মেইন ম্যেনু

আরেকটি মার্চ ফর ডেমোক্রেসি!

বিএনপির আজকের হরতাল গত বছরের সেই মার্চ ফর ডেমোক্রেসির কথাই মনে করিয়ে দিল কি! ২৯ ডিসেম্বর ঢাকা অভিমুখে সেই গণতন্ত্রের অভিযাত্রার স্মরণেই বিএনপি হরতাল দিয়েছে বলে অনেকে বলছেন। কিন্তু এর পরিণতি যে সেই দিনের চেয়েও শোচনীয় হবে তা হয়ত তারা মনে করেননি।

বিএনপির হরতালের সঙ্গে ‘ঢিলেঢালা’ শব্দটা যেন অবাঞ্ছিত অলঙ্কার হয়ে গেছে! গত ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে পর্যন্ত হরতালসহ অন্যান্য কর্মসূচিগুলো সহিংসতার কারণে সমালোচিত হয়েছে। সেসব কর্মসূচির ফলাফল বরং বিএনপির বিপক্ষেই গেছে। এর পরবর্তী কর্মসূচিগুলো একপ্রকার সহিংসতা বিবর্জিত হলেও ‘ঢিলেঢালা’ তকমাটা যেন স্থায়ীভাবে সেঁটে গেছে!

সোমবার সারা দেশে ওই ‘ঢিলেঢালা’ভাবে হরতাল পালন করলো বিএনপি। এবং বরাবরের মতো রাজধানীতে বিএনপি ছিল আরো নির্জীব। মহানগর থেকে দু’একটা মিছিল করে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে হাওয়া হয়ে গেছে। এর আগের হরতালগুলোর চেহারা যেমন ছিল।

৫ জানুয়ারি পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতে বড় যে পরিবর্তন চোখে পড়েছে তা হলো জামায়াতের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা। যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে সমালোচিত হওয়ার কারণেই অবশেষে বিএনপি তাদের এড়িয়ে চলার কারণেই এমন আপাত বিচ্ছিন্নতা বলে মনে করেন অনেকে। তবে, জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বিএনপিকে বর্ম হিসেবে পেতে চায়। বিএনপি না নামলে জামায়াতের আর কেউ রাস্তায় নেমে পিকেটিং করবে না। সোমবারের হরতালেও একই আচরণ করেছে জামায়াত। আর ২০ দলীয় জোটের অন্য শরিকদের তো কোনো খবরই নেই।

জামায়াতের এই অবস্থানের কারণেই যদি বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিগুলো নির্জীব হয়ে গেছে বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে ‘জামায়াত ছাড়া বিএনপির আন্দোলনের মুরদ নেই’ খোদ জামায়াত এবং আওয়ামী লীগের এমন শ্লেষ মিশ্রিত দাবি জোরালো ভিত্তি পায়।

ঠিক এক বছর আগে এই দিনটিতে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ অর্থাৎ গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা নিয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। পাঁচ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন বানচালের টার্গেট নিয়ে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতিও ছিল তৎকালীন ১৮ দলীয় জোটের। তবে এদিন ঢাকার রাজপথে পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে বিএনপি নেতাকর্মীরা দাঁড়াতেই পারেনি।

কর্মসূচিটি ব্যর্থ হওয়ার পেছনে যতোটা না বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা দায়ী তার চেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে সরকার ও সরকারি দল। এমন পর্যবেক্ষণের পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে। কারণ ওই সময় সারা দেশ থেকে বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের ‍তৃণমূল নেতাকর্মীদের ঢাকা আসা ঠেকাতে সরকার দলীয় বাস মালিক-শ্রমিক সংগঠন অবরোধ দিয়ে বসেছিল। সরকারে একজন মন্ত্রী শ্রমিক নেতা বলেই হয়তো এই সুবিধাটা তারা পেয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়েও একজন এমন প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন। তারা ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ ঠেকাতে তাকেও সরকারে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়ার কথা ভাবতে পারে বিএনপি!
একই সঙ্গে সেসময় প্রশাসনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ স্বেচ্ছাসেবক লীগও মাঠে সক্রিয় ছিল। তারচেয়ে বড় ঘটনা হলো কর্মসূচির তিন দিন আগে ২৫ ডিসেম্বর থেকেই খালেদা জিয়াকে তার বাসায় একপ্রকার অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা সত্ত্বেও প্রশাসন পুলিশ পাহারা প্রত্যাহার করতে রাজি হয়নি। সরকারের একজন মন্ত্রী ও অনেক দায়িত্বশীল নেতা ‘এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত’ করার কথা বলে উত্তেজনা না থামা পর্যন্ত তাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। তবে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এ মার্চ ফর ডেমোক্রেসির জমায়েতের অনুমতি ডিএমপি দেয়নি। সেদিন রাজধানীর বিভিন্নস্থানে নেতাকর্মীরা জড়ো হলেও পল্টনের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি।

মার্চ ফর ডেমোক্রেসির বর্ষপূর্তির দিনে হরতাল দেয়া হলেও অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে হরতালের অন্য কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরে ২০ দলীয় জোটের মহাসমাবেশ করার কথা ছিল। সেখানে বক্তব্য দেবেন খালেদা জিয়া এমন পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু তার আগেই লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের বক্তব্যের প্রতিবাদে স্থানীয় ছাত্রলীগ বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়ায় বিএনপির সমাবেশস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। বিএনপি চেয়ারপারসনকে আর কোথাও সভা সমাবেশ করতে দেয়া হবে না আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলনে এমন ইঙ্গিত অবশ্য ছাত্রলীগের কর্মসূচিকে সুস্পষ্টভাবে ‘অজুহাত’ বলেই প্রমাণ করে।
যাইহোক, ২৯ ডিসেম্বরের হরতাল কোনোভাবেই মার্চ ফর ডেমোক্রেসিকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারলো না- এটা বলা যায়। এই হরতাল ৫ জানুয়ারি পরবর্তী বিএনপির হরতালগুলোর মতোই ঢিলেঢালা।

তবে এই ভরা শীতকালে উত্তাপ ছড়ানোর মতো কর্মসূচি এখনো বাকি আছে। আগামী ৫ জানুয়ারি বিএনপির ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ আর আওয়ামী লীগের ‘গণতন্ত্র রক্ষা দিবস’। ১ জানুয়ারি থেকেই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রাজধানী সরগরম হয়ে উঠবে। এদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সরকারের সহযোগী সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসমাবেশ। পরের দিন বিএনপির মহাসমাবেশ। তবে সেটার অনুমতি মিলবে কি না এখনো অনিশ্চিত। আর সবচেয়ে বড় আয়োজনে সমাবেশ করবে আওয়ামী লীগ, সেই ৫ জানুয়ারিতে। তার আগেই কয়েক দিনের হরতালের মুখে পড়তে পারে দেশ। তবে সরকারি দল ও সরকারের যে মারমুখি অবস্থান তাতে সেটাও না আবার ঢিলেঢালাই হয়!



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই