মেইন ম্যেনু

বিএসএফের বর্বরতা

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বর্বরতা থামছেই না। নানা নিষ্ঠুর কায়দায় হত্যা করছে বাংলাদেশীদের। এবার তাদের শিকার হলেন চুয়াডাঙ্গার জাকির। চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে নিহত বাংলাদেশী গরু ব্যবসায়ী রের লাশ দেখে বিস্মিত হতে হয়, কত নির্মম-নিষ্ঠুর হলে একজন মানুষকে এভাবে মারতে পারে কেউ!

জাকিরের লাশ উদ্ধারের পর দেখা যায়, তার দুটি চোখ ও হাত-পায়ের নখ উপড়ানো। নাক, মুখ ও কান দিয়ে তখনো রক্ত ঝরছে। ডান হাত ভেঙা। গ্রেনেডে ঝলসে গিয়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে জাকিরের শরীরের ডান পাশটা।

জাকিরের স্বজন ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিএসএফ জাকিরকে নির্যাওতন চালিয়ে হত্যা করেছে।

নিহত জাকির কামারপাড়া গ্রামের পূর্বপাড়ার মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে। তার মিঠুন ও সাথী নামের দুটি ছেলেমেয়ে রয়েছে। তারা স্থানীয় স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে।

কামারপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জাকিরের বাড়িতে কান্নার রোল পড়েছে। তার স্ত্রী শখের বানু, মা জোসনা বিবি, মেয়ে সাথী ও ছেলে মিঠুন কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে।

ময়নাতদন্তের পর মঙ্গলবার বাদ আসর জাকিরের লাশ কামারপাড়া গ্রামের কবরস্থানে দাফন করেছে এলাকাবাসী।

কামারপাড়া গ্রামের প্রবীণ প্রধান শিক্ষক ইউসুফ আলী জানান, তিনি সোমবার দর্শনা গার্লস স্কুলের জেএসসি পরীক্ষার হল থেকে ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরে সীমান্তসংলগ্ন গালার মাঠে যান দিনমজুরদের খাবার দিতে। সীমান্তসংলগ্ন মাথাভাঙ্গা নদীর ওপারে ঠিক কিনারায় বিএসএফের বিজয়পুর ক্যাম্প। আর এদিকে গালার মাঠে তার জমি। এই জমিতে কাজ করছিল মজুররা। বেলা তখন বিকেল পাঁচটা।

হঠাৎ করে সীমান্তের ৮২ নম্বর মেইন পিলারের কাছাকাছি মাথাভাঙ্গা নদীতে ভাসমান অবস্থায় মাথার কালো চুল দেখতে পায় একজন মজুর। এরপর তিনি শিক্ষক ইউসুফ আলীকে জানান। ইউসুফ আলী তৎক্ষণাৎ সীমান্তে পাহারা দেয়া গ্রামবাসীদের ডাকেন। গ্রামবাসীরা নদীর ধারে জড়ো হয়ে নিশ্চিত হন, এটা জাকিরের লাশ। তারপর কয়েকজন নদীতে নেমে লাশটি টেনে তীরে নিয়ে আসেন।

বারাদী সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, বিজয়চন্দ্রপুর গ্রামটি ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে হওয়ায় মাথাভাঙ্গা নদী সাঁতরে সহজে চলে যাওয়া যায়। অর্থাৎ এপারে বাংলাদেশের কামারপাড়া, ওপারে ভারতের বিজয়চন্দ্রপুর।

কামারপাড়া গ্রামবাসীরা জানান, ভারতের বিজয়চন্দ্রপুর গ্রামের লোকজনের সঙ্গে বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে তাদের। পূঁজা-পার্বণ ও গান-বাজনার অনুষ্ঠানে কামারপাড়া গ্রাম থেকে মোটা অংকের চাঁদা দেয়া হয়। তার পরও বিএসএফ নির্মম নির্যাতন চালিয়ে খুন করছে কামারপাড়াবাসীকে।

গ্রামবাসীরা আরো জানান, রোববার সারা দিন ঢোল বাজিয়ে গানবাজনা করে ক্যাম্পে বিএসএফ সদস্যদের আনন্দ-উল্লাস করতে দেখেছেন তারা। তাদের ধারণা, গ্রেনেড চার্জে আহত অবস্থায় জাকির বিএসএফের হাতে ধরা পড়েন। এরপর রোববার বিজয়পুর ক্যাম্পের টর্চার সেলে নিয়ে জাকিরের ওপর নির্যাতন চালায় বিএসএফ।

