মেইন ম্যেনু

১৬ জানুয়ারির রায় দেখার অপেক্ষায় পরিবার

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার ৩৫ আসামির পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। আসামিদের সবার যুক্তিতর্ক শেষে আগামী ১৬ জানুয়ারি রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। এ মামলায় নূর হোসেনসহ সব আসামির ফাঁসি দাবি করেছেন বাদী পক্ষের আইনজীবী ও ভুক্তভোগীদের পরিবার।

১৬ জানুয়ারি সোমবার সকালে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালত সৈয়দ এনায়েত হোসেন এ রায় ঘোষণা করবেন। আসামিদের উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করবেন বিচারক।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর (বুধবার) সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে গ্রেফতারকৃত চাকরিচ্যুত র‌্যাব কর্মকর্তা এম এম রানার অসমাপ্ত যুক্তিতর্ক এবং এসআই বজলুর রহমান ও আসাদুজ্জামানের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়।

ওই সময় নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, সাত খুনের দুটি মামলায় গ্রেফতারকৃত ২৩ ও পলাতক ১২ আসামির সবার যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আদালত ১৬ জানুয়ারি রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ফতুল্লা খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করেন র‌্যাব-১১ এর বিপদগামী সদস্যরা। পরে শীতলক্ষ্যা নদীতে তাদের মরদেহ পাওয়া যায়।

এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় প্রথমে একটি মামলা করেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। পরে আরও একটি মামলা করেন নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল।

দুটি মামলার চার্জশিটে অভিন্ন ৩৫ জন করে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে ২৩ জন গ্রেফতার ও ১২ জন এখনও পলাতক।

সাত খুনের ঘটনায় দুটি মামলা হলেও ১২৭ জনকে অভিন্ন সাক্ষী করা হয়। এর মধ্যে ১০৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। মামলায় ৩৫ জন আসামির মধ্যে ২৩ জন গ্রেফতার হলেও বাকি ১২ জনকে পলাতক দেখিয়ে সাক্ষ্য ও জেরার পর গত ৩০ নভেম্বর যুক্তিতর্ক শেষ হয়।

গ্রেফতাররা হলেন- প্রধান আসামি নূর হোসেন, চাকরিচ্যুত র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক মোহাম্মদ সাঈদ, উপ-অধিনায়ক মেজর আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার এমএম রানা, ল্যান্স নায়েক বিল্লাল হোসেন, সাবেক এসআই পুর্ণেন্দু বালা, হাবিলদার মো. ইমদাদুল হক, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স কর্পোরাল রুহুল আমিন, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. সিহাব উদ্দিন, রেডিও অপারেটর গেইন (আরওজি) মো. আরিফ হোসেন, এএসআই বজলুর রহমান, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, হাবিলদার ও গাড়িচালক নাসিরউদ্দিন, সিপাহি নুরুজ্জামান, বাবুল হাছান, সিপাহি সাবেক সেনা সদস্য আসাদুজ্জামান এবং নূর হোসেনের প্রধান বডিগার্ড মর্তুজা জামান চার্চিল, প্রধান ক্যাশিয়ার আলী মোহাম্মদ, ক্যাশিয়ার সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক আবুল বাশার, মাদক স্পট পরিচালনাকারী রহম আলী ও মিজানুর রহমান।

পলাতকরা হলেন- নূর হোসেনের সহযোগী ভারতে গ্রেফতার সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন, র‌্যাবের কর্পোরাল লতিফুর রহমান, সৈনিক আবদুল আলী, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, সৈনিক আলামিন শরীফ, সৈনিক তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবির, এএসআই কামাল হোসেন, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান।

অভিযোগপত্র জমা

চাঞ্চল্যকর সাত খুন ঘটনায় আদালতে দাখিল করা দুটি মামলায় ১৬ পৃষ্ঠা করে চার্জশিটে সাতজনকে অপহরণ ও পরে হত্যার ঘটনায় ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

