মেইন ম্যেনু

১৫ বছর নির্বাচনের বাইরে থাকবে জামায়াত!

শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ফাঁসি কার্যকর, রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন স্থগিত, দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লার বিলুপ্তি ও সর্বাত্মক দমনপীড়নে অনেকটা দিশাহারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ অবস্থায় দলটি আপাতত কোনো ধরনের নির্বাচন না করার কৌশল নিতে যাচ্ছে।

দলীয় কর্মসূচিতে আংশিক পরিবর্তন এনে জনকল্যাণমুখী রাজনীতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির কথা ভাবা হচ্ছে। আগামী ১৫ বছরের জন্য রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকাটা অধিক মঙ্গলজনক মনে করছে দলের থিংকট্যাংক। আর এতে জামায়াত আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলেই তাদের ধারণা।

মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধীতাকারী এ দলটি শীর্ষস্থানীয় নেতাদের শাস্তি পরবর্তী নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে। বর্তমান বাস্তবতাও অনুকূল নয়। এ অবস্থায় দলটির অনেক নেতাকর্মী পলাতক বা আত্মগোপনে। জামায়াতের অর্থনীতির মূল নিয়ন্ত্রক ইসলামী ব্যাংকও হাতছাড়া। এ পরিস্থিতিতে জামায়াতের পরিকল্পনা কী?

নির্বাচনমুখী রাজনীতি, না বিশ্বের ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর মতো সেবা ও কল্যাণমুখী ধারায় নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সফলতার দিকে ঝুঁকবে, এমন প্রশ্ন দলের নেতাকর্মীদের। নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

বর্তমান সময়ে দেশে অনেকটা জাতীয় নির্বাচনের আবহ তৈরি হয়েছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগে বেশ নির্বাচনী ব্যস্ততা। বসে নেই দেশের অন্যতম প্রধান দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলও (বিএনপি)। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির সর্বোচ্চ প্রচার তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইতোমধ্যে দলের চেয়ারপারসন দলবিচ্ছিন্ন সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতাদের ডেকে কথা বলছেন। ভেদাভেদ ভুলে নির্বাচনী এলাকায় ও সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

নির্বাচন নিয়ে জামায়াত অবশ্য নিশ্চুপ। অনেকটা গা-ছাড়া ভাব। নাসিক ও কুসিক নির্বাচনে দলটির সঙ্গে বিএনপির কোনো ধরনের সমন্বয়ও ছিল না। বিএনপি দলীয় প্রার্থীর প্রচারে দেখা যায়নি জামায়াতের মধ্যম সারির কোনো নেতাকে। কুসিক নির্বাচনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পর্যায়ে জামায়াতপন্থি কয়েকজন জয়লাভ করলেও তাতে সাংগঠনিক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না।

স্থানীয় পর্যায়ে জনসমর্থন ও প্রভাব-প্রতিপত্তির ওপর ভিত্তি করেই তারা নির্বাচনে অংশ নেন। দলের থিংকট্যাংক হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের অভিমত, আগামী নির্বাচনে জামায়াতকে মাঠে নামতে হবে ঘোষিত বা অঘোষিতভাবে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করেই।

কেননা নিজস্ব দলীয় প্রতীক ও রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি না থাকায় সমমনা কোনো দলের প্রতীকেই নির্বাচন করতে হবে। এ অবস্থায় ধানের শীষ প্রতীকে যদি জামায়াত নির্বাচন করে, তা হবে আদর্শগত পরাজয়। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী ভাঙন ও ক্ষতির মুখে পড়বে দলটি।

জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকও এমনটাই মনে করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, জামায়াত যদি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে, এতে দলের অপেক্ষাকৃত লিবারেল মানসিকতার মানুষদের বিএনপির দিকে ঝোঁকার সম্ভাবনা থাকবে। অন্যদিকে বিএনপির লিবারেল মন-মানসিকতার লোকরা কখনো তুলনামূলকভাবে কঠোর ও শুদ্ধতাবাদী জামায়াতের কর্মনীতিকে গ্রহণ করবে না।

