মেইন ম্যেনু

বাংলাদেশ-নেপাল বাণিজ্যে প্রধান বাধা ‘ভারত’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে চেষ্টা করছে সরকার। তবে নেপাল-বাংলাদেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের সমস্যা দীর্ঘদিনেও সমাধান হয়নি। এ জন্য মূলত ভারতকে দায়ী করছেন অনেকে। একই সঙ্গে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতাকেও দায়ী করা হচ্ছে। বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যকার বাণিজ্য পিছিয়ে পড়ার পেছনে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়াও অনেকাংশে দায়ী। সীমান্তে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। নেপাল-বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানি-রফতানিতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দেশের রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।খবর জাগো নিউজের।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করে জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষিজাত পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক উপাদান, তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং খাদ্য ও পানীয়সহ প্রকৌশল, প্লাস্টিক ও উৎপাদনশীল পণ্য, ওভেন গার্মেন্টস, হোমটেক্স ও চামড়াজাত পণ্য নেপালে রফতারি করা হয়। এর মধ্যে কৃষিজাত পণ্যই বেশি রফতানি হয়।

অন্যদিক নেপাল থেকে সবজি, যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, কোমল পানীয়, তামাকজাত পণ্য দেশে আমদানি করা হয়।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ নেপালে এক কোটি ৭৮ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রফতানি করেছে। এর বিপরীতে আমদানি করেছে ৯৪ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে নেপালে পণ্য রফতানির পরিমাণ ছিল দুই কোটি সাড়ে ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে আমদানির পরিমাণ ছিল এক কোটি ২০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। অবকাঠামো ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সীমান্ত ও বন্দরকেন্দ্রীক নানা সমস্যার কারণে নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য কমেছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, নেপালে রফতানিতে বড় বাধা হলো অবকাঠামোগত সমস্যা। এর মধ্যে বাংলাদেশের বন্দরগুলো আধুনিক নয়। বাংলাবান্ধা-কাকরভিটা বন্দরে নেই কোনো ধরনের শেড। ফলে সেখানে খোলা আকাশের নিচে পণ্য পরিবহন সংক্রান্ত কাজ সারতে হয়। সেখানে মালামাল লোড-আনলোডের সময় কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। একই সঙ্গে সেখানে আমদানি-রফতানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের থাকার জন্য রেস্টহাউজ কিংবা অফিসিয়াল কার্যসম্পাদনের জন্য আধুনিক কোনো ব্যবস্থা নেই।

পঞ্চগড় শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে সেখানে গিয়ে খোলা আকাশের নিচে নিরাপত্তাহীনতায় কাজ করতে হয়। এতে ব্যবসায়ীক ব্যয় যেমন বাড়ে, পণ্য অপচয়ও হয়। তারা আরও বলেন, ভৌগলিকভাবে নেপাল ভারত ও চীনের সীমান্তঘেরা। তাদের কোনো নৌ-বন্দর নেই। ফলে পণ্য পরিবহনে একমাত্র ভরসা স্থলবন্দর। এক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভর থাকতে হয়।

ভারতের মাত্র ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার করিডরের জন্য ব্যবসায়ীদের মূল সমস্যায় পড়তে হয়। মুক্ত বাণিজ্যের এ সময় ঘণ্টাখানেক দূরত্বের ওই সড়কে পণ্য পরিবহনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।

এছাড়া লোড-আনলোডের সময় পণ্য নষ্ট হচ্ছে। কখনও কখনও সে দেশের (ভারত) কোনো উৎসব বা কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যার কারণে পণ্য পরিবহনে সমস্যা হয়। সে সময় কয়েক দিন পর্যন্ত বা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত পণ্য বন্দরে আটকে থাকে। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হন ব্যবসায়ীরা।

শুধু অবকাঠামোই নয়, রয়েছে শুল্ক সমস্যাও। নেপালে পণ্য রফতানিতে ৩০ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হয়। এ শুল্কের হার কমিয়ে আনলে রফতানি আরও বাড়বে। আর তা দূর করতে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) পুরোপুরি বাস্তবায়ন জরুরি বলে মত দেন ব্যবসায়ীরা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্টি (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাশেম খান এ প্রসঙ্গে বলেন, নেপাল ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে তা ব্যবসায়ীদের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এটা কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে জি টু জি (সরকারি পর্যায়ে) সমাধান করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর মূল সমস্যা শুল্ক বাধা, এটি দূর করতে হবে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও করতে হবে।

বাংলাদেশ-নেপাল ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত অনেক বিষয়ের দৃশ্যমান ফলাফল দেখা যায়নি। তবে আশা করছি, সরকারের উদ্যোগে প্রতিবন্ধকতা দূর হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপালের (বিবিআইএন) মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি না হলে মুক্ত বাণিজ্যের সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের এ যুগে মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে এ ধরনের যোগাযোগের সমস্যা ভাবা যায় না। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে চার দেশের সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

