মেইন ম্যেনু

একজন মানবতাবাদী ঋষির প্রস্থান

এ যুগের ঋষিপুরুষ শ্রীমৎ স্বামী নারায়ণ পুরী মহারাজের প্রস্থান আভিধানিক, তাঁর অর্ন্তধান অমরলোকে। ৯ মার্চ সোমবার রাত ৮টায় চট্টগ্রামের তুলসীধামে পৌঁছেই দেখি লোকে লোকারণ্য। ভক্ত-শিষ্যদের অনেকেই অশ্র“সিক্ত নয়নে অন্তিম শয্যায় শায়িত প্রিয় গুরুর চরণে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। কেউবা একে অন্যকে জড়িয়ে অশ্র“পাত করছেন অবিরত পিতৃহারা সন্তানের মতো।

কলিযুগের অবহেলিত পদদলিত সনাতনী সমাজের একজন বটবৃ ছিলেন শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ। তিনি তো সেই মহামানব, যিনি অন্ধকারে আলোর পথ দেখিয়েছেন, অসহায়ের সহায় হয়েছেন, তিনি যে অনাথের নাথ। উচ্চশিতি সংস্কৃতজ্ঞ শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ ১৯৮৩ সালে চট্টলার তুলসীধাম অধিপতি ও বাঁশখালীর ঋষিধামের মোহন্ত মহারাজ হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। শৈব উপাসক শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরীর ভ্রাতুষ্পুত্র ও শ্রীমৎ স্বামী অচ্যুতানন্দ পুরী মহারাজের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন স্বামীজি। এ যুগের একজন মানবতাবাদী ঋষি শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী। ধর্মকে মানবকল্যাণে নিয়োজিত করাই ছিল তাঁর ল্য। ধর্মের নামে বর্তমানে মানুষ খুন, ধর্মের লেবাসে জঙ্গিদের বিস্তার, দেশে দেশে হিংসা-হানাহানি, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের নিকৃষ্ট কার্যকলাপ রোধে এই সময়ে এমন ঋষির চলে যাওয়ার সত্যিই দুঃখের। বিশ্ব শান্তি ও মানবতার মূর্ত প্রতীক এই ঋষির অর্ন্তধান শুধু সনাতনী সমাজের নয়, পুরো সভ্য সমাজ ও সভ্য জাতির জন্য অপূরণীয় তি।

ঈশ্বরের জন্ম-মৃত্যু নেই, নেই রেচন। ঈশ্বর এক অদ্বিতীয়, নিরাকার। ঈশ্বরের প্রেরিত দূতরাই যুগে যুগে আসেন মানুষের কল্যাণে। তাঁরাই সাকার রূপে মানুষের কাছে ধরা দেন ঈশ্বরের বার্তা নিয়ে। তাঁরাই মানবকল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করেন। শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরীর বংশধর শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজও এসেছিলেন সেই উদ্দেশ্যে। তিনি নিজেকে কখনো ভক্ত-শিষ্যদের কাছ থেকে আলাদা করতেন না। শুভ্র বসনের মতো তাঁর মনও ছিল শুভ্র। দেহবসন তিনি কখনো রাঙান নি, রাঙিয়েছেন মনকে। সবসময় হাসিমুখে ভক্তদের সঙ্গ দিয়েছেন শিশুসুলভ ভঙ্গিতে।

গেরুয়া বসনধারী যেসব ব্যক্তি আত্মপ্রচারে মগ্ন থাকতেন, তাদের ব্যাপারে ঘোর আপত্তি ছিল শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজের। কিন্তু কে শোনে কার কথা! অনেকেই তো গুরু অদ্বৈতানন্দ পুরীকে পর্যন্ত ভুলে গেলেন, কেবল নিজের নাম প্রচারই মুখ্য হয়ে উঠল। ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল ভ্রাতা শ্রীমৎ অচ্যুতানন্দ পুরী ও ভ্রাতুস্পুত্র শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ। তাঁরা গুরু মহারাজের আদর্শ লালন করেছেন আজীবন। এজন্য তাঁদেরকে অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। ধর্মব্যবসায়ীরা এই ঋষি পুরুষদের নামে চালিয়েছেন অপপ্রচার, করেছেন অপমানিত। তবুও এতে এতটুকু বিচলিত হননি তাঁরা। সাধনার উচ্চস্তরে গিয়েও নিজেদের মহিমা প্রচার করেন নি, অকাতরে বিলিয়েছেন প্রেমসুধা।

