মেইন ম্যেনু

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

সাত লাশ নদীতে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন সাঈদ

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় ষষ্ঠ দফায় ৩২ দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন র‌্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ।

জবানবন্দিতে সাঈদ স্বীকার করেছেন সাতজনকে অপহরণের বিষয়টি তিনি জানতেন। তবে সবাইকে হত্যা করার বিষয়টি তাকে জানানো হয়নি। অপহরণের পর তাদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে তেমনটাই তাকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু রাতের বেলায় সাতজনকে হত্যার পর বিষয়টি তাকে জানানো হয়।

বুধবার বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের খাস কামরায় সাত খুনের ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।

১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক ওই জবানবন্দিতে এসব কথা বলেছেন র‌্যাবের সাবেক ওই অধিনায়ক। তারেক সাঈদ আদালতকে আরো বলেছেন, রাতের বেলায় সাতজনকে হত্যার ঘটনা ঘটান মেজর আরিফ ও নূর হোসেনসহ র‌্যাবের কিছু সদস্য। কিন্তু সাত জনের লাশ দেখে তিনি অনেকটাই হতবিহ্বল পড়েছিলেন। এরপর ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার জন্য লাশ নদীতে ফেলতে মেজর আরিফকে নির্দেশ তিনি।

জবানবন্দি শেষে বিচারক তারেক সাঈদকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে একই আদালতে গত ৪ জুন আরিফ হোসেন ও পরদিন ৫ জুন এম এম রানা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে সাত খুনের ঘটনায় নিজেদের দোষ ও দায় স্বীকার করেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের একজন কমকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সকাল ৮টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইন থেকে তারেক সাঈদকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নারায়ণগঞ্জ আদালতে আনা হয়। পরে তাকে নেয়া হয় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে। সেখানে তাকে প্রথমে জবানবন্দি দেয়ার ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার সুযোগ দেয়া হয়। বেলা ১১টা হতে জবানবন্দি দেয়া শুরু করে তারেক সাঈদ।

আদালতে ১৬৪ ধারায় তারেক সাঈদের দেয়া জবানবন্দিতে জানানো হয়েছে, নজরুলকে তুলে আনার বিষয়ে জানতেন তারেক সাঈদ। যখন ওই সাতজনকে তুলে আনা হয় তখন অধিনায়ক নিজের অফিসেই ছিলেন। তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন আরিফ ও রানা। সাতজনকে অপহরণের পর তাদের বহন করা মাইক্রোবাসটি নরসিংদী নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাদের হত্যার পরিকল্পনা করা হলেও আরিফ চেয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জে এনেই তাদের হত্যা করবে। আরিফ রিস্ক নেয়াতেই অপহৃতদের নারায়ণগঞ্জে এনে হত্যা করা হয়। রাতে যখন সাতজনের লাশ শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরে কাঁচপুর ব্রিজের জনশূন্য স্থানে নিয়ে আসা হয় তখন এতগুলো লাশ দেখে আঁতকে ওঠেন তারেক সাঈদ। তখন তিনি সাতজনকেই হত্যা করায় আরিফ ও রানাকে বকাঝকা করেন। কিন্তু তখন তার কিছুই করার ছিল না। পরে সাত জনের লাশ শীতলক্ষ্যার বন্দর উপজেলার মদনগঞ্জের চর ধলেশ্বরী এলাকায় ডোবানোর মিশনে নিজেই অংশ নেন তারেক সাঈদ।

প্রসঙ্গত, সাত খুনের ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের হয়। প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার ৪ সহযোগিকে হত্যার ঘটনায় নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটির দায়ের করা হত্যা মামলায় প্রথমে জবানবন্দি দেন তারেক সাঈদ। পরে তারেক সাঈদ অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালক হত্যার ঘটনায় চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় পালের দায়ের করা মামলায় জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে কী উল্লেখ করা হয়েছে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রিমান্ডে থাকার সময়ে তারেক সাঈদ বার বার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের দায় অস্বীকার করেছিলেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের খাসখামরায় তারেক সাঈদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। এতে তিনি বেশ কিছু তথ্য প্রদান করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের এস আই আশরাফ ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি প্রদানের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

উল্লেখ্য, ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরদিন ২৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। ৩০ এপ্রিল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দু’টি করে বস্তায় বেঁধে ডুবিয়ে দেয়া হয়।

সাতজনকে অপহরণের পর ২৯ এপ্রিল রাতে সে সময়ের জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তি বড়াল, পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, র‌্যাব-১১ এর সিইও তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ, ক্রাইম প্রিভেনশনাল স্পেশাল কোম্পানির কমান্ডার লে. কমান্ডার এমএম রানা, ফতুল্লা থানার ওসি আক্তার হোসেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল মতিনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এম এম রানাকে র‌্যাব থেকে চাকরিচ্যুত এবং পরে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীও তাদের অকালীন অবসরে পাঠায়।

সাত খুনের ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে গত ১৬ মে দিনগত রাতে ঢাকার সেনানিবাস থেকে আরিফ হোসেন ও তারেক সাঈদকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ।






মন্তব্য চালু নেই