মেইন ম্যেনু

থেমে নেই ইলিশ নিধন

ইলিশ প্রজনন মৌসুমের ১১ দিন মাছ ধরা বন্ধের সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চাঁদপুর পদ্মা-মেঘনায় চলছে মাছ নিধনের মহোৎসব। প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বা ম্যানেজ করেই অবাধে ইলিশ ধরছেন জেলেরা।
তবে চলতি বছর জেলা প্রশাসন কঠোর হাতে অভিযান সফলে নেমেছে। ফলে ২/৩ দিন প্রশাসনের টাস্কফোর্সের সঙ্গে জেলেদের সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু চাঁদপুরের সীমানাবর্তী শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসন এদিকে তেমন গুরুত্ব না দেয়ায় সেদিক দিয়ে মাছ পাচারসহ অন্যান্য অব্যবস্থাপনা থেকেই যাচ্ছে। সখিপুর থানা পুলিশের সদস্যদের ম্যানেজ করেই শরীয়তপুর দিয়ে মাছ পাচার হচ্ছে বলে অনেকে জানিয়েছে।
৫ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ দিন ইলিশের বংশ বৃদ্ধির জন্য সারা দেশে ইলিশ মাছ ধরা, পরিবহন, বিপণন, ও মজুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু কে শুনে কার কথা। সরকারের এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চাঁদপুরে থেমে নেই ইলিশ নিধন।
তবে বিশাল নদী পাহারা দেয়ার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়ায় পুলিশ সদস্যদের ম্যানেজ করেই চলছে মাছ নিধন। এ ব্যাপারে চাঁদপুর থেকে যে ১শ কিলোমিটারে মাছ নিধন বন্ধ করা হয়েছে সেখানে নৌ-বাহিনীর ১০/১৫টি জাহাজ টহলের কথা বলেছেন অনেকেই। অভিযানের ১১দিন নৌ-বাহিনীর দ্রুততম জাহাজগুলো টহল দিলে চোরের দল মাছ নিধন করতে সাহস পাবে না বলে জানিয়েছেন তারা। অপরদিকে, পুলিশসহ অন্যান্যরাও অসৎ কাজে অনুৎসাহিত হবে।
এদিকে, অভিযোগ রয়েছে মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও পুলিশকে ম্যানেজ করেই এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী জেলে অবাধে ইলিশ শিকার করছে। অভিযানের নামে আটক মাছ দুঃস্থ ও এতিমদের মধ্যে বণ্টনের কথা বলে পুলিশ ও কোস্টগার্ড সদস্যরাই ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকে জানিয়েছে। অভিযানে অংশ নেয়া অনেক পুলিশ সদস্যই বস্তায় ভরে মাছ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে নৌ-ট্রাফিক ফাঁড়ি পুলিশের সদস্যরা জেলেদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় টোকেন দিয়ে রাতের বেলা মাছ ধরতে সুযোগ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে আলুরবাজার ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ পাওয়া যায়। তারা জেলেদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মাছ ধরতে দিচ্ছে। আবার মাছ ধরার পর কেড়ে নিয়ে নিজেরা তা সংরক্ষণ করছে লবণ দিয়ে।
এ ব্যাপারে আলুরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শরীয়তউল্লা তুহিন অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, এলাকায় কিছু নামধারী নেতার সঙ্গে আঁতাত করিনি বলেই আমাদের বিরুদ্ধে বদনাম রটাচ্ছে।
জেলেদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত চাঁদা উঠানো প্রসঙ্গে তিনি জানান, এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা।
ফাঁড়ি ইনচার্জ শরীয়তউল্লা তুহিনের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগের মোবাইল রেকর্ড শুনালে তিনি ক্ষেপে গিয়ে তাদের গুলি করার হুমকিও দেন। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে জেলেদের আর ছাড় দেবো না। নদীতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গেই গুলি করবো।’
এলাকাবাসী জানায়, ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই শরীয়তউল্লা তুহিনের নেতৃত্বে কনস্টেবল আনোয়ার, হারুন, তাহের, মনিরসহ ফাঁড়িতে থাকা ১৯ জন প্রতিনিয়ত জেলেদের মাছ ছিনিয়ে নিচ্ছে এবং নৌকা আটকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফাঁড়ির পুলিশ লবণ দেয়া মাছ শুধু ব্যারাকে নয়, রান্নাঘরের লাকরির নিচে ছালার বস্তা দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে রেখেছে।
এ বিষয়ে নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির এএসপি (রিভার) রিপন কুমার মোদত বলেন, ‘বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখবো। প্রমাণ পাওয়া গেলে অব্যশই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের ইলিশ সম্পদ রক্ষায় আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের যোগসাজোশে এ ধরনের কাজ অবান্তর।’
আটক মাছ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জেলা টাস্কফোর্সের জিম্মায় হিমাগারে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে এগুলো নিলামে বিক্রি করা হবে।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চাঁদপুর সদর উপজেলার আনন্দ বাজার, গাজির হাট, সফরমালি, পুরাণবাজার এলাকার পুরাণ ফায়ার সার্ভিস, হরিসভা, রণাগোয়াল, দোকানঘর, বহরিয়া, হরিণা ফেরিঘাট, আলুর বাজার, আখনেরহাট ও হাইমচর উপজেলার লামছড়ি থেকে শুরু করে কাটাখালি পর্যন্ত ও শরীয়তপুর জেলার চরাঞ্চলের চেয়ারম্যান বাজার, চররাঙ্গাবালিতে প্রায় অর্ধশতাধিক স্থানে ও আড়তে ইলিশ বেচাকেনা হচ্ছে। তবে কেজির পরিবর্তে হালি দরে ইলিশ বেচাকেনা হচ্ছে।
যদিও গত দু’দিন ধরে র‌্যাব-১১ এর একটি দল, কোস্টগার্ড, মৎস্য বিভাগ ও পুলিশ যৌথভাবে পদ্মা-মেঘনার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। বুধবার হরিণা ফেরিঘাট এলাকায় অভিযানের সময় পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে জেলেদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশ ও কোস্টগার্ড ২৬ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে ১১ জেলেকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দু’বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও ইলিশ নিধন থেমে নেই।
বৃহস্পতিবারেও ১৯ জেলেকে দু’বছর করে কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া প্রায় প্রতিদিনই গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন জেলেকে আটক করে কারাদণ্ড দিচ্ছে প্রশাসন। সোমবারও ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বাধীন একটি দলকে সদর উপজেলার গোবিন্দিয়ায় জেলেরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে ম্যাজিস্ট্রেট রাজীবুল হক খান আহত হন। পুলিশ সেখান থেকে ২ জনসহ ৩১ জনকে আটক করে।
চাঁদপুর কোস্টগার্ডের স্টেশন কমান্ডার সাব লেফেট্যানেন্ট মো. হাসানুর রহমান জানান, মা ইলিশ রক্ষায় কোস্টগার্ডের সদস্যরা সর্বদাই তৎপর। তবে অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা প্রয়োজন। অন্যথায় ইলিশ নিধন বন্ধ করা যাবে না।






মন্তব্য চালু নেই