ধর্ম ব্যবসায়ীদের দাবি, গৃহীদের ধর্মস্থানে থাকার অধিকার নেই। অথচ সনাতন ধর্মের ইতিহাস তা বলে না। আমরা আর্য ঋষির বংশধর। ঋষিরা যদি স্রষ্টার সৃষ্টি রার্থে বিবাহ যজ্ঞ না করতেন, তাহলে কি এই মানবকূলের ইতিহাস রচিত হতো ? মহর্ষি প্রেমানন্দের মতো আত্মদর্শী সাধকও তাই বলেছেন-‘গৃহীরা বীর সাধক।’

যে ব্যক্তি নিজ গৃহের সদস্যদের চরিত্র গঠন, মনুষ্যত্ব সৃষ্টি, মানবিকতা, ন্যায়, আদর্শ ও সত্যবাদিতার শিা দিয়ে সুশিতি করতে পারে না, তার সংসার ধর্ম পালনের অধিকার নেই। গৃহ শুধু আহার, নিদ্রা আর সন্তান উৎপাদনের জন্য নয়। একটি আদর্শ গৃহ মন্দির স্বরূপ, একটি পরিবার সংগঠন তুল্য। এই পরিবার থেকেই জন্ম নিতে পারে এক একজন বীর সাধক। পান্তরে লোক দেখানো সাধু সেজে আশ্রমে গিয়েও যদি বিষয়বাসনায় মন পর্যবসিত হয়, তবে মূল ল্য বিচ্যুত হতে হয়।

জ্ঞানী মাত্রই এ কথা বুঝবেন যে, একজন ব্যক্তি গৃহে থেকেও ধর্ম সাধনা চালিয়ে যেতে পারেন যদি তাঁর গৃহকে দেবমন্দির হিসেবে গড়ে তোলা যায়। বিবাহ করা কিংবা সন্তান জন্মদান কোনভাবেই ধর্ম চর্চায় বাধা হতে পারে না। তার প্রমাণ ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র, মাতৃসাধক ঠাকুর রামকৃষ্ণ, অখণ্ডমণ্ডলেশ্বর স্বামী স্বরূপানন্দের মতো মহাসাধকরা। স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজের গুরুদেব জগদানন্দ পুরী পরমহংস ছিলেন বিবাহিত, দুই স্ত্রীকে নিয়ে তিনি যেমন সাধন মার্গের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন তেমনি মাতৃসাধক বাম্যাাপা তাঁর ভাইয়ের সংসারের দায়িত্ব পালন করেছেন।

ভক্তসাধক রামপ্রসাদও হয়েছেন সফলকাম। এরকম লাখো সন্ন্যাসী-মহাপুরুষ সনাতন ধর্মে আছেন, যাঁরা বিবাহিত হয়েও নির্ব্বাণ লাভ করতে পেরেছেন। সমগ্র ভারতবর্ষে সনাতনী সমাজে প্রায় হাজার এর মতো গোত্র-উপগোত্র রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় বিশ-ত্রিশটি গোত্র বিদ্যমান। যেমন কাশ্যপ মুণির উত্তরসুরীরা কাশ্যপ গোত্রের অর্ন্তভুক্ত, বরদ্বাজ মুণির উত্তরসুরীরা বরদ্বাজ গোত্রের আর শান্ডল্য মুণির উত্তরসুরীরা শান্ডল্য গোত্রের। বর্তমানে আমাদের বংশ পরম্পরা ধারাবাহিতা বজায় থাকতো না যদি ঐ আর্য মুণি-ঋষিরা বিবাহ-যজ্ঞ না করতেন। প্রত্যেক ধর্মশাস্ত্রই মাত্রই বিবাহ-যজ্ঞকে ধর্মের অংশ হিসেবে স্বীকার করেছেন।

