মেইন ম্যেনু

ভাষার মাসেও দর্শনার্থী অভাবে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট দেশে ও দেশের বাইরে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের জন্য বেশ কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে। অথচ প্রতিষ্ঠার পর ছয় বছর পার হলেও অনেক কাজই এখনো শুরু হয়নি।

পাঁচ বছর আগে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে নির্মাণ করা হয় ভাষা জাদুঘর। এরপর এই জাদুঘরে সংযোজিত হয়নি নতুন কোনো উপকরণ। তাই ভাষার মাসেও দেখা মেলে না দর্শনার্থীদের। ফলে বিশ্বব্যাপী বাংলাকে পরিচিত করে তোলার প্রয়াস থমকে আছে। আর ভাষার ইতিহাস সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটটি চলছে ঢিমেতালে। তবে ফেব্রুয়ারি মাস এলেই শুরু হয় জাঁকজমকপূর্ণ কয়েকটি অনুষ্ঠান।

সরেজমিন ইনস্টিটিউট ঘুরে দেখা যায়, ডিজিটাল ব্যানারে বিভিন্ন দেশের ভাষা ও ভাষার জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে। দেয়ালে ঝুলছে প্রাচীন মিসরীয় ভাষার লিপি, ৫ হাজার বছর আগের গুহাচিত্রের প্রতিলিপি। তবে সাজানো-গোছানো আলোকোজ্জ্বল জাদুঘরটি নির্জন। এসব দেখার জন্য একজন দর্শনার্থীও নেই। আর এ জন্যই বোধ হয় বিশাল কক্ষের জাদুঘর পরিদর্শনে আসা দর্শনার্থীদের জন্য নেই সঠিক কোনো নির্দেশনা। জনবল সংকটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিভাগের কাজও শুরু হয়নি। এদিকে প্রচার-প্রচারণার অভাবে অনেক মানুষ গুরুত্বপূর্ণ এই ইনস্টিটিউটটির কার্যক্রম ও অবস্থান সম্পর্কেও অবগত নয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ফেব্রুয়ারি মাস ছাড়া অন্য মাসে বাংলা ভাষা নিয়ে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। শুধু ২১ ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এবারও ঠিক একইভাবে ২১ ফেব্রুয়ারিতে তিন দিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন দেশের অতিথিদের নিয়ে অনুষ্ঠান করা হবে। এভাবে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে। সাধারণ মানুষ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট সম্পর্কে বলেন, মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট সম্পর্কে অল্প-বিস্তর জানা আছে, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করে কখনো দেখা হয়নি।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক শেখ মো. কাবেদুল ইসলাম বলেন, ‘গত ছয় বছরে ইনস্টিটিউটের যা অর্জন তা যথেষ্ট। কারণ বাংলা একাডেমি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানও প্রথম ছয় বছরে খুব বেশি এগোতে পারেনি। সেই হিসেবে কেবল ভাষাচর্চার জন্য বিশেষায়িত এ প্রতিষ্ঠানটির অগ্রগতি সন্তোষজনক। পর্যাপ্ত জনবল ও কারিগরি সুবিধা থাকলে কাজের গতি আরো বাড়ত।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু এর গবেষণা ও অন্যান্য কার্যক্রম এখনো আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত হতে পারেনি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নিয়ে আমাদের অনেক বড় স্বপ্ন থাকলেও হতাশারও একটি জায়গা রয়ে গেছে, আর তা হচ্ছে এটি বাংলা একাডেমি বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। গঠনতন্ত্র অনুসারে সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে হয়তো আজীবন কখনো রাজনৈতিক, কখনো বা আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারের মেজাজ-মর্জির ওপরও এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

বাংলা একাডেমি যেমন আমাদের অহংকার, তেমনি আমরা আমাদের ভাষার গৌরব ও অহংকারদীপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে দেখতে চাই, দেখতে চাই বিশ্বের ভাষা গবেষণার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে। আর তার জন্য সরকারের আন্তরিকতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, উপযুক্ত কর্মী নিয়োগ এবং সময়োপযোগী কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ।

জানা যায়, ইনস্টিটিউটের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো দেশে ও দেশের বাইরে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ক্ষুদ্র জাতিগুলোর ভাষা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, ভাষাবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা, বাংলাসহ অন্যান্য ভাষা আন্দোলন বিষয়ে গবেষণা ও ইউনেসকোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এ-সংক্রান্ত ইতিহাস প্রচার, বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ, বাংলা ভাষার উন্নয়নে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনা, ভাষা ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ, বিভিন্ন ভাষা বিষয়ে অভিধান বা কোষগ্রন্থ প্রকাশ এবং হালনাগাদকরণ, পৃথিবীর সব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার লেখ্যরূপ প্রবর্তন, বাংলাসহ পৃথিবীর সব ভাষার বিবর্তনবিষয়ক গবেষণা, ভাষা বিষয়ে গবেষণা-জার্নাল প্রকাশনা, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন, ভাষা বিষয়ে গবেষণার জন্য দেশি ও বিদেশিদের ফেলোশিপ প্রদান, ভাষা ও ভাষাবিষয়ক গবেষণায় অবদানের জন্য দেশি ও বিদেশিদের পদক ও সম্মাননা প্রদান, ভাষাবিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বৃত্তি প্রদান, ভাষাবিষয়ে আন্তর্জাতিক ভাষাপ্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও রক্ষা সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে কোনো রাষ্ট্র, দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর, বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণমালার জন্য একটি আর্কাইভ নির্মাণ, সংরক্ষণ ও পরিচালনা, ভাষা বিষয়ে জাদুঘর নির্মাণ, সংরক্ষণ ও পরিচালনা, আন্তর্জাতিক মানের গ্রন্থাগার ও গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা, ভাষা বিষয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া চ্যানেল স্থাপন, পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার ইতিহাস, নমুনা ও তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শন।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এসব কাজের মধ্যে দু-তিনটি ছাড়া বাকি কাজ এখনো শুরু হয়নি।

ইউনেসকো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়। এরপর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৯৯ সালের ৭ ডিসেম্বর পল্টনের এক জনসভায় এ সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সে ঘোষণা অনুযায়ী ২০০১ সালের ১৫ মার্চ রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। সে সময় উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান। এরপর ইনস্টিটিউটের নির্মাণকাজ চলে ধীরগতিতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১২ তলা ভিত্তির ওপর তিনতলা ভবন উদ্বোধন করেন। ইনস্টিটিউট পরিচালনার জন্য একই বছরের ১১ অক্টোবর প্রণয়ন করা হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন।






মন্তব্য চালু নেই