আর বড় ছেলে তারেক রহমান সেই ২০০৮ সাল থেকেই স্বপরিবারে নির্বাসনে রয়েছেন। ২০০৯ সালের মে মাসে ৪০ বছরের স্বামীর স্মৃতি বিজরিত বাড়ি ছাড়া হয়ে উঠেছেন ভাড়া বাসায়। এখানেই শেষ নয়, খালেদা জিয়া, তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে ২৬টি মামলা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৫টি এবং তারেক রহমান ১৭টি ও কোকো ৭টি মামলার আসামি। কোকোর মৃত্যুর পর তার নাবালিকা দুই কন্যাকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। সবমিলেই এখন চরম দুর্দিন চলছে। সামনের দিনগুলো আরো বেশী চ্যালেঞ্জের মুখে এই পরিবারটি। তাই আজ ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘জিয়া’ তোমাকে অনেক মনে পড়ে।

লেখক: গবেষক ও কলামলেখক।






মন্তব্য চালু নেই