মেইন ম্যেনু

তিনমাসে নিহত দুই, গুলিবিদ্ধ ২৭

যশোরে বাড়ছে পুলিশি সন্ত্রাস

যশোরে নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) যোগদানের পর থেকে পুলিশি সন্ত্রাস আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আসামি গ্রেপ্তারের নামে পুলিশ গত তিন মাসে ২৯ জনকে ঠাণ্ডামাথায় গুলি করেছে। এর মধ্যে দুজন মারা গেছে। গুলিবিদ্ধ অপর ২৭ জনের মধ্যে কয়েকজনের পা কেটে ফেলতে হয়েছে।

গুলিবিদ্ধের এসব ঘটনার পেছনে পুলিশের অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশের মুখপাত্র এএসপি রেশমা শারমীনের দাবি, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্ত্রাসীরা গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আর পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থবাণিজ্যের অভিযোগও সঠিক নয়।

সূত্রমতে, গত ২৫ মার্চ আনিসুর রহমান যশোরে পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। এর পরই পুলিশ সন্ত্রাস দমনের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এসপির যেগদানের পরদিন ২৬ মার্চ ইসরাফিলকে গুলি করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, তার কাছ থেকে একটি শ্যুটারগান, দুই রাউন্ড গুলি, একটি রাম দা, বার্মিজ চাকু ও দড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।
হাসপাতালে ইসরাফিল সেসময় সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ তাকে ধরে গুলি করে অস্ত্র উদ্ধার দেখিয়েছে। এসপির যোগদানের সাতদিনের মাথায় ১ এপ্রিল যুবক আল-আমিনকে গুলি করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নেয়ার সময় তাকে গুলি করা হয়। তবে আল-আমিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পুলিশ তাকে ধরে ঠান্ডামাথায় গুলি করেছে।

গত ৪ এপ্রিল যশোর ছাত্রলীগের সহ-অর্থ সম্পাদক হাফিজুর রহমান হাফিজকে (২৮) কারবালা থেকে আটকের পর গুলি করে পুলিশ। পুলিশের দাবি তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালালে হাফিজ পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে পুলিশ তার পায়ে গুলি করে আটক করে। হাফিজের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এ ঘটনার পর ‘পুলিশ গুলি করে ছাত্রলীগ নেতা হাফিজকে পঙ্গু করে দিয়েছে’ অভিযোগ করে শহরে পোস্টার লাগানো হয়।

গত ৮ এপ্রিল মনু মিয়া নামে এক ব্যক্তি পুলিশের গুলিতে আহত হন। মনু মিয়া আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সদস্য বলে দাবি পুলিশের। আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মনু মিয়া সাংবাদিকদের জানান, ‘আমি বাসের হেলপার। পুলিশ পুলেরহাট থেকে আমাকে ধরে ডিবি অফিসে নেয়। গভীর রাতে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে পুলিশ পায়ে গুলি করে।’
গত ২৩ এপ্রিল অভয়নগরের শংকরপাশায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যুবক সাইফুল ইসলাম শিকারী নিহত হন। পুলিশের দাবি ‘বন্দুকযুদ্ধের’ সময় তার সহযোগিদের ছোড়া গুলিতে সাইফুল মারা গেছে। সাইফুলের বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ ডাকাতি ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে আটটি মামলা রয়েছে। ২৭ এপ্রিল চাঁচড়া বধ্যভূমি এলাকায় পুলিশ আনোয়ার নামে এক ছিনতাইকারীকে গুলি করে।

২৯ এপ্রিল আবাদ কচুয়া গ্রামের মজনু পুলিশের গুলিতে আহত হন। কোতোয়ালি থানার এএসআই রবিউল আলম দাবি করেন, মজনু একজন ডাকাত। মজনুর বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ ৪-৫টি মামলা রয়েছে। একই দিন (২৯ এপ্রিল) শিবিরের যশোর পশ্চিম শাখার সেক্রেটারি রুহুল আমিন এবং শার্শা কমিটির সভাপতি আবুল কাশেমকে গুলি করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, স্বীকারোক্তি অনুযায়ী অস্ত্র উদ্ধারে গেলে দুইপক্ষের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে তারা আহত হন। তবে গুলিবিদ্ধ রুহুল আমিন দাবি করেন, সকালে আটক করে দুপুরে তাদেরকে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। মধ্যরাতে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গুলি করে পুলিশ।

