মেইন ম্যেনু

সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসনের দায় কার?

জামাল উদ্দিন। বয়স ২৩ বছর। বাড়ি হবিগঞ্জে। মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনায় মন বসাতে পারেননি তিনি। বেকার জীবন কাটাচ্ছেন পাঁচ বছর ধরে। বাবা ও বড় ভাই আয় করেন। তাই পরিবারে এক ধরনের কোণঠাসা হয়ে থাকতে হয় তাকে। কাজের অনেক সন্ধান করেছেন। কাজও পেয়েছিলেন। কিন্তু কাজ পছন্দ হয়নি অজুহাতে আর কর্মক্ষেত্রের পথ মাড়াননি। ঠিক করেছেন বিদেশ যাবেন। কিন্তু বিদেশ যেতে হলে তো টাকা লাগে। এত টাকা দেবে কে?

শেষমেশ দূত হয়ে জামালের কাছে এলেন পাশের গ্রামের সাগর বিশ্বাস। বললেন, মালয়েশিয়াতে তার ভাই থাকেন। তাকে বলে একেবারে নামমাত্র টাকায় মালয়েশিয়াতে পাঠাবেন জামালকে। চোখে রঙিন স্বপ্ন জামালের। খুব বলে কয়ে বাবাকে রাজি করান তিনি। মাত্র ১০ হাজার টাকায় বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সুযোগ তো হেলায় হারানো যায় না! তবে একটু ঝুঁকিও আছে। সমুদ্রপথে থাইল্যান্ড হয়ে যেতে হবে মালয়েশিয়ায়। সাগর বোঝালেন, জামালের মতো এমন অনেকেই যাবেন এই পথে। শুরুতেই নাড়া দিয়েছিল জামালের বাবার মন। ‘সাগরপথে বিদেশ যাওয়া নাকি অবৈধ, অনেকে নাকি ধরা পড়েন। ডুবে মারা যান?’ জামালের বাবার এমন প্রশ্ন হেসেখেলে উড়িয়ে দেন সাগর। বলেন, ‘সবার কি আর সমস্যা হয়? আমাদের লাইন অনেক শক্ত। কোনো চিন্তা নাই। এক সপ্তাহেই মালয়েশিয়া থাইকা ফোন দিব জামাল।’

অপেক্ষার পালা শুরু জামালের পরিবারের। ফোন এলো। তবে মালয়েশিয়া থেকে নয়, টেকনাফ থেকে। ওপাশ থেকে জানানো হলো, জামাল উদ্দিন এখন পুলিশ হেফাজতে। তার মতো প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। যারা সবাই দালালের খপ্পরে পরে জাহাজে করে সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশ যাত্রা করতে চেয়েছিলেন। আটক হয়েছেন সাগর বিশ্বাসও। উদ্ধারের পর জামাল ও অন্যরা বুঝতে পেরেছিলেন মানবপাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার জন্যই তাদের আনা হয়েছিল কক্সবাজারে। মিথ্যা স্বপ্নের জাল বুনে এমন ফাঁদে ফেলা হয়েছিল তাদের।

পুলিশ হেফাজতে থাকা সাগর বিশ্বাস অবশ্য স্বীকার করেছেন সব কিছু। বলেছেন, প্রতি ‘বস্তা’ (পাচারের উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা মানুষকে বস্তা বলা হয়) ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় আরেক দালালের কাছে বিক্রি করেন তারা। ওখান থেকে আরেকটি দালাল চক্র টেকনাফ ও উখিয়া থেকে ট্রলারে করে মাঝ নদীতে মানুষগুলোকে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তোলা হয় বড় জাহাজে। এরপরই শুরু হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার। না খাইয়ে ঘুমের ওষুধ দিয়ে কিংবা পিটিয়ে পাচার করা হয় থাইল্যান্ডে। সেখানে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয় মানুষগুলোকে। ওখানেও টাকা আদায়ে চলে অত্যাচার। কেউ টাকা দিতে না পারলে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয় মাছ ধরার বড় নৌকা কিংবা ক্ষেত-খামারের কাজের জন্য। এদের মধ্যে অত্যাচার সইতে না পেরে মারাও যান অনেকে। যারা টাকা দিতে পারেন তাদের কেউ কেউ মালয়েশিয়ার আলো দেখার সুযোগ পেলেও সেখানে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে জেলে থাকতে হয়। এ পর্যন্ত কত মানুষ এই দুর্ভাগ্য বরণ করেছেন, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। তবে কয়েক দিন আগে থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গল থেকে ১৭১ জনকে উদ্ধার করে দেশটির পুলিশ। যাদের মধ্যে বাংলাদেশিই সিংহভাগ বলে খবর এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে।

জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে প্রতি মাসে কতজন মানুষ বিদেশযাত্রা করছেন তার কোনো হিসাব নেই সরকারের কোনো সংস্থার কাছে। নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ডের কাছেও নেই এ ধরনের কোনো তথ্য। তবে কক্সবাজারভিত্তিক সংগঠন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত তিন বছরে সমুদ্রপথে ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ মালয়েশিয়ায়  রওনা দিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচশও বেশি মানুষ মারা গেছে। খোঁজ মেলেনি দেড় হাজার মানুষের।

এই পরিসংখ্যান আঁতকে ওঠার মতোই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সমুদ্রপথে কত মানুষ বিদেশ পাড়ি জমায়, তার একটি অনুমান হতে পারে এই পরিসংখ্যান। কিন্তু অবৈধভাবে রাতের আঁধারে কত মানুষ সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় সাগর পাড়ি দেয়, তার সঠিক হিসাব বের করা কঠিনই বটে। কারণ যারা মাঝ সাগরে ঢেউ কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ট্রলার ডুবে মারা যায় তাদের খোঁজও মেলে না কখনো। তবে প্রায়ই বিদেশ গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার খবর আসে নানা মাধ্যমে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনের মতে, কম সময়ে অনেক অর্থকড়ির মালিক হওয়ার লোভই মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তিনি বলেন, ‘যেসব মানুষের মধ্যে কম সময়ে ধনী হওয়ার প্রবণতা থাকে, তারাই এসব ফাঁদে পা দেয়।’

ভাগ্য বদলের জন্য কেন মানুষ অবৈধ উপায় বেছে নেয়? জবাবে এই অধ্যাপক বলেন, ‘হিসাব সহজ। আপনি একটু খোঁজ নিয়ে দেখলেই জানতে পারবেন কোন শ্রেণির মানুষ এভাবে বিদেশে যেতে চাইছে। যারা একেবারে গরিব ও নিরক্ষর। কৃষিকাজ করেন কিংবা বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছেন এমন যুবকরাও টার্গেটে থাকে দালালদের। যাদের ফুসলিয়ে ফাঁসলিয়ে নিয়ে গেলে কেউ খবর নেওয়ার থাকবে না, এমন লোককে সহজেই ফাঁদে ফেলতে পারে দালালরা। শেষমেশ যখন মানুষ বুঝতে পারে, তারা ফাঁদে পা দিয়েছে তখন আর কিছুই করার থাকে না।’

সমুদ্রপথে মানবপাচার তো নতুন নয়, অনেক দিন ধরেই চলছে এসব অপরাধ। কিন্তু এর পরও সরকার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না মানবপাচার ঠেকাতে। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে দু-চারজন দালালসহ সমুদ্রপথে পাড়ি দেওয়ার পথে মানুষকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন বাদেই যেই-সেই। কেন মানবপাচারে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার? জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আরেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘সমুদ্রপথে যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনের দায়িত্ব কোস্টগার্ডের। তারাই সমুদ্রপথে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করছে। মানবপাচার ঠেকাতে তাদের ভূমিকাই বেশি। মাঝেমধ্যে অবশ্য অভিযান চালিয়ে দালালসহ মানুষ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এর পরও কেন অহরহ এসব ঘটনা ঘটছে তা বুঝতে পারছি না।’

তবে কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া, রামুর স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এর কারণ অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, মানবপাচারের সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি অসাধু শ্রেণিও জড়িত আছে। যারা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করেন। এই সুযোগে রাতের আঁধারে অথৈ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয় জলজ্যান্ত মানুষের ভাগ্য।

