মেইন ম্যেনু

সাতক্ষীরায় সমবায় সমিতির কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ

কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করে পালিয়ে যাচ্ছে ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন নির্বিকার

‘মাসে দুই হাজার টাকা লাভ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লাভ তো দূরের কথা, আসল নিয়েই উধাও। জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু নিয়ে সর্বশান্ত করে ফেলেছে।’ হাজার হাজার গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া প্রাইম এমসিএস কোম্পানি লিমিটেডের গ্রাহক সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ কুলিয়া গ্রামের আব্দুল আজিজ এভাবেই বলছিলেন নিজের অসহায়ত্বের কথা।
একইভাবে গত ১৩ মে কয়েক হাজার গ্রাহকের অন্তত্ব ২০ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় আরডিপি ইনভেস্টমেন্ট এন্ড ফাইন্যান্স নামের আরেকটি ভুইফোঁড় প্রতিষ্ঠান। তারা আমানত সংগ্রহ করেছিল মাসে দুই হাজার পাঁচশ টাকা লাভ দেওয়ার কথা বলে।
মাসে দুই হাজার পাঁচশ টাকা লাভ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে সাতক্ষীরা ভিশন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও।
ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির নামে উঠেছে গ্রাহকদের সাথে প্রতারণার গুরুত্বর অভিযোগ। জমাকৃত মেয়াদোত্তীর্ণ আমানত দীর্ঘদিনেও ফেরত না দেওয়ায় একজন গ্রাহক ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে উকিল নোটিশও দিয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা?
এভাবেই চলে আসছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। সমবায় সমিতির নামে অবৈধভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করা একটি ভুইঁফোড় প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়, আরেকটি হাজির হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থাকে নির্বিকার।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে এমএলএম বা সমবায় সমিতি বর্ণনাধারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রজ্ঞাপন জারি করে বলে, উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কখনই বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং লেনদেনের অনুরূপ কার্যক্রমের অনুমোদন প্রদান করেনি এবং সেকারণেই তা সম্পূর্ণ বেআইনী।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করে তাদের কার্যক্রমে সহায়তা করেন সয়ং সাতক্ষীরা জেলা সমবায় অফিসার মাসুদা পারভীন।
একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সাতক্ষীরা স্টেশনে কর্মকালীন সময়ে কোটিপতি বনে যাওয়া মাসুদা পারভীনকে গত ১৬ মার্চ সাতক্ষীরা থেকে খুলনায় বদলী করা হয়। বদলী সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের পর দুই মাস অতিবাহিত হলেও তিনি সাতক্ষীরা স্টেশন ছাড়েননি। রয়েছেন বহাল তবিয়তে।
শুধু তাই নয়, মোটা টাকা উৎকোচের বিনিময়ে সম্প্রতি গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া আরডিপি ইনভেস্টমেন্ট এন্ড ফাইন্যান্স নিয়ে দেওয়া দাপ্তরিক প্রতিবেদনে বলেছেন, তাদের দায় প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা, আর পাওনা প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা। কিন্তু আরডিপি গ্রাহকের কাছে টাকা পাবে, এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
সঙ্গত কারণেই মিজানুর রহমান নামে এক গ্রাহক প্রশ্ন করে বলেছেন, যদি আরডিপি গ্রাহকের কাছে কোটি কোটি টাকা পায়, তাহলে অন্যান্য গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেল কেন?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাতক্ষীরা ভিশন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের চারজন গ্রাহক জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে তাদের চারজনের ৫০ লক্ষ টাকা জমা আছে। কিন্তু প্রক্রিয়া অনুযায়ী চেষ্টা চালালেও তারা জমাকৃত টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। তাদের দাবি, সমবায় অফিসের কর্মকতাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেই গ্রাহকদের সাথে প্রতারণা করছে সমবায় সমিতির নামে চলমান ভুঁইফোড় এসব প্রতিষ্ঠান। ঠিক একই কথা বললেন, দেবহাটা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলাম সরদারের স্ত্রী উম্মে সালমা।
তিনি জানান, প্রতি মাসে লাখে দুই হাজার পাঁচশ টাকা লাভ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লাভ তো দূরের কথা, আসলই দিচ্ছে না। আমি অসুস্থ মানুষ, টাকার অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারছি না। এজন্য তিনি সম্প্রতি সাতক্ষীরা ভিশন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের চেয়ারম্যান কাজী ফারুখ হাসানকে উকিল নোটিশও দিয়েছেন।
শুধু সাতক্ষীরা ভিশন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের গ্রাহক উম্মে সালমা নয়, একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে পাওনা টাকা আদায়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রাইম এসসিএস কোম্পানি লিমিটেডের গ্রাহক তালা উপজেলার বারুইহাটি গ্রামের মৃত কোমর উদ্দিনের স্ত্রী নূর নাহার, তার ছেলে ফয়সাল হোসেন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলিপুরের সেকেন্দার সরদারের ছেলে আমির হোসেন, পুরাতন সাতক্ষীরার গোলাম হোসেন, তালার চরগ্রামের নাছরিন, আরডিপি ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্টের গ্রাহক জাহাঙ্গীর আলম, মিজানুর রহমান, রেজাউল হাসান, গাজী ফজলুর রহমানসহ প্রতিষ্ঠান তিনটির হাজার হাজার গ্রাহক। অভিযোগ করেছেন, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের দপ্তরেও। কিন্তু কোন ফল হয়নি।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা সমবায় কর্মকর্তা মাসুদা পারভীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সমবায় সমিতির নামে আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে আরডিপিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিকবার শো’কজ করা হয়েছে। সর্বশেষ আরডিপি হাইকোর্টে রিট করায় আমার এখতিয়ারের বাইরে চলে যায়। আর সাতক্ষীরা ভিশন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি-সম্পাদককে হেয়ারিংয়ে ডাকা হয়েছিল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা তদবির করে আমাকে বদলী করে দিয়েছে। অবশ্য তারা আমাকে আগেই হুমকি দিয়েছিল, আইন দেখালে হয়রানি করবে। পরে তারা আমার বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছে। বিষয়টি আমি সচিব মহোদয় এবং জেলা প্রশাসককে জানিয়ে সহযোগিতা চেয়েছি। এজন্য বদলীর পরও ডিসেম্বর পর্যন্ত স্টেশনে থাকার অনুমতি পেয়েছি। আমি সচিব স্যারকে আগেই জানিয়েছিলাম, তারা খুব প্রভাবশালী এবং আমাকে বদলীর হুমকি দিয়েছে। স্যার বিষয়টি বুঝতে পেরে আমাকে বর্তমান স্টেশনেই থাকতে বলেছে।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, আমরা গত বছরে একটি অভিযোগ পেয়েছিলাম। সে অনুযায়ী আইনী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য স্থানীয় থানা পুলিশকে বলা হয়েছে। এছাড়া সমবায় দপ্তর থেকে তালিকা নিয়ে এই ধরনের ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।






মন্তব্য চালু নেই