জলমানবের জয়যাত্রা

পানীয় জলের আকালের দিনে ভারতের প্রায় ১০০০ গ্রামে পানি পৌঁছে দেয়ার কষ্টসাধ্য কাজটি একরকম ব্যক্তিউদ্যোগে সমাধা করে দারুণ এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ভারতের জলমানব খ্যাতি পাওয়া রাজেন্দ্র সিং। সুইডেনের স্টকহোমে আয়োজিত এক সংবর্ধনাসভায় তাকে স্টকহোম ওয়াটার প্রাইজ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। স্টকহোম ওয়াটার প্রাইজ পানির নোবেল নামে পরিচিত। এটি পানিবিষয়ক ইতিবাচক অবদানের জন্যে সর্বোচ্চ পুরস্কার।

স্টকহোমের স্বীকৃতিবাক্য: সুইডেনের পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজেন্দ্র সিং যে শুধু ১০০০ গ্রামে পানি পৌঁছে দিয়েছেন তাই নয়, তিনি একাধারে বন্যা প্রতিরোধ, মাটিক্ষয় রোধ, নদীর নাব্যতা রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও দারুণ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন।

বিচারকরা বলেন, রাজেন্দ্রের জলাধার খুব সহজে তৈরি করা যায়। জলসংকট জয় করতে এর মডেল সারাবিশ্বে অনুসরণ করা যেতে পারে। তার উদ্যোগে সংঘটিত এ কাজ এক ধরনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। সকলের মিলিত অংশগ্রহণের ফলে, বিশেষত নারীদের অংশগ্রহণে, এ কাজ সফলভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। এর মাধ্যমে নিরক্ষর মানুষকেও একটি বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। আর দিনের শেষে এ উদ্যোগ তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গেও খাপ খেয়ে গেছে। সুতরাং এটি সর্বোতভাবে প্রশংসনীয় এবং ঐ অঞ্চলের জন্যেই শুধু অনুকরণীয় হয়ে থাকেনি, বিশ্বে ছড়িয়ে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

rajendra-shing-1

যেভাবে রাজেন্দ্র নায়ক হলেন: রাজেন্দ্র সিং প্রাচীন ভূভারতের বহু প্রাচীন একটি সংরক্ষণপদ্ধতি ব্যবহার করে দুর্দিনে মানুষের কাছে পানি পৌঁছে দিয়েছেন। বর্ষার দিনে নদীর বুকেই জল জমিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি মাটি ও পাথরের ছোটো ছোট আধার বানিয়ে। এটা ১৯৮৪ সালের কথা। এ আধারগুলোরও একটি বড় সংগ্রহ দাঁড়িয়ে যায় ক্রমশ। দেখতে দেখতে রাজস্থানের ছোটো বড় নদীতে পৌনে তিন দশকে প্রায় ১০ হাজার বাধ তৈরি করে হয়ে গেল। গ্রীষ্মের সময় এলে যখন নদী তার পানি হারাতে থাকে তখন পূর্বের সংগ্রহ থেকে নাব্যতা রক্ষিত হতে থাকে, পানীয় জলের কাজ চলতে থাকে দিব্যি যা নিয়ে ভারতের মরুএলাকা রাজস্থানে রীতিমতো হাহাকার পড়ে যেত।

রাজেন্দ্র ব্যক্তিগত জীবনে চিকিৎসক ছিলেন। চিকিৎসক হিসেবেই আশির দশকে রাজস্থানে তার আগমন ঘটে। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, এখানকার মানুষের প্রধানতম ভোগান্তিটি শারীরিক অসুস্থতা যতটা, তারচেয়ে বেশি পানীয় ও ব্যবহার্য মিঠা পানির অভাব। গরমকালে কৃষকরা মাটির গভীরে সঞ্চিত পানি কর্ষণ করে কোনো ভাবে কাজ চালিয়ে নেন বটে। কিন্তু রাজস্থান মরু এলাকা, পানিশূন্যতাই স্বাভাবিক। ঐ সামান্য জল ব্যবহারে ফসল বাঁচে না, মরে যায়। নদীতো শুকোয়ই, সঙ্গে হুমকির মুখে পড়ে উপস্থিত জীবজগৎ। মরুবাসীদের তখন শহর থেকে আসা সাহায্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।

rajendra-shing-3

দেখে শুনে রাজেন্দ্র মাটির জলাধার তৈরিতে লেগে পড়েন। শুরু করেন গোপালপুর নামে একটি গ্রাম থেকে। ধীরে ধীরে তার এ উদ্যোগ সবটুকু উদ্দীপনা বজায় রেখে গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় সাতটি নদীর নাব্যতা ফিরে আসে। বর্ষার মৌসুমে যথেষ্ট পানীয় জল ধরে রাখা সম্ভব হয়। রাজেন্দ্র বলেন, এতোদিন আমরা পানীয় জল নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু এখন আমাদের লক্ষ্য আরও বড় কিছু। পানির জন্যে ভবিষ্যত যুদ্ধকে আমরা শান্তিতে পরিণত করবো।

সম্ভাবনার রথ: রাজেন্দ্র সিংএর জলাধার প্রকল্প ব্যবহার করে ব্রিটেনে বন্যা প্রতিরোধ করার একটি উদ্যোগ হাতে নেয়ার সম্ভাবনা জেগে উঠেছে। দেশটির প্রধানতম জল-প্রকৌশলী ক্যাথেরিন পাইগটএর সঙ্গে রাজেন্দ্রের এ নিয়ে আলোচনা চলছে। ব্রিটেনে একটি উন্নত মডেল দাঁড় করানো সম্ভব হলে তা বন্যাদুর্গত নদীমাতৃক দেশগুলোর জন্যেও অনুকরণীয় প্রকল্প হয়ে থাকবে। আর প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহারে সংরক্ষণের উপায় চর্চিত হলে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকবে। বজায় থাকবে স্বাভাবিক জলচক্র। বিশ্ব জুড়ে ক্রমক্ষীয়মানা পানীয় জলও আর দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠবে না।

মূল: রজার হারাবিন (বিবিসি)।



মন্তব্য চালু নেই