কারা এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করতেও কাজ করছে পুলিশ। তালিকাও তৈরি হয়েছে দালালের। সারা দেশে চারশ থেকে পাঁচশ দালাল এই মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত বলে তালিকায় উঠে এসেছে। এসব দালাল দেশের কুমিল্লা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, যশোর, খুলনাসহ দেশের ১৯টি জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যাদের কাজ মানুষকে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে এনে কক্সবাজারে আরেক দালালের কাছে বেচে দেওয়া। কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া অঞ্চলে এমন দালাল আছে প্রায় পাঁচ শতাধিক। তাদের লোক আছে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও মালয়েশিয়ার সীমান্তে। যাদের কাজই মানুষ বেচাকেনা করা। জলদস্যুতাও তাদের পেশা। এই দালালচক্রের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ জড়িত আছে বলে বিভিন্ন সময় অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে এসব তথ্য। কক্সবাজারভিত্তিক দালালরা ওই সব দুষ্কৃতকারীর কাছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশিদের বিক্রি দেয়। কোনোমতে ট্রলার কিংবা জাহাজে তুলে দিতে পারলেই তাদের দায়িত্ব শেষ।

উপকূলের যেসব জায়গায় থেকে অবৈধ যাত্রা
অবৈধভাবে বিদেশে লোক পাঠানো হয় হয় কক্সবাজার উপকূলের এমন ৬০টি স্থান খুঁজে বের করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব রুট দিয়েই রাতের আঁধারে মানুষ সমুদ্র পাড়ি দেয় ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চিহ্নিত এসব স্থানগুলো হচ্ছে- কক্সবাজার শহরের ফিশারিঘাট, নাজিরাটেক, সমিতিপাড়া, নুনিয়াছটা, উখিয়ার সোনারপাড়া, রেজুরখাল, ইনানী, ছেপটখালী, মনখালী, মহেশখালীর সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, কুতুবজোম, ধলঘাটা, টেকনাফের বাহারছড়া, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, ঘোলারপাড়া, মাঝরপাড়া, পশ্চিমপাড়া, কাটাবনিয়া, খুরেরমুখ, হাদুরছড়া, জাহাজপুরা, কচ্ছপিয়া, শামলাপুর, সদরের ঈদগাঁও, খুরুশকুল, চৌফলদ-ী, পিএমখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়া। স্থানীয়রা জানায়, এসব রুট দিয়েই অবৈধভাবে বিদেশযাত্রা হয়। কিন্তু এই এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি খুবই কম।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, ‘এটা ঠিক পুলিশ সব সময় উপকূলীয় এলাকায় টহল দেয় না। তবে খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ ফাঁড়ি থেকে ফোর্স পাঠানো হয়। তবে মাঝ সমুদ্রে গিয়ে তো পুলিশের পক্ষে টহল দেওয়া প্রায় অসম্ভব।’

আদম পাচারে গডফাদাররা
বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আদম পাচারকারী স্থানীয় গডফাদাররা জড়িত। অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে তারা হলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির ভাগ্নে ও আবদুর রহমান দারোগার ছেলে নিপু, তার চাচাতো ভাই আকতার কামাল ও শাহেদ কামাল, সাবরাং ইউপি সদস্য নুর মোহাম্মদ, শাহপরীর দ্বীপের বাজার পাড়ার ধুলু হোসেন, চকরিয়ার মৃত মোজাহের কোম্পানির ছেলে জাফর আলম কোম্পানি, মুন্ডার ডেইল এলাকার আক্তার ফারুক ও আবদুর রহমান। বাকি তিনজনের নাম জানা সম্ভব হয়নি। বেশ কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠানো এক তালিকায় এসব ব্যক্তির নাম আছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ওই তালিকায় টেকনাফ, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্ট মার্টিনসের দুই শতাধিক দালালের নাম রয়েছে। রয়েছে কক্সবাজার শহর, মহেশখালী ও চকরিয়াকেন্দ্রিক দালালের নামও। এর বাইরে বরগুনা, পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের দালালের নামও আছে।

নিখোঁজদের জন্য নীরব কষ্ট
অবৈধ উপায়ে বিদেশযাত্রায় প্রতিনিয়তই শত শত মানুষ নিখোঁজ হচ্ছেন। এদের কোনো সুস্পষ্ট হিসাবও নেই কারো কাছে। পরিবারের লোকজনও জানে না কোথায় আছে। আবার অবৈধ উপায়ে বিদেশ গিয়েছে এ কথা জানাজানি হলে আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে, এই চিন্তা থেকেও অনেকে মুখ বুঝে থাকেন।