তাদের আরো অভিযোগ, জাকিরের আর্তনাদ যাতে কেউ শুনতে না পায়, তাই জোরে জোরে ঢোল বাজিয়ে গান-বাজনা করে বিএসএফ। একপর্যায়ে জাকির মারা গেলে তার লাশ মাথাভাঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়।

এদিকে এ ঘটনার পর বিজিবির চুয়াডাঙ্গা-৬ ব্যাটালিয়নের পরিচালক এস এম মনিরুজ্জামান জানান, জাকিরকে কে বা কারা মেরেছে তা নিশ্চিত হতে পারেনি বিজিবি। তাকে বিএসএফ অথবা ভারতীয়রা, যে কেউ মারতে পারে। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হবে বলে তিনি জানান।

এস এম মনিরুজ্জামান আরো জানান, সীমান্ত পেরিয়ে যেন কেউ অবৈধভাবে ভারতে যেতে না পারে সে জন্য বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গার বারাদী সীমান্ত দিয়ে ভারতে গরু আনতে গিয়ে রোববার ভোরে নিখোঁজ হন বাংলাদেশী গরু ব্যবসায়ী জাকির হোসেন (৩০) । এরপর সোমবার সন্ধ্যায় জাকিরের ক্ষত-বিক্ষত লাশ ৮২ নম্বর মেইন পিলারের কাছাকাছি সীমান্তসংলগ্ন মাথাভাঙ্গা নদীতে ভাসতে দেখে এলাকাবাসী। পরে তারা লাশটি তীরে এনে খবর দেন স্থানীয় বাড়াদি বিজিবি ক্যাম্পে। তারপর খবর পায় দামুড়হুদা থানা পুলিশ। রাত ১১টায় মাথাভাঙ্গা নদী থেকে জাকিরের লাশ উদ্ধার করে থানায় নেয় পুলিশ।

মঙ্গলবার সকালে জাকিরের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। তার পরিবার-স্বজন ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিএসএফ তাকে ধরে নির্যাতন চালিয়ে মেরে ফেলে এবং পরে লাশ নদীতে ফেলে দেয়।

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার বারাদী সীমান্তের সীমান্তঘেঁষা গ্রাম কামারপাড়া। রোববার ভোরে এ গ্রামের একদল গরু ব্যবসায়ী সীমান্তবর্তী মাথাভাঙ্গা নদী সাঁতরে ভারতের চাপড়া থানার বিজয়চন্দ্রপুর গ্রামে যায় গরু আনতে। তারা অভিযোগ করেন, গরু নিয়ে ফিরে আসার সময় বিজয়পুর ক্যাম্পের টহলরত বিএসএফ তাদের ওপর হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এ সময় সবাই পালিয়ে আসতে পারলেও নিখোঁজ ছিলেন জাকির। তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ। ভারতে তার ব্যবসায়ী সহযোগীদের কাছে যোগাযোগ করেও কোনো হদিস মিলছিল না। এ অবস্থায় গ্রামবাসী ও স্বজনরা শরণাপন্ন হয় বারাদী ক্যাম্পের বিজিবির কাছে।

বারাদী ক্যাম্পের ইনচার্জ সুবেদার মসলেম উদ্দিন এ ব্যাপারে বিজয়পুর বিএসএফ ক্যাম্পের কমান্ডার পি হ্যারেন্সের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলেন। তবে বিএসএফ বিষয়টি অস্বীকার করে। এরপর সোমবার বিকাল চারটায় সীমান্তের ৮১ নম্বর মেইন পিলারের কাছে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকেও বিএসএফ জাকিরের বিষয়টি অস্বীকার করে।

তবে বৈঠকের ঘণ্টা খানেক পর মাথাভাঙ্গা নদীতে ভেসে ওঠে জাকিরের লাশ।

মাস দশেক আগে কামারপাড়ার পাশের গ্রাম নাস্তিপুরের গরু ব্যবসায়ী আবুকে একইভাবে পিটিয়ে মেরে তার লাশ এই মাথাভাঙ্গা নদীতে ফেলে দিয়েছিল বিএসএফ।

এ ছাড়া গত বুধবার একই সীমান্তে কামারপাড়া গ্রামের গরু ব্যবসায়ী আতিয়ার রহমানকে (৩২) ধরে পিটিয়ে গুরুত্বর জখম করে মুমূর্ষু অবস্থায় মাথাভাঙ্গা নদীর ধারে ফেলে রেখে যায় বিজয়পুর ক্যাম্পের বিএসএফ।






মন্তব্য চালু নেই