মেইন ম্যেনু

ঘুষই শেষ কথা তার কাছে

পাওয়ার আগেই দিতে হয় মোটা অঙ্কের উৎকোচ। তবে টাকা দিলেই যে কাজ পাওয়া যাবে, তাও নয়। টাকার অঙ্কে যিনি এগিয়ে থাকবেন, সেই ঠিকাদারই পাবেন কাজ।

পাবনার বেড়া উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে উঠেছে নানা অভিযোগ। এগুলো মধ্যে নদী পুনঃখনন কাজে অনিয়ম, অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে স্বেচ্ছাচারিতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায়ও অনিয়মের অভিযোগও আছে। নানা তরফ থেকে অভিযোগ পেয়ে এগুলো খতিয়ে দেখছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। অভিযোগ গেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদকে)।

সম্প্রতি পাবনার বেড়া উপজেলায় পাউবোর কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে ঠিকাদারদের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। তদন্ত কমিটি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়েছে। উঠে এসেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নানা অনিয়মের চিত্র।

অভিযোগ রয়েছে, নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ব্যবহার করছেন তিনি। বোর্ডের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক দুজনই কবিবুরের প্রতি সদয়, এমন কথাও বলে বেড়ান তিনি। আর এই সুবাদে কেউ তার ক্ষতি করতে পারবে না বলে কাছের মানুষকে একাধিকবার বলেছেন কবিবুর রহমান।

জানতে চাইলে কবিবুর রহমান বলেন, ‘এগুলো অপপ্রচার। পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ নিজেও বিষয়গুলো জানেন। তিনি আমাকে বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কে কী বলল সেদিকে না দেখে আমাকে কাজ করে যেতে বলেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, অবৈধভাবে সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে কেউ কেউ এগুলো বলে বেড়াচ্ছেন।’ পানি উন্নয়ন বোর্ড পাবনা বেড়ার এই নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘তদন্তে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তাদের ব্যাপারে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তদন্ত কমিটির কাছে এখন তারা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা না করে উল্টো আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে।’

ঘুষের অঙ্ক যত বেশি, কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি

পাবনার বেড়া উপজেলার পাউবো সূত্র জানায়, প্রতিটি দরপত্রের আগে কাজ দেওয়ার নামে কবিবুর রহমান সব ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নেন। কিন্তু সবাই কাজ পান না। এর মধ্যে যিনি সব চেয়ে বেশি ঘুষ দিতে পারেন তিনিই কাজ পান। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষ বাসা বেঁধেছে। এ ছাড়া স্থানীয় ঠিকাদারদের ডিপিএমের মাধ্যমে বিল করে অর্থ লোপাটের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। গত অর্থবছরের শেষ দিকে (মে-জুন) পানি উন্নয়ন বোর্ড লাগোয়া করমজা, সানিলা ও দত্তকান্দি এলাকার ঠিকাদারদের নিয়ে ডিপিএমের মাধ্যমে কাজ ভাগ করে দেন। এতে কিছু ঠিকাদার কাজ পান। বাকিরা বঞ্চিত হন। এ নিয়ে বঞ্চিতদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বিশৃঙ্খলাও ঘটে সময়ে সময়ে।

বেড়ার পাউবোর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, কবিবুর তার অধীন তিনজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলীকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করান। এসব কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলীর অনিয়ম ও দুর্নীতির সাক্ষী। তারা কবিবুরের অনৈতিক আদেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কবিবুর বলেন, ‘এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন আমি কাউকে অনৈতিকভাবে কোনো কাজের নির্দেশ দিইনি।’

বাধাই নদী পুনঃখননে দুর্নীতি

বাধাই নদী পুনঃখননকাজে অনিয়মