লালমনিরহাটে বাল্য বিয়ে বন্ধ করায় চেয়ারম্যান ও জামাত নেতার নির্দেশে শিশু ফোরামের সভাপতিকে মারধর

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর গ্রামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর বাল্য বিয়ের খবর প্রশাসনকে দেয়ায় ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছেন এক সময়ের প্রভাবশালী জামায়াত নেতা ও সানিয়াজান ইউ-পি চেয়ারম্যান এনায়েতুল্ল্যাহ। সোমবার রাত ১০ টার দিকে পুলিশ গিয়ে ওই বিয়েটি ভেঙে দেয়ার পর তাঁর নির্দেশে সেখানকার বাল্য বিয়ে রোধে শিশু ফোরামের সভাপতি সায়েদ আফরেদিকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঘরে আটকে রেখে বেধড়ক মারপিট করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

মুঠোফোনে এমন ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলে ইউ,পি চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা এনায়েতুল্ল্যাহ বেশ দম্ভোক্তির শুরে বলেন, হ্যাঁ আমার নির্দেশে তাকে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও মারধর করা হবে। কিন্তু আপনি তো নিজের ইউনিয়নকে বাল্য বিয়ে মুক্ত ঘোষণা দিয়ে রাস্তায় সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি কোন সদুত্ত্বর না দিয়ে কলটি কেঁটে দেন।

জানা গেছে, সোমবার রাতে এসএসসি পরীক্ষার্থী রানীকে বিয়ে করতে আসে একই উপজেলার পাটিকাপাড়া এলাকার একদল বরযাত্রী। এর আগে খবর পেয়ে দিনের বেলায় একটি বেসরকারি সংস্থার শিশু ফোরামের সদস্যরা মেয়েটির বাবা নজরুল ইসলামকে বুঝিয়ে বলেন যে, বাল্য বিয়ে আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। এছাড়াও সামনে মেয়েটির এসএসসি পরীক্ষা। তাই তাকে বিয়ে না দিতে নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রাত ৯ টার দিকে বরযাত্রী এলে উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করে শিশু ফোরামের সদস্যরা।

পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে রাত ১০ টার দিকে বাল্য বিয়ে ভেঙে দেয় । এতে করে শিশু ফোরামের সেই দলটির উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে মেয়ের বাবা-চাচা আর ইউ-পি চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা এনায়েতুল্ল্যাহসহ ক‘জন মেম্বারও। আর তাই রাত সাড়ে ১০ টার দিকে সেখানকার শিশু ফোরামের সভাপতি ও বড়খাতা সমশেদ আলী কৃষি প্রযুক্তি ইষ্টিটিউট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র সহিদ আরেফিনকে রাস্তা থেকে ধরে এনে ঘরে আটকে বেধড়ক মারপিট করা হয়। প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে ওই ছাত্রের উপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের পর রাত ১২ টার দিকে এলাকাবাসীরা তাকে উদ্ধার করে।

এই অবস্থায় ওই ইউনিয়নের বাল্য বিয়ে রোধে কাজ করা শিশু ফোরামের সদস্যরা চেয়ারম্যানের লোকজনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে সোমবার রাতের ওই ঘটনার পর থেকে বাড়ি ফিরতে পারছেনা দোয়ানী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ শ্রেণীর ছাত্র ও শিশু ফোরামের সদস্য বিজয়।

মঙ্গলবার সকালে সে এ প্রতিবেদকের সামনে কেঁদে কেঁদে বলে, চেয়ারম্যান আর মেয়ের বাড়ির লোকজন তাদের উপর যেভাবে ক্ষেপেঁছে তাতে করে সে রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। পরে শিশু ফোরামের বেসরকারি সংস্থা রুপান্তরের হাতীবান্ধা কার্যালয়ে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছে তাকে । কিন্তু শিশুদের নিয়ে সামাজিক কাজ করতে গিয়ে এমন করে পালিয়ে বেড়াতে হবে তা ভাবতেই ভয়ে আঁতকে উঠে ওই ছাত্রটি। এনিয়ে অবশেষে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় কিনা এমন আশংকা বিজয়ের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ইউনিয়নে গত দেড় বছরে প্রায় অর্ধশত বাল্য বিয়েতে বাঁধা দিয়েছিল বেসরকারি সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সহযোগি সংস্থ রুপান্তরের অধীন গঠিত শিশু ফোরামের সদস্যরা। এতে প্রথমে বিয়ে বন্ধ হলেও পরে গোপনে সিংহভাগ বাল্য বিয়েই সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। আর ওইসব বিয়েতে বাঁধা দেয়া কিংবা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে মুঠোফোনে সহায়তা চাওয়াই অপরাধ হিসেবে দেখছেন সেখানকার ইউ,পি চেয়ারম্যান ও জামায়াতের সাবেক রোকন এনায়েতুল্ল্যাহ।

এই অবস্থায় সেই বাল্য বিয়ের অভিষাপ নিয়ে এখন ঘর সংসার করছে নিজ শেখ সুন্দর গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে ৮ম শ্রেনীর ছাত্রী সুমি আক্তার। এর আগে প্রায় দেড় বছর আগে শিশু ফোরামের সদস্যদের বাঁধার মুখে একই গ্রামের হবিবর রহমানের মেয়ে ৯ম শ্রেনীর ছাত্রী রাবেয়া খাতুনের বিয়ে বন্ধ করেছিল প্রশাসন। কিন্তু পরে মেয়েটিকে রংপুরের বদরগঞ্জে নিয়ে গিয়ে গোপনে বিয়ে দেয়া হয়েছে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে।



মন্তব্য চালু নেই