এমনই একজন নরসিংদীর শিবপুরের আব্দুল মালেক। দীর্ঘদিন ধরে ছেলে আব্দুল হালিমের খোঁজ পাচ্ছেন না তিনি। সাগরপথে ট্রলারে করে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা হালিমের। পাড়া প্রতিবেশীও তিন মাস ধরে এই খবর জানত না। এত দিন পরে ছেলের খোঁজ না পেয়ে দিশাহারা বাবা যাকেই কাছে পাচ্ছেন তাকেই সুধাচ্ছেন ছেলের কথা। ‘বাবা কদিন পুলাডারে দেহি না। হেই যে গেল, কক্সবাজার থাইক্যা নাকি জাহাজে মালয়েশিয়া যাওন যায়? পোলায় কইছে ওইখানে নাকি খরচ কম হয়। ২০ হাজার টাকা নিছে পোলার আরেক বন্ধুর বড় ভাই। তার বাড়িও নুসুন্দী (নরসিংদী)। পোলার লগে লগে হেও লাপাত্তা।’ কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ।

নরসিংদী সদর উপজেলার নুরালাপুর গ্রামের আবু সাঈদের ছেলে আসাদ মিয়া। বয়স ৩৫ এর কোটায়। গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে নারায়ণঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার আদম বেপারি আফাজ উদ্দিন ওরফে আব্বাসের সঙ্গে টেকনাফের সমুদ্র রুটে জাহাজে করে মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিল। বাড়িতে ফোন করে বাবাকে বলেছিলেন, তিনি মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। এজন্য আফাজকে দুই লাখ টাকা দিতে হবে। কথা ছিল মালয়েশিয়া গিয়ে ফোন করবেন। ফোন এসেছে। কিন্তু মালয়েশিয়া থেকে নয়, থাইল্যান্ড থেকে। গত ২২ মে আমিরুল নামে আসাদের ঘনিষ্ঠ একজন সাঈদকে জানান, আসাদ ও কাউসারসহ নরসিংদীর চারজন খাবারের অভাবে দুর্বল হয়ে মারা যান। তাদের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই জাহাজে নরসিংদীর শতাধিক লোক ছিলেন। মারা গেছেন ২৭ জন। তাদের সবাইকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অতীতেও অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ঘটেছে অবর্ণনীয় দুর্ঘটনা। ২০১২ সালের ৭ নভেম্বর রাত ১০টার দিকে টেকনাফ উপকূলে ১১০ জন যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলার উল্টে যায়। পরদিন সকালে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও বিজিবির সদস্যরা সমুদ্রে তল্লাশি চালিয়ে ২৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করলেও নিখোঁজ থাকেন আরো ৮২ জন। এরা সবাই টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী, ডেইলপাড়া, পুরানপাড়া, ঝিনাপাড়া, গুচ্ছগ্রামসহ আশপাশের ১৩টি গ্রামের মানুষ।

হারিয়াখালী ও খুরেরমুখ গ্রামের অনেক ঘরে এখন শোকের মাতম। নিখোঁজ স্বজনের জন্য আহাজারি করছেন তার আত্মীয়রা। হারিয়াখালী গ্রামের আছমা খাতুন জানান, অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সময় ট্রলারডুবির ঘটনায় তার ছেলে কবির হোসেন নিখোঁজ আছেন। আরো নিখেঁাঁজ রয়েছেন হারিয়াখালী গ্রামের আবদুর রশিদের ছেলে ও নায়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আবদুল্লাহ, হাবিবের ছেলে ইসমাঈল, আবদুল মালেকের ছেলে মুহিব উল্লাহ, কালু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ ছৈয়দ, করিম উল্লাহর ছেলে সলিম উল্লাহ, গুরা মিয়ার ছেলে কেফায়েত উল্লাহসহ অনেকে।

অভিধানে ধরা পড়েন অনেকে, তবুও বন্ধ হচ্ছে না
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের অভিযানে প্রায়ই দালালসহ অনেকেই ধরা পড়েন। কিন্তু এর পরও এই পথে অবৈধভাবে বিদেশ পাড়ি দেওয়া বন্ধ হয় না। এর পেছনে কারণ কী? জবাবে স্থানীয় সূত্র জানায়, যারা ধরা পড়েন তারা কোনো না কোনোভাবে আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যান। পরে আবারও এসব দালাল নতুন করে মানুষ সংগ্রহ করতে নামেন। একপর্যায়ে কয়েক শ লোক জোগাড় হলে আবারও একভাবে পাচার করেন।

