মেইন ম্যেনু

মহান মে দিবস আজ

সকলেরই এটা জানা যে, মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো নগরীতে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মসময় নির্ধারণ ও ন্যায্য মজুররি দাবিতে সর্বাত্মক ধর্মঘট শুরু করেন।

তখন আমেরিকা ও ইউরোপে শ্রমিকদের দৈনিক ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। ওভার টাইম-এর নীতিমালা ছিল না। তাই শ্রমিকরা মালিকপক্ষের এ ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় ৩ ও ৪ মে।

এই দুদিনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ১০ শ্রমিক। বহু শ্রমিককে পুলিশ গ্রেফতার করে। তাদের মধ্যে ছয়জনকে পরে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। শ্রমিক আন্দোলনের এ গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৮৯০ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে মহান মে দিবস।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে মে দিবস পালন করা হয়ে থাকে। দিনটি ১৯৭২ সাল থেকেই সরকারি ছুটির দিন। কিন্তু যাদের রক্তে রাঙানো সংগ্রামের স্বীকৃতি এ দিবস, সেই শ্রমিক ও মেহনতী মানুষ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কোনো ক্ষেত্রেই আজও এদেশে তাদের ন্যূনতম মর্যাদা ও অধিকার লাভ করেনি।

এই সমাজে শ্রমিকদেরকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না। একজন শ্রমিক মরলো কি বাঁচলো তাতে যেন কিছুই আসে যায় না। একজন গার্মেন্টসের শ্রমিক রহিমা, সালেহা, মকবুল মরলে পরদিনই ১০০ টাকায় আরেকজন হালিমা, মাজেদা, শামসুলকে পাওয়া যাবে। একজন ‘মানুষ’ হিসেবে নয়, তাদের মূল্য কেবল এই কারণে যে, তারা শ্রমশক্তির যোগানদাতা।

দিবসটি উপলক্ষে পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপতির বাণী :
মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবময় দিন। আজ থেকে ১২৯ বছর আগে ১৮৮৬ সালের ১ মে শিকাগো শহরে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক সংগঠনের যে বিজয় অর্জিত হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতায় শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে বিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। আমি আজকের এ দিনে বিশ্বের সকল মেহনতি মানুষকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।

বর্তমান বিশ্ব পরিবর্তনশীল এবং তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ। মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উন্নত কর্মপরিবেশ, শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিতকরণসহ বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন করার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য শ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা খুবই জরুরি বলে আমি মনে করি। বর্তমান সরকার শ্রমিকদের কল্যাণে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে এবং দেশের মেহনতি শ্রমজীবী মানুষ এর সুফল পাচ্ছেন।

শিল্প-কলকারখানার সামগ্রিক উন্নয়নে প্রয়োজন মালিকের সদিচ্ছা, শ্রমিকের একাগ্রতা এবং পারস্পরিক আন্তরিকতা। সকল পক্ষের ইতিবাচক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে শ্রম ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিসহ পণ্য উৎপাদনে সহায়ক হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। সরকার বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করতে ‘ভিশন ২০২১’ ঘোষণা করেছে। এ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে শ্রমিক-মালিকের মধ্যকার বিদ্যমান আন্তরিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখে উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। একথা অনস্বীকার্য যে, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে শিল্পোদ্যোক্তা, মালিক ও শ্রমিকের সম্মিলিত প্রয়াস একান্তভাবে কাম্য। সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে সক্ষম হব বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

মহান মে দিবসের সঙ্গে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার, স্বার্থ ও কল্যাণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আট ঘণ্টার কর্মদিবস, মজুরি বৃদ্ধি, কাজের উন্নততর পরিবেশসহ শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত মে দিবসের তাৎপর্য এখনো বিশ্বে সমভাবে প্রযোজ্য। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় সকলে এগিয়ে আসবেন, মহান মে দিবসে এ প্রত্যাশা করি। আমি মহান মে দিবস ২০১৫ উপলক্ষে গৃহিত সকল কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করি।’

প্রধানমন্ত্রীর বাণী :
মহান মে দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেছেন, ‘মহান মে দিবস শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অবিস্মরণীয় দিন। এ দিবস উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি। তাদের জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

১৮৮৬ সালের এ দিনে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকরা আত্মাহুতি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক অধিকার। আমি তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন বঞ্চিত, মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছেন। তিনি বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত। একদিকে শোষক, আরেকদিকে শোষিত- আমি শোষিতের পক্ষে। তিনি পরিত্যক্ত কলকারখানা জাতীয়করণ করে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। জাতির পিতার আদর্শ অনুসরণ করে আমরা দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ও কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

আমরা বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালু করেছি। পোশাক শিল্পসহ ৩৮টি শিল্পখাতের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতর মজুরি ঘোষণা করেছি। জাতীয় শিশু শ্রমনীতি ২০১০ এবং জাতীয় শ্রমনীতি ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে। মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সুসম্পর্ক বজায় রাখা, নিরাপদ কর্ম পরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা বিভিন্নমুখি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি। দেশের শিল্পখাতের উন্নযনে সরকারের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে আমরা ‘কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে উন্নীত করেছি। এর জনবল তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করা হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনবল বৃদ্ধি করাসহ শ্রম পরিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আমরা শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে লাগসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে রূপকল্প ২০২১ ও রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।

আমি আশা করি, মহান মে দিবসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শ্রমিক এবং মালিক পরস্পর সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে কলকারখানার উৎপাদন বৃদ্ধিতে আরো নিবেদিত হবেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
আমি মহান মে দিবস ২০১৫ উপলক্ষে গৃহীত সকল কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করি।’

আশার খবর এই যে, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিধিমালা সংশোধন করে শ্রমিকদের সহায়তার পরিমাণ ২০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকায় বৃদ্ধিও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া শ্রমিকদের ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষার জন্য এককালীন সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার মহান মে দিবস উপলক্ষে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু এসব কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিধিমালাটি আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এমন সেটি চূড়ান্ত করা হবে।’

শ্রম প্রতিমন্ত্রী জানান, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে এ পর্যন্ত ৪৭টি প্রতিষ্ঠান ৮৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা দিয়েছে। তহবিলের টাকা ব্যাংকে এফডিআর (স্থায়ী আমানত) হিসেবে রাখা হয়েছে। মুনাফাসহ বর্মমানে তা ৮৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

প্রতিবারের মতো এবারও মহান মে দিবস উপলক্ষে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী। এবার মে দিবসের স্লোগান হচ্ছে, ‘শ্রমিক-মালিক ঐক্য গড়ি, সোনার বাংলা গড়ে তুলি।’

মে দিবস উপলক্ষে পহেলা মে সকাল সাড়ে ৭টায় শ্রম প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে শ্রম ভবনের (রাজধানীর রাজউক এভিনিউ) সামনে থেকে একটি র‌্যালি বের হবে। র‌্যালিটি দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে বায়তুল মোকাররমের উত্তর দিক দিয়ে পল্টন মোড় হয়ে প্রেসক্লাবে গিয়ে শেষ হবে। বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মে দিবসের অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করবেন। দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে সকাল ও বিকেলে দুটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।

শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে গ্রামীণফোনের ১৭ কোটি টাকা সহায়তা : ২০১৪ সালের কোম্পানির লাভ থেকে ১৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে দিয়েছে গ্রামীণফোন। বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর হাতে একটি চেক তুলে দেওয়া হয়। এ সময় শ্রম সচিব মিকাঈল শিপার, গ্রামীণফোনের প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ শাহেদ ও গ্রামীণ ফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মাহমুদ হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।






মন্তব্য চালু নেই