আমরা কথায় কথায় দিব্যজ্ঞানের কথা বলি, অথচ আজ আমাদের সর্বাগ্রে প্রয়োজন কাণ্ডজ্ঞান। অনৈক্য, প্রকৃত ধর্মীয় শিার অভাব, নিজেদের মধ্যে হিংসা-হানাহানিতেই আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তথাকথিত উচ্চশিা আমাদের কোন কাজে আসছে না। রামায়ন, মহাভারত, বেদ, উপনিষদ প্রভৃতি ধর্মীয় গ্রন্থ নিয়ে শুধু বাড়াবাড়িই সার। এসবের গূঢ় তত্ত্ব অনুধাবন করবার সময় কারো নেই। সংগঠনের নামে চলছে শুধু নিজেদের প্রচার। এই করুণ অবস্থা দেখেই দিব্যজ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞানের ঋষি শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ তাঁর শিা-দীা, চিন্তা-চেতনা, উদ্দেশ্য-আদর্শ সবকিছুই মানবতার কল্যাণে নিবেদন করেছেন। স্বামীজির প্রতিটি লেখনিতে তার স্পষ্ট প্রভাব ল্য করা গেছে।

মহারাজের ইচ্ছে ছিল একটি অনাথালয় ও দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করা। স্বপ্ন ছিল একটি কমিউনিটি সেন্টার স্থাপন করার, যেখানে গরীব অসহায় মেয়েদের বিবাহ হবে বিনামূল্যে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে পারবেন অসহায়রা। হাজারো সমালোচনায়ও তিনি কখনো বিরুদ্ধাচরণকারীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতেন না। তুলসীধামের কিছু জায়গা কতিপয় সনাতনীদের নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে বেহাত হওয়ার পরও তাদেরকে কখনো অভিশাপ দেননি তিনি। বাঁশখালীর ঋষিধামে বিগত কুম্ভ মেলায় গুরু পরিবারের ওপর হামলায় রক্ত ঝরলেও কাউকে অভিসম্পাত দেননি। বরঞ্চ তাদের মঙ্গল প্রার্থনা করেছেন পরম প্রভুর কাছে।

দিব্যজ্ঞানের ঋষি শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ পোশাক-পরিধানে বিলাসিতা একেবারেই পছন্দ করতেন না। সাদামাটা একজন সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করতে ভালোবাসতেন। স্বল্পাহার, স্বল্পবিশ্রাম, প্রাত্যহিক যোগাসন, ধ্যান ছিল তাঁর নিয়মিত কর্মসূচী। নিজের নাম প্রচার, ছবি বিতরণ আর নামের আগে-পরে বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষায়িত করার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন মহারাজ। তাঁর কাছে শুধু সনাতনী নয় মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষ ছিল সমপ্রিয়। মহান বলেই তিনি হয়েছেন মহারাজ। তাঁর দিব্যলীলার বহু ঘটনার স্বাী তুলসীধামের সেবায়েত প্রবীর, মধুসুদন, চন্দন, প্রভাত, অমল-এর মতো আরো অনেক উচ্চশিতি যুবক। কিন্তু এসব ঘটনা প্রচার হোক-তা একেবারেই চাইতেন না মহারাজজী।