মানবপাচার ঠেকাতে আইনের আরো কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মানবপাচার প্রতিরোধে যে আইন আছে তার কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। কেউ যদি দেখে যে, মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে কারো কঠিন সাজা হয়েছে তাহলে অন্যরা এতে ভয় পাবে। আর এই শ্রেণির দালালদের হাত থেকে বেঁচে থাকার জন্য জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মানুষ সচেতন না হলে এসব দালালের দৌরাত্ম্য একেবারে বন্ধ করা কঠিন হবে।’

সাগর পাড়ি দিয়ে যারা পেঁৗঁছায় তারাও থাকে বিপদে
এত কিছুর পরও কোনো না কোনো ভাবে অনেক বাংলাদেশি প্রতিনিয়তই সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া কিংবা থাইল্যান্ডে পৌঁছায়। কিন্তু সেখানে গিয়েও তাদের মানবেতর জীবন-যাপন করতে হয়। কেউ ধরা পড়ে কারাগারে আছে দীর্ঘদিন ধরে। অথচ কেউ তাদের কোনো খবর জানে না। তাই গ্রেপ্তার এড়াতে লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করতে হয় অবৈধদের। সূত্র জানায়, থাইল্যান্ড যাওয়ার পথে যদি ওই দেশের নৌ ও কোস্টগার্ডদের কাছে কেউ ধরা পড়ে তবে তাদের হাত-পা বেঁধে ইঞ্জিন ছাড়া নৌকায় করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে দেখা যায়, তারা ভাসতে ভাসতে কোথাও গিয়ে ডুবে মারা যায়। এ ছাড়া মালয়েশিয়াতে যারা অবৈধভাবে কাজ করে তাদের অনেকে দুই থেকে আড়াই হাজার রিঙ্গিত আয় করে, যা বাংলাদেশি টাকায় ৩০-৩৫ হাজার টাকার মতো। এই টাকা থেকে নিজের ব্যয় মিটিয়ে বাড়িতেও খুব বেশি পাঠাতে পারেন না বাংলাদেশি কর্মীরা। আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে অনেকে পাহাড় ও বনে-বাদারেও থাকেন বলে জানা গেছে।

যেভাবে পৌঁছানো হয় মালয়েশিয়ায়
মানবপাচারে সারাদেশে শক্তিশালী একটি চক্র সক্রিয় আছে। একটি সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার দালাল এসব কাজের সঙ্গে জড়িত আছে। যারা গ্রামের উঠতি বয়সের যুবকদের নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে, কম সময়ে সহজে বিদেশ যাওয়ার পরামর্শ দেয়। পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় পরিবারের লোকজনও এসব প্রস্তাবে সাড়া দেন। ফলে তারা হারান সন্তান। আবার টাকা দিতে গিয়ে জমিজমাও বিক্রি করে অনেকে। কক্সবাজারের স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব অপকর্ম হয়ে থাকে। যে জন্য মানবপাচার নিয়ে এত হাঁকডাক শোনা গেলেও এর পেছনে মূল হোতারা বরাবরই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তারাও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তাদের সহযোগিতায় দুষ্কৃতকারীরা এসব কাজ করে থাকে। এজন্য মোটা অঙ্কের মাসোহারাও পায় তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জনপ্রতি ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায় মালয়েশিয়া লোক পাঠানো হয়ে থাকে। একসময় ট্রলারে করে সরাসরি থাইল্যান্ড হয়ে এসব লোক পাঠানো হলেও বর্তমানে অন্যভাবে পাঠানো হচ্ছে। সাগরে নির্ধারিত দূরত্বে বড় জাহাজ অপেক্ষা করতে থাকে। আর ওই জাহাজে ট্রলারে করে লোক পেঁৗঁছে দিয়ে ফেরত আসে ট্রলার। তবে এজন্য পুলিশকে চাঁদা হিসেবে জনপ্রতি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পুলিশের সোর্সের কাছে বুঝিয়ে দিতে হয়। টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নুর মোহাম্মদ ও বাহারছড়ার আওয়ামী লীগের এক সহযোগী সংগঠনের এক নেতার বিরুদ্ধে পুলিশের নামে এ টাকা সংগ্রহ করার প্রমাণ আছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, থাইল্যান্ডভিত্তিক চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে টেকনাফের প্রভাবশালী ১০ ব্যক্তি। শুধু তাই নয়, পাচার হওয়া মানুষকে থাইল্যান্ড জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে এই ১০ জনের বিরুদ্ধে।

