মেইন ম্যেনু

‘অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধার কথা’

একাত্তরের অকুতোভয় এক বীরযোদ্ধার নাম কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর এদেশকে পুরোপুরি শত্রুমুক্ত করে আমরা বিজয় অর্জন করি। যদিও এর ১০ দিন আগে ৬ ডিসেম্বর কলারোয়া পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়। কলারোয়ার আকাশে ওড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এই বিজয় অর্জন করতে ৯ মাসব্যাপি করতে হয়েছে তীব্র মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণ যুদ্ধ করেছেন শত্রুসেনাদের সাথে। মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিসীম বীরত্ব ও লাখো শহিদের রক্তে ভেজা আমাদের এ স্বাধীনতা। যাঁদের নিরন্তর লড়াই ও প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তাদের কাছে কৃতজ্ঞ গোটা জাতি। কলারোয়ার কৃতি সন্তান ও লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধকালীন কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন এক অবিসংবাদিত যোদ্ধার নাম।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বগাথাঁ ও অবদান মুক্তিকামী মানুষ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করেন। যৌবনের দুরন্ত দিনগুলোতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন একেবারে সামনে থেকে। কমান্ডার মোসলেম উদ্দীনের বীরোচিত ভূমিকার কথা অজানাই থেকে গেছে এ প্রজন্মের কাছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন সেই সব বীর যোদ্ধাদের কথা, যাঁরা আমাদের গৌরব ও অহংকার। কমান্ডার মোসলেম উদ্দীনের জন্ম ১৯৪৬ সালের ২৬ অক্টোবর কলারোয়ার তুলসিডাঙ্গা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম মরহুম মাদার সরদার। ১৯৬৮ সালে তিনি ইংরেজী মাধ্যমে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী অর্জন করেন।imappoi তিনি ছাত্র রাজনীতি থেকেই আওয়ামী লীগের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। তিনি দীর্ঘদিন কলারোয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কলারোয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠান পাবলিক ইনস্টিটিউট’র তিনি সভাপতি ছিলেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে তাঁর গোটা জীবন পরিচালিত হয়েছে।

সম্প্রতি কমান্ডার মোসলেম উদ্দীনের সাথে তাঁর তুলসিডাঙ্গার বাসভবনে বসে এ প্রতিবেদকের একান্ত দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে আসে মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতির কথা। মহান মুক্তিযুদ্ধে কলারোয়া এলাকা ছিল ৮নং সেক্টরের অধীন। কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে গড়ে ওঠে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ।

একাত্তরের ৬ এপ্রিল কলারোয়া পাইলট হাইস্কুলে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের সর্বশেষ সভা শেষে তাঁর নেতৃত্বে ২৮ জন ভারতের হাকিমপুরে যান। তিনি একাত্তরের ৫ জানুয়ারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে বাড়ি থেকে বের হন বিয়ের মাত্র ৩ মাস পর। হাকিমপুরে সে সময় শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্প করা হয়। সেময় সেখানে অবস্থান করছিলেন এমএলএ মমতাজ আহমেদ, এন্তাজ আলি, শ্যামাপদ শেঠ, বিএম নজরুল ইসলাম, শাহাদাৎ মোড়ল, মোসলেউদ্দি গাইনসহ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকবৃন্দ। কমান্ডার মোসলেম উদ্দীনের নেতৃত্বে একটি imagesদল হাকিমপুর থেকে যান ভারতের টাকিতে। টাকিতে সেময় অবস্থান করছিলেন দেবহাটার মাস্টার শাহাজাহান আলি ও পাইকগাছার এমএলএ আব্দুল গফ্ফারসহ অনেকে। তারপর যান ভারতের মালঙ্গপাড়া বিএসএফ ক্যাম্পে। সেখান থেকে যান ভারতের ঘোজাডাঙ্গায়। ঘোজাডাঙ্গায় নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন। এরপর তিনি যোগ দেন ভোমরা ক্যাম্পে।

কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন বলেন, ভোমরায় একাত্তরের ২৯ মে সংঘটিত হয় পাকসেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের এক ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে সাত শতাধিক পাকসেনা নিহত হয়। এখানকার সম্মুখ যুদ্ধে তিনি একেবারে সামনে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন। এলএমজি দিয়ে সর্বপ্রথম তিনি ব্রাশ ফায়ার করেন। একটানা প্রায় ১৫ ঘন্টার তুমুল যুদ্ধে শহিদ হন ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ও আহত হন কলারোয়ার বাকসা গ্রামের আব্দুল মাজেদসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। ভোমরার এই ভয়াবহ যুদ্ধে বিজয়ের পর একের পর এক সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছে মোসলেম উদ্দীন কমান্ডারের নেতৃত্বে। ভোমরা যুদ্ধের পর কলারোয়া এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন শহিদ হয়ে গেছেন। এ খবর পাওয়া মাত্র কলারোয়া থেকে ভোমরার অপর প্রান্তে ঘোজাডাঙ্গায় চলে আসেন শেখ আমানুল্লাহসহ অনেকেই। তাঁরা সকলেই কমান্ডার মোসলেম উদ্দীনকে অক্ষত দেখে স্বস্তিভরে বাড়ি ফিরে যান।

কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন তাঁর সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতার এক পর্যায়ে বলেন, ভোমরা যুদ্ধের পর পাকসেনাদের লাশের স্তুপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন। এসময় এক পাকসেনার লাশের কাছে তিনি বসে পড়েন। নীরবে ফেলতে থাকেন অশ্রুধারা। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিহত ওই সেনা তাঁর ব্যাচমেট ছিলো। তাঁর গুলিতেই ওই ব্যাচমেট নিহত হয়েছে। তাই আবেগ সম্বরণ করতে পারছিলেন না ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন। একদিকে দেশপ্রেম ও অপরদিকে আবেগall-roads-talukder-firing-squad-990_25406_600x450। তবে দেশপ্রেমের কাছে হেরে যায় সেই আবেগ। কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন অন্যান্য স্থানে হওয়া যুদ্ধের মধ্যে বালিয়াডাঙ্গা, হিজলদি, ইলিশপুর, বাগআঁচড়া, ধান্যতাড়া ও তলুইগাছার যুদ্ধের বর্ণনা দেন। পাকসেনাদের সাথে মুখোমুখি হওয়া এসব যুদ্ধে জীবনবাজি লড়াই করে জয়লাভের যে ইতিহাস, তার একজন সম্মুখ সমরের অংশীদার কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন। ধান্যতাড়া থেকে কমান্ডার মোসলেম উদ্দীনসহ সহযোদ্ধারা যখন ফিরছিলেন, সেসময় উপজেলার নাথপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে পাকসেনারা জ্বালিয়ে দেয় বাড়িঘর। তাঁরা নিকটবর্তী দূর থেকে এ দৃশ্য দেখলেও কিছুই করার ছিলো না। কেননা, তাঁরা গুলি চালালে গুলিবিদ্ধ হতে পারতেন গ্রামবাসী। এরপর কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন উল্লেখ করেন, তলুইগাছা যুদ্ধের কথা। সামনাসামনি হওয়া এই তুমুল যুদ্ধে ৩০ জনের মতো পাকসেনা নিহত হয়। একপর্যায়ে পাকসেনারা তাদের লাশের স্তুপ বানিয়ে প্রতিরক্ষার চেষ্টা করে।

সে এক অভাবিত দৃশ্য! তিনি বলেন, আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে ওই দৃশ্য। ভারতে অবস্থানকালীন অনেক সংগঠক ও সহায়তাদানকারীদের কথা আজও মনে পড়ে কমান্ডার মোসলেম উদ্দীনের। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁদের অবদান তিনি ভুলতে পারবেন না। এঁরা হলেন: হালিম খান এমপি, আজগর খান, যামিনী সেন, অশ্চুৎ মল্লিক, ডা: তছিরউদ্দিন, পঞ্চায়েত প্রধান ফজলুল হক, মোশারফ হোসেন, ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহ প্রমুখ। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারিবারিক সমর্থনের প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন বলেন, তাঁর পিতা মাদার সরদার ও বড় ভাই নিজাম উদ্দীন যুদ্ধে যেতে বড় সমর্থন জুগিয়েছেন।

যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে একজন গ্রাজুয়েটধারী হয়েও সরকারি কোনো চাকুরিতে যোগ না দেয়ার কারণ কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে পুলিশের ডিএসপি পদে চাকুরির নিয়োগ লাভ করেছিলেন। কিন্তু পরিবারের সম্মতি ও নিজের তেমন ইচ্liberation-war-rare-picture-pic3-from-dhaka-city-guideছে না থাকায় পুলিশের উচ্চ পদের ওই চাকুরিতে তিনি যোগ দেননি। তিনি মনোনিবেশ করেন রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকান্ডে। কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে কাটতো তাঁর প্রতিটি দিন ও রাত। নিজের জন্য সহায়-সম্পদের পিছনে তিনি জীবদ্দশায় কখনো এতোটুকু আগুয়ান হননি। প্রচারবিমুখ এই বীর যোদ্ধা দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়ার মধ্যে তুপ্তি খুঁজতেন।

এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন বলেন, দেশকে পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্ত করতেই শুধূু তাঁরা লড়াই করেননি। চেয়েছিলেন মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক মুক্তি। যেখানে থাকবে না, ধনী ও গরীবের বৈষম্য। পাকিস্তানিদের হাত থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে। এটি অবশ্যই শ্রেষ্ঠ অর্জন। কিন্তু বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আম-জনতার সার্বিক মুক্তি ঘটবে না-এমনটি ভাবনা কমান্ডার মোসলেম উদ্দীনের। এ মুক্তির লড়াই নিরন্তর। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কমান্ডার মোসলেম উদ্দীন চান, একটি স্বাধীন দেশে ধর্মের নামে বিভাজন চলবে না। মানুষের ন্যায্য সকল অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমতার ক্ষেত্র তৈরি করা দরকার। আর এদিনটি এনে দিতে নতুন প্রজন্মেœর কাছে থাকলো বুকভরা প্রত্যাশা।






মন্তব্য চালু নেই