মেইন ম্যেনু

ঝিনাইদহে মানব পাচারকারীদের লোভনীয় নেটওয়ার্ক

ঝিনাইদহসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে মানব পাচারকারী চক্র বিশাল নেওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বিদেশে ভাগ্য গড়ার লোভনীয় ফাঁদে ফেলে দীর্ঘদিন ধরে তারা গোপনে চালাচ্ছে মানব পাচারের এ জমজমাট ব্যবসা। অথচ রহস্যজনকভাবে নীরব প্রশাসন ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। সহজ সরল যুবকদের ফুসলিয়ে গোপন স্থানে কিংবা ভিন্ন কোনো দেশের জঙ্গলে জিম্মি করে স্বজনদের কাছ থেকে ইসলামী ব্যাংক, এসএ পরিবহন ও বিকাশের মাধ্যমে দালাল চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। দালালদের প্রলোভনে পড়ে কারও প্রিয় সন্তান কিংবা স্বামী রাতের আঁধারে ঘর ছাড়ছে। এদের মধ্যে কারও কারও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। আবার কারও কোনো হদিস মিলছে না। কারও লাশ ফেলে দেয়া হচ্ছে সাগরে। অনেকেই মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন বিদেশের জঙ্গলে অথবা কারাগারে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার শেখরা গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে মিলন হোসেন। সে চলতি বছরের ১৫ আগস্ট শহরে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি ছেড়েছে। স্ত্রী কামিনী খাতুন ও একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে তার। মা রেণু খাতুনের চোখের জল শুকিয়ে গেছে। আবুল হোসেন জানান ঘটনার দিন মাঠে ছিলেন তিনি। বিকেলে বাড়ি ফিরে দেখেন ছেলে ঘরে নেই। রাতে ফোন পান চট্টগ্রাম থেকে। সেদিন ছেলে তাকে বলেছিল আমি পানি পথে মালয়েশিয়া চলে যাচ্ছি। এ ঘটনার আরও কয়েক দিন পরে মিলন তার বাবাকে ফোন করে জানায় থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আটক রাখা হয়েছে তাদের। পাচারকারী চক্রের সদস্যরা ফোন করতে বলে তাকে। এরপর ছেলের প্রাণ রক্ষার জন্য অসহায় বাবা আবুল হোসেন স্থানীয় দালাল বাকীর হোসেনের কাছে দুই লাখ ১৪ হাজার টাকা দিয়ে দেন। একই গ্রামের মসলেম উদ্দিন মণ্ডল। তার ছেলে আলমগীর হোসেন। স্ত্রী আন্না খাতুন ও কোলের মেয়ে জিমের কান্না থামাতে পারছে না। অনেক লোকের ভিড়ে জিম তার বাবাকে খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। শ্বশুর দুলাল জোয়ারদার সংশ্লিষ্ট নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের মেম্বার। তিনি জানান, পাশের সাপখোলা গ্রামের বাকীর হোসেন দালালের কাছে জামাইকে বাঁচানোর জন্য দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা তুলে দেয়া হয়েছে। গত ১৮ আগস্ট ইসলামী ব্যাংক ঝিনাইদহ শাখার মাধ্যমে সেই টাকা পাঠানো হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক টেকনাফ শাখার ৩৮৭১ নম্বর একাউন্টের মালিক জনৈক ইদ্রিস হাজির নামে। একই কাজ করেছেন গ্রামের ঝন্টুর বাবা বৃদ্ধ বাবুর আলী। শেখরার গ্রামের শরিফুল মোল্লা ৬ মাসেও ছেলে তাহারুলের কোনো সন্ধান পাননি। তিনি জানান, পাশের সাপখোলা গ্রামের বাকীর হোসেন ও বাবলু এবং তার ভগ্নিপতি সদর উপজেলার পুটিয়া গ্রামের রাজ্জাক মেম্বার পাচার করে দিয়েছে তার ছেলেকে। কয়েক দিন আগে বাকীর হোসেন তাকে জানিয়েছে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে চুরি করে পানি খাওয়ার অপরাধে তাহারুলকে হত্যা করে লাশ সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছে।অপহরণের অভিযোগে ছেলের শ্বশুরসহ পানামী দালালদের কয়েক জনের নামে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন তিনি। সরেজমিন নিখোঁজ আলমগীর হোসেনের শ্বশুরকে নিয়ে সাপখোলা গ্রামের বাকীর হোসেনের বাড়িতে গেলে সে আগেই বাড়ি থেকে সটকে পড়ে। কথা হয় বাকীর হোসেনের ভাই ঠাণ্ডুর সঙ্গে। সে প্রথমে সাংবাদিক দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বাড়ির মহিলারাও খ্যাপাটে হয়ে ওঠে। ঠাণ্ডুর অসংলগ্ন আচরণ সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়। কথা প্রসঙ্গে ঠাণ্ডু বলে তার চার ভাই থাকে মালয়েশিয়ায়। সেই সূত্র ধরে বিদেশে লোক পাঠানোর জন্য তাদের কাছে অনেকেই আসে। অভিযোগ করা হয়েছে ঠাণ্ডুর চার ভাই বিদেশে অবস্থান করে চুটিয়ে মানব পাচার ব্যবসা করে যাচ্ছে। এলাকার ব্যবসায়ী লাবলু হোসেন নামের এক ব্যক্তি জানান অত্রাঞ্চলে দালাল চক্রের একাধিক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তার দেয়া তথ্য মতে উপজেলার বাগুটিয়া, গোপালপুর, আবাইপুর, কুমড়িদহ, পাঁচপাখিয়া গ্রামের আরও অন্তত ১০০ জন দালালের খপ্পরে পড়ে সবকিছু হারিয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে আরও কমপক্ষে ৫০ জন। অজানা ভয়ে অধিকাংশ নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের স্বজনরা দালালদের নাম পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। অপরদিকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাথপুকুরিয়া গ্রামের সামছুল হকের ছেলে ইদ্রিস আলী পানি পথে বিদেশ যাওয়ার কয়েক দিন পরে মালয়েশিয়া পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। দামুড়হুদার আন্দোল বাড়িয়া গ্রামের মাজেদুল মালয়েশিয়ার মাটিতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছে। তার মরদেহ ১৫ দিন আগে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। হরিণাকুণ্ডুর ভেড়াখালি গ্রামের সিয়ামতের ছেলে শরিফুল ইসলাম, আফছারের ছেলে নেকবর আলীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। একই উপজেলার রিষখালী গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে মিলন জাহাজেই মারা গেছে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন যশোরের শহিদুল, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পুটিয়া গ্রামের রাজ্জাক মেম্বার, ব্যাসপুর গ্রামের ফিরোজ ও ছাগল ব্যবসায়ী খমরেজ এবং নেভি নামের এক নারী, কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল গ্রামের মোঃ মুকুল, হরিণাকুণ্ডু উপজেলার যাদবপুর গ্রামের বজলু মোল্লা, শৈলকুপার বাগমারা গ্রামের আবদুস সালাম মানব পাচার চক্রের স্থানীয় এজেন্ট।ইসলামী ব্যাংক ঝিনাইদহ শাখার এডিপি শেখ আবদুস সালাম টাকা পাঠানোর খবরের সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফ শাখায় একাধিক ব্যক্তির নামে টাকা পাঠানো হয়েছে। তার ভাষায় বিষয়টি অনুমান করার পরে ইদানীং ব্যাংকটি থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংক, কুরিয়ার সার্ভিস, বিশেষ করে এসএ পরিবহন এবং বিকাশের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে পাচারকারী চক্রের কাছে চাহিদামতো টাকা পাঠানো হয়।






মন্তব্য চালু নেই