নেপালের বাজারে পণ্য রফতানি করে দেশের এমন একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ-নেপালে পণ্য পরিবহনে বাংলাবান্ধা বন্দরে প্রতি মাসে প্রায় ৫০০টির মতো ট্রাক যাওয়া-আসা করে। বন্দরে যাওয়ার জন্য দুই লেনের রাস্তা রয়েছে। একদিক দিয়ে যায় অন্যদিক দিয়ে আসে। তবে যাওয়া-আসার সময় কোনো একটি ট্রাক বিকল (নষ্ট) হলে তা মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তাই বন্দর এলাকার রাস্তা চার লেন করা উচিত।

একই সঙ্গে বন্দরে সেড, রেস্টহাউজ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বন্দরটি ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গত ৫ বছরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরের পর থেকে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানির পরিমাণ বেশির ভাগ সময় নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। আলোচিত বছরে রফতানির পরিমাণ ছিল চার কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলার, আমদানির পরিমাণ ছিল দুই কোটি ৬১ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ দু’দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছয় কোটি ৭৭ লাখ মার্কিন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ছয় কোটি ১০ লাখ ডলারে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। ওই বছর দু’দেশের বাণিজ্য কমে দাঁড়ায় তিন কোটি ৫২ লাখ ডলারে।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাণিজ্যের পরিমাণ সামান্য বেড়ে তিন কোটি ৭১ লাখ ডলারে দাঁড়ালেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাণিজ্যের পরিমাণ আবারও কমে দাঁড়ায় দুই কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলারে; যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা হলো ট্রানজিট সমস্যা। যদি নির্বিঘ্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেত তাহলে বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে আমদানি-রফতানি আরও বাড়ত। এক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশ যদি কোনও সিদ্ধান্ত নেয় তা কার্যকর হবে না। আর তাই বিবিআইএন কার্যকর করতে হবে। যদিও ভুটান বিবিআইএনের সঙ্গে থাকতে নারাজ। তাহলে দেশটিকে বাদ দিয়ে বাকি তিন দেশ (বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল) মিলে ত্রি-পক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এ ট্রানজিট সমস্যার সমাধান করা উচিত বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ সরকার আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদারের জন্য খুবই আন্তরিক। এ কারণে বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হচ্ছে।

বাংলাবান্ধা বন্দরেরও উন্নয়ন হয়েছে। ফলে আগের চেয়ে দুই (বাংলাদেশ-নেপাল) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনেকটা কমেছে। তবে নির্বিঘ্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলে বাণিজ্য সম্প্রসারণে সুবিধা হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, নির্বিঘ্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনীর্ধারণী পর্যায় থেকে চেষ্টা চালান হচ্ছে।

বাংলাদেশ-নেপালের সঙ্গে ভারতের সড়কপথ দিয়ে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হলে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। বাংলাবান্ধা বন্দর থেকে নেপালের দূরত্ব মাত্র এক ঘণ্টার। কিন্তু এত অল্প দূরত্ব হওয়া সত্ত্বেও দেশটির সঙ্গে স্থলপথে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো যোগাযোগ নেই। কারণ, মাঝখানে ভারতীয় ভূখণ্ড। বাংলাদেশ ও নেপালের মাঝে ভারতের করিডর ব্যবহার করতে না দেয়ায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের সঙ্গে সমঝোতা করে বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যে ট্রানজিট কার্গো পরিবহনের পদ্ধতি নির্ধারণ, কাকরভিটা-পানিট্যাংকি-ফুলবাড়ি বাণিজ্যপথ পুরোপুরি চলু করা, রোহনপুর-সিংবাদ রেলপথ ব্যবহার করে নেপালে পণ্য পরিবহন করাসহ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নেপালের ভিসা আরও সহজ করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি বাংলাদেশের বন্দরগুলো ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো কার্যকর করা সম্ভব হয়, তাহলে এর মাধ্যমে ৯ শতাংশ পর্যন্ত শিপিং খরচ কমাতে পারবে বাংলাদেশ; যা রফতানির মূল্য ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বন্দরের সংস্কার সম্ভব না হলে ব্যক্তিখাত থেকে বিনিয়োগ করারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

তাদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশই বেসরকারি খাতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংসহ পোর্টে অর্থবহ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের কান্ট্রি ডিরেক্টর কিমিয়াও ফ্যান বলেন, বাংলাদেশের বর্ধিত শ্রমশক্তির জন্য নতুন নতুন বাণিজ্যিক ক্ষেত্র বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পোর্টের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

প্রসঙ্গত, ১৯৭৬ সালে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য শুরু হয়। বর্তমানে দু’দেশের মধ্যে ২৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি-রফতানি হয়।






মন্তব্য চালু নেই