গত ৩০ এপ্রিল মনিরামপুর উপজেলায় যুবক রফিকুল ইসলামকে গুলি করে পুলিশ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রফিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, রাত ৯টার দিকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে সারারাত থানায় রেখে ভোরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গুলি করে।

গত ৪ মে শহরের চাঁচড়া চেকপোস্ট এলাকার আরিফ হোসেন ও আবদুর রানাকে গুলি করে পুলিশ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরিফ হোসেন জানান, দুপুরে দেড়টার দিকে খাজুরা রাজার থেকে মোটর সাইকেল সারা অবস্থায় পুলিশ তাকে ও রানাকে আটক করে। এরপর রাত সাড়ে ৮টার দিকে রজনীগন্ধা ফিলিং স্টেশনের পিছনে নিয়ে গুলি করে।

গত ১১ মে অভয়নগরের প্রেমবাগে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শিবির নেতা সুলাইমান কবির গুলিবিদ্ধ হন। আহত শিবির নেতা উপজেলার বনগ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি যশোর আল হেরা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথমবর্ষের ছাত্র ও বসুন্দিয়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি। সুলাইমানের দাবি, ঘটনার দিন দুপুরে তিনি ধান বিক্রি করতে নওয়াপাড়া যান। সেখান থেকে আওয়ামী লীগ কর্মীরা তাকে পুলিশে দেয়। গভীর রাতে পুলিশ তার চোখ বেঁধে প্রেমবাগ এনে গুলি করে।

গত ১৪ মে রাতে আবুল কাশেমের পায়ে গুলি করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, কাশেম ১২ মামলার আসামি। রাতে আবুল কাশেমের স্বীকারোক্তিতে খড়কি এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় তার অনুসারীরা পুলিশের ওপর বোমা নিক্ষেপ করে। তখন পালাতে গিয়ে সে গুলিবিদ্ধ হন। একইদিন জাহিদুল ইসলাম মোড়লকে চুড়মনকাঠি থেকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। রাতে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য পুলিশ তাকে নিয়ে সদরের শ্যামনগর গ্রামে যায়। সেখানে জাহিদুরের ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনায়। জাহিদ যশোর শহর শিবিরের সভাপতি ও যশোর এমএম কলেজ অনার্সে অধ্যয়নরত। ঘটনার দিন বিকেলে জাহিদুলের বাবা আবুল খায়ের তার ছেলের প্রাণ ভিক্ষা দাবি করে যশোর প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেন।

গত ৩০ মে ভোরে ঝুমঝুমপুর এলাকায় পুলিশের কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন মাদক ব্যবসায়ী তাহের (৪০)। তার পরিবারের দাবি, প্রতিপক্ষ মাদক ব্যবসায়ী আরএনরোডের মহসিন ‘পুলিশকে টাকা দিয়ে’ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটায়।

বন্দুকযুদ্ধের পরদিন ৩১ মে রাতে মাসুদুর রহমান নান্নুকে গুলি করে পুলিশ। গুলিবিদ্ধ নান্নুর নামে ৪টি হত্যাসহ মোট ১২টি মামলা হয়েছে।

সর্বশেষ শহরের ডালমিল এলাকায় ব্যবসায়ী সালমান শিকদার ও যুবক ইব্রাহিমকে গুলি করে পুলিশ। সালমানের আটক করে তার বাবার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করে। কিন্তু টাকা না দেয়ায় পুলিশ তার হাঁটুতে গুলি করে। এতে তার পা কেটে ফেলতে হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। সালমানের নামে একটি ছুরিকাঘাত করার মামলা রয়েছে।






মন্তব্য চালু নেই