সনাতন ধর্মকে মানবকল্যাণে নিয়োজিত করতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়েছেন শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ। তিনি অনেক অসহায় যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, দিয়েছেন অনেকের মাথা গোঁজার ঠাঁই। অসহায়-অনাথদের যৌতুকমুক্ত বিবাহের সুযোগ করে দিয়েছেন। ধর্মের মূল তত্ত্ব যে মানবসেবা, তা তাঁর জীবনকার্যে পাওয়া যায়। এজন্যই মহারাজের এত যাগ-যজ্ঞ। তিনি কেবল সনাতনী ধর্মীয়গ্রন্থই অধ্যয়ন করতেন না, পবিত্র কোরান, বাইবেল, ত্রিপিটক, ওল্ড টেস্টামেন্টসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পড়ে এতেই ধর্মের মূল বাণী শান্তি ও মানবসেবা করার পথ খুঁজেছেন। মহামানব শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ সবসময় বোঝাতে চেয়েছেন-শুধু নিরামিষ আহার, উপবাস আর পুজা-অর্চনা, আচার-অনুষ্ঠান পালনই যথেষ্ট নয়, ধর্মের মূল আদর্শ মেনে চলার মধ্যেই প্রকৃত ধার্মিকতার লণ প্রকাশ পায়। তাঁর ভ্রাতা লে. কর্নেল (অব.) তপন মিত্র চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক প্রণব মিত্র চৌধুরী, স্থপতি প্রণত মিত্র চৌধুরীর মতো গুণীজনরা মহারাজকে ধর্মসাধনায় এবং মানবকল্যাণে সকল কার্যক্রম বেগবান রাখতে সহযোগিতা করেছেন নিরলসভাবে।

ধর্মসাধনার পথে সংসার অন্তরায় হতে পারে-এমন কোন বক্তব্য ছিল না স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজের গ্রন্থভাষ্যে। তাই শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী বলতেন, “শুধুই কি সংসার ত্যাগ করলে সন্ন্যাসী হওয়া যায়? সাধুর সাধুত্ব তার দেহে নয়-মনে। ষড়ঋপুই যদি দমন না হলো, তবে সাধু হবে কেমন করে?”

আমি মনে করি, শুধু গেরুয়া বসন ধারণ আর কড়া সুগন্ধি গায়ে মাখিয়ে সাধু হওয়া যায় না। চরিত্রের সততা, দয়া, মা, উদারতা, মানবিকতা, সেবা ও মনুষ্যত্ব অর্জন করতে না পারলে নিজেকে সাধু পরিচয় দান করার যোগ্যতা কারো নেই। শরীর রাঙানো সাধু-সন্ন্যাসী দেখেছি হাজার হাজার। মন রাঙানো সাধু-সন্ন্যাসী ক’জনই বা পেলাম। এই না পাওয়ার যন্ত্রণার মধ্যে থেকে যাঁকে প্রত্য করেছি তিনি শ্রীমৎ স্বামী নারায়ণ পুরী। আমার বন্ধুবর পণ্ডিত অমল বাবু গুরু মহারাজকে জানবার ও কাছ থেকে দেখবার সুযোগ করে দিয়ে আমাকে কৃতার্থ করেছেন। আমি শুনেছি, দেখেছি, জেনেছি এবং বুঝেছি মহারাজের জীবনাচরণ পদ্ধতি। তিনি ঈশ্বরের দূত অবতাররূপী শিবযোগী শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরীর আদর্শীক স্বপ্নের সলতে জ্বালিয়ে গেছেন আজীবন। স্বামী অচ্যুতানন্দ পুরী মহারাজের

আকাশবৃত্তির জয়যাত্রায় তিনি ছিলেন কাণ্ডারী। তিনিই তো অসহায়ের শেষ আশ্রয়, শেষ ভরসা, শেষ অবলম্বন। গুরু পরম্পরার ধারক-বাহক শ্রীমৎ স্বামী নারায়ণ পুরী মহারাজ তাঁদের দেখানো পথে পথ চলেছেন, কাজ করে গেছেন। কর্মগুণেই তিনি ঠাঁই পেয়েছেন লাখো ভক্তের হৃদমাঝারে।






মন্তব্য চালু নেই