সার্কের স্থবিরতা কাটছে, তবে সম্মেলন অনিশ্চিত

বিভিন্ন কারণে গত বছরের নভেম্বরে ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত ১৯তম সার্ক সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায়। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত ও আফগানিস্তানের চরম উত্তেজনা আর বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে সার্কে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ-ভারতসহ চার দেশ।

এরপর মূলত স্থবির হয়ে পড়ে দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গঠিত সংস্থাটির (সার্ক) সার্বিক কার্যক্রম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কিছু কিছু মতবিরোধ কমতে শুরু করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আবারও সক্রিয় সংস্থাটি। এমন ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

তবে স্থগিত হওয়া ১৯তম সার্ক সম্মেলন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কিনা- সে বিষয়ে ‘অনিশ্চয়তা’ থাকলেও দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বার্থে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কিছু কিছু বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ কেটে যাওয়ায় সম্প্রতি সার্কের নতুন মহাসচিব যোগ দিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সম্মেলন স্থগিত। পরবর্তী সময়ে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত না হলেও সম্প্রতি সার্কের প্রোগ্রামিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে সদস্য দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৯-১০ নভেম্বরে ইসলামাবাদে ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে অব্যাহত পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ এবং পাল্টা কূটনীতিক প্রত্যাহারের ঘটনায় দুই দেশের মধ্যকার টানাপোড়েনে ইসলামাবাদে সম্মেলনে অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতিতে ভারতও সম্মেলন বর্জনের ঘোষণা দেয়। পরে একই পথে হাঁটে ভুটান ও আফগানিস্তান।

ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ওই সময় সাংবাদিকদের জানান, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অব্যাহতভাবে নাক গলানোয় ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এ সিদ্ধান্ত একান্তই নিজস্ব, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।

ওই পরিস্থিতি এখন না পাল্টালেও কূটনীতিকরা বলেছেন, সার্ক নিষ্ক্রিয় হোক সেটা কোনো সদস্য দেশই চায় না। নিজেদের মধ্যে কিছু কিছু মতবিরোধ থাকতে পারে। সেগুলো কাটিয়ে উঠে আবারও সার্ককে সক্রিয় করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১-২ ফ্রেব্রুয়ারি সফলভাবে সার্কের প্রোগ্রামিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সার্ক শিক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের একটি বৈঠক রয়েছে। এরপরই রয়েছে অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কিছুদিন আগে এক্সপার্ট লেভেলের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছিল না। সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। তবে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকগুলো সফলভাবে শেষ হলে সার্কের স্থবিরতা কাটবে- এমনটি বলা সার্থক হবে।’

সার্কের ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন কবে- এমন প্রশ্নের জবাবে ‘বিষয়টি অনিশ্চিত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপাতত বিষয়টি নিয়ে ভাবা হচ্ছে না। সার্কের অন্যান্য বিষয় সঠিকভাবে এগিয়ে গেলে শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠানেও কোনো বাধা থাকবে না।

‘তবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এ সম্মেলন অনুষ্ঠানের বড় বাধা’ বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সার্কের সাবেক মহাসচিব নেপালের অর্জন বাহাদুর থাপার মেয়াদ শেষ হলেও জটিলতার কারণে পাকিস্তানের কূটনীতিক আমজাদ হোসেন সিয়াল দায়িত্ব নিতে পারছিলেন না। সার্কের নিয়ম অনুযায়ী, নতুন মহাসচিব নিয়োগে সার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি উপস্থাপন করতে হয়। কিন্তু পাকিস্তান সেটি না করায় মহাসচিব নিয়োগ নিয়ে আপত্তি তোলে ভারত। পরে সে সমস্যার সমাধান করে পাকিস্তান। এরপরই আমজাদ হোসেন সিয়াল সার্ক মহাসচিবের দায়িত্ব নেন।

এদিকে সদস্য দেশগুলোর দ্বিপাক্ষিক মতবিরোধের কারণে সার্কের মতো সংস্থার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়তে পারে না বলে মত দিয়েছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ প্রসঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্যে সার্ক গঠিত হয়। তাই দ্বিপাক্ষিক বৈরিতা থাকলেও আঞ্চলিক স্বার্থে সার্ককে এগিয়ে নেয়া সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।’

সার্ক গঠনের মূল ভূমিকায় বাংলাদেশের অবদান স্মরণ করে এ কূটনীতিক বলেন, ‘আমাদের হাতে তৈরি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে বাংলাদেশকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে।’ তার মতে, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের উত্থান-পতন, চড়াই-উৎরাই থাকতেই পারে। তবে আঞ্চলিক স্বার্থে সার্ককে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।

এ বিষয়ে ইউরোপের একটি দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশি এক রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সম্ভাবনাময় সার্ক দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। এটি হতে পারে না।’

তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের হতাশাজনক চিত্রের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ২৫ শতাংশ, ইউরোপে ৪০ শতাংশ অথচ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য মাত্র ৫ শতাংশ। সার্ককে সক্রিয় করার মাধ্যমে এ চিত্রপট বদলানো সম্ভব।’



মন্তব্য চালু নেই