এতে সাক্ষী করা হয়েছে ১২৭ জনকে। মামলায় ১৬২ ধরনের আলামত উদ্ধার দেখিয়ে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এতে র‌্যাবের তিন কর্মকর্তা ও নূর হোসেনসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ মণ্ডল নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম চাঁদনী রূপমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামির নাম বাদ দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি।

তবে দুই মামলায় অভিযোগপত্রে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেন ও এম এম রানাসহ ২৫ র‌্যাব সদস্যকে আসামি করা হয়। বাকি ১০ জনের মধ্যে নূর হোসেন ও তার সহযোগী রয়েছেন।

অব্যাহতি পাওয়া পাঁচজন হলেন- সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি ইয়াসিন মিয়া, ইকবাল, হাসমত আলী হাসু, সিদ্ধিররগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রাজু ও আনোয়ার।

সাত খুন মামলার র‌্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের জবানবন্দি নেয়া হয়। এম এম রানার আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ছিল ১১ পৃষ্ঠার। যেখানে উঠে এসেছে সাতজন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ।

২০১৪ সালের ৫ জুন রানার আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। আলোচিত ৭ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রথম দায় স্বীকার করেন অপহরণ, হত্যা ও গুমের মিশনে নেতৃত্ব দেয়া রানা।

২০১৪ সালের ১৭ মে ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় এম এম রানাকে। পরে কয়েক দফা রিমান্ডে নেয়ার পর রানা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

আরিফের জবানবন্দি

সাত খুন নিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন র‌্যাবের চাকরিচ্যুত মেজর আরিফ হোসেন। তিনি ২০১৪ সালের ৪ জুন ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন। তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিন।

সব আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রত্যাশা

আলোচিত সাত খুন মামলার রায়ে সব আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেছেন নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওয়াজেদ আলী খোকন।

তিনি বলেন, অনেক দ্রুত সময়ের মধ্যে সাত খুন মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছে। এখন বহুল প্রতীক্ষিত রায়ের পালা। সাত খুনের ঘটনায় ১২৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১০৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে মাত্র আট মাসের মধ্যে।

এছাড়া সাত কার্যদিবসের মধ্যে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। যুক্তিতর্কের শুরু থেকে সাত খুনের দুটি মামলায় অভিযুক্ত ৩৫ আসামির বিরুদ্ধে সাত খুনের পরিকল্পনা, অপহরণ, হত্যা ও গুমসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রমাণাদি শতভাগ উপস্থাপন করতে পেরেছি। আমরা ৩৫ আসামির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করেছি।

পিপি ওয়াজেদ আলী খোকন আরও বলেন, আসামিদের মধ্যে অনেকে বিত্তশালী। তাই তাদের সম্পদ আইনগত প্রক্রিয়ায় নিয়ে সেই সম্পত্তি সাত খুনের ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি আদালতে।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, সাত খুন মামলার সুষ্ঠু বিচার হবে এ প্রত্যাশা শুধু নারায়ণগঞ্জবাসীর নয়, পুরো দেশের মানুষ এ রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। সেই আস্থা থেকে আমার প্রত্যাশা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। কারণ আদালতে ২১ জন আসামির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার ও সাক্ষ্য প্রমাণে আসামিদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে।

নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও একটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি। আমরা চাই আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেবেন আদালত। হত্যাকাণ্ডের রায়ে অন্য খুনিরা যেন মানুষকে খুন করার সাহস না পায়।

নিহত গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূপুর বেগম বলেন, ‘আমি বিধবা হয়েছি। আমার সন্তান বাবাকে হারিয়েছে। এ আসামিদের সবার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। সরকার এর সুষ্ঠু বিচার করে আসামিদের ফাঁসি দেবে, এটাই আমার প্রত্যাশা।’

নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেন, ‘আমরা ভুক্তভোগী পরিবার। আদালতের কাছে প্রার্থনা, এমন একটা রায় দেন, যাতে আর কোনো বাবাকে তার সন্তান না হারাতে হয়।






মন্তব্য চালু নেই