অবৈধ পথে বিদেশগামীদের দুর্ভোগ পিছু ছাড়ে না কখনো
অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যারা দেখে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ডের মুখ তাদের ভোগান্তিও পিছু ছাড়ে না। সেখানে গিয়েও মানবেতর জীবন-যাপন করতে হয় তাদের। কেউ ধরা পড়ে কারাগারে আছে দীর্ঘদিন ধরে। অথচ কেউ তাদের কোনো খবর জানে না। তাই গ্রেপ্তার এড়াতে লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করতে হয় অবৈধদের। সূত্র জানায়, থাইল্যান্ড যাওয়ার পথে যদি ওই দেশের নৌ ও কোস্টগার্ডদের কাছে কেউ ধরা পড়েন তবে তাদের হাত-পা বেঁধে ইঞ্জিন ছাড়া নৌকায় করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে দেখা যায়, তারা ভাসতে ভাসতে কোথাও গিয়ে ডুবে মারা যায়। এ ছাড়া মালয়েশিয়াতে যারা অবৈধভাবে কাজ করে তাদের অনেকে দুই থেকে আড়াই হাজার রিঙ্গিত আয় করে, যা বাংলাদেশি টাকায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মতো। এই টাকা থেকে নিজের ব্যয় মিটিয়ে বাড়িতেও খুব বেশি পাঠাতে পারেন না বাংলাদেশি কর্মীরা।

থাই জঙ্গলে শতাধিক বাংলাদেশি!
থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলের বন্দিদশা থেকে গত এক সপ্তাহে ১৭১ জনকে উদ্ধার করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদের মধ্যে সিংহভাগই বাংলাদেশি। আছে রহিঙ্গারাও। উন্নত চাকরির লোভ দেখিয়ে তাদের ওষুধ খাইয়ে ও হাত-পা বেঁধে নৌকায় করে থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক এ ঘটনার পর গত ১৮ অক্টোবর রাতে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, থাইল্যান্ডের জঙ্গল থেকে যাদের উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ১২২ জন বাংলাদেশি বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। বাকিরা মিয়ানমারের নাগরিক হতে পারেন। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের ব্যাপারে তারা ইতিমধ্যে থাইল্যান্ড সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা যাতে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের জাতীয়তা যাচাই করতে পারেন, সে জন্য থাই কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশিদের জাতীয়তা নিশ্চিত করার পর তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তাদের আপাতত থাংরা প্রদেশে রাখা হয়েছে।

এদিকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের এখন অবৈধ অভিবাসী হিসেবে কারাগারে পাঠাতে চাইছে থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু এই পদক্ষেপ নিয়ে সে দেশেরই কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেননা অতীতে এ ধরনের অবৈধ অভিবাসীরা কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তাদের আবার পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

দাস হিসেবে বিক্রি করা হতো বাংলাদেশিদের
বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডের উপকূলে জঙ্গলের মধ্যে লুকানো কিছু ক্যা¤প থেকে মোট ১৭১ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। তাদের দাসশ্রমিক হিসেবে খেতখামার ও মাছ ধরার নৌকায় বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার আগেই স্থানীয় জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া আবদুর রহিম নামের এক বাংলাদেশি বলেছেন, জঙ্গলে নিয়ে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি তাদের। ১০ দিন তারা শুধু গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে ছিলেন। থাই দালালরা তাকে এমন মারধর করেছেন যে তিনি এখন খুঁড়িয়ে হাঁটছেন।

উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রায় ভেঙে পড়েছেন। তারা যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চাইছেন।

ফিরিয়ে আনা হবে বাংলাদেশিদের
ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব এম মুস্তাফা কামাল সাংবাদিকদের জানান, থাইল্যান্ডের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া ১১৮ বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে থাই সরকারের কাছে কনস্যুলার-সুবিধা চেয়েছে বাংলাদেশ। এসব লোকজনের নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

থাই কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে মুস্তাফা কামাল বলেন, সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসকে থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রথম দফায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৩ জনের মধ্যে ৩৮ জন নিজেদের বাংলাদেশি ও ১৫ জন মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে দাবি করেছেন। এ ছাড়া দ্বিতীয় দফার ৮১ জনের মধ্যে ৮০ জন নিজেদের বাংলাদেশি ও অন্যজন মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে দাবি করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, এ বছর বাংলাদেশের ৭৪০ জন লোক থাইল্যান্ডে ঢুকেছে। – এই সময়ের সৌজন্যে






মন্তব্য চালু নেই