ফলে বিএনপির ক্ষমতামুখী রাজনীতিতে জড়িয়ে যাবে জামায়াত। স্বাতন্ত্র্য চরিত্র হারিয়ে গণহারে ক্ষমতাপন্থি দলের সুবিধাবাদিতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। এ ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষার কোনো কার্যকর উপায় জামায়াতের মেকানিজমে নেই। তাই এ সিদ্ধান্তে ক্ষতি হবে শুধু জামায়াতেরই। দলের অভ্যন্তরীণ এ বিভক্তি সক্রিয় সমর্থক, কর্মী ও নেতা তথা পুরো জনশক্তির মধ্যে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়বে। আদর্শ ও ক্ষমতার সম্ভাব্য এই ঝুঁকিপূর্ণ মেলামেশায় সমাজ পরিবর্তন আর ইসলামি আন্দোলন থেকে অনেকটাই দূরে সরে যাবে।

জামায়াতপন্থি অপর এক সাংবাদিকের অভিমত, বিএনপির প্রতীকের বিকল্প হলো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা। এটিও জামায়াতের জন্য কোনো ভালো অপশন নয়। কারণ এ সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সরকারের দমন-নিপীড়ন চলবে। সাংগঠনিক কোনো ভিত্তি না থাকায় তখন দলটির সমর্থক ভাবধারার মানুষগুলোও এসব নির্যাতন প্রতিরোধে এগিয়ে আসবে না।

যেসব প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেবেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতনের শিকার হতে হবে। অন্যদিকে যেসব আসনে জামায়াতকে বিএনপি ছাড় দেবে, সেগুলোর প্রায় প্রত্যেকটিতেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকবেন। আসলে বিএনপির ভোট জামায়াত পাবে না। এমন পরিস্থিতিতে দলের কৌশল নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত নীতিনির্ধারকরা।

জামায়াতের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ও থিংকট্যাংক হিসেবে পরিচিত প্রায় সবারই মতামত নির্বাচন নয়, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলেই এগোনো উচিত। এতে নিজেদের চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে দাঁড় করানো যাবে। তখন ভোটের রাজনীতির জন্য হলেও বিভিন্ন দল তোয়াজ করবে জামায়াতকে। এতে করেই অর্জন হবে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য।

সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন গঠন ইস্যুতে রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নিতে ব্যাপক আগ্রহ ছিল জামায়াতের। তবে কোনো সাড়া মেলেনি। তাই এ সংলাপের পর তাদের দলীয়ভাবে নির্বাচনের আশা একেবারে মিইয়ে যায়। এরপরই দেশের বাইরে অবস্থানরত নেতাদের কাছ থেকে প্রস্তাবনা আসে আপাতত নির্বাচনী রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার।

সূত্র আরও জানায়, এ প্রস্তাবনায় মত রয়েছে দলটির বর্তমান আমির মকবুল আহমাদেরও। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সক্রিয়ভাবে সরকারের বিরোধিতায় জড়ায়নি দলটি। এর ইঙ্গিত মিলেছে মকবুল আহমাদের শপথগ্রহণপরবর্তী বক্তব্যেও। তিনি বলেছিলেন, দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে ইসলামের নামে যে কোনো ধরনের চরমপন্থা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। আমরা রাজনীতি কিংবা ধর্মের নামে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও নিরীহ মানুষ হত্যা এবং জুলুম-নির্যাতনের অবসান চাই।

এদিকে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনমুখী অংশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে না যাওয়ার বিকল্পও ভেবে রেখেছে জামায়াত। আপাতত ৬০ আসনকে টার্গেট করে তারা জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে। যদিও জোটের কাছে শতাধিক আসন চাইবে দলটি। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের অবগত করেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। কর্মীদের সংগঠিত করে জনগণের কাছাকাছি যাওয়ার পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বিএনপি বা অন্য কোনো দলের প্রতীকে নয়, স্বতন্ত্র হিসেবেই নির্বাচন করবে দলটি।






মন্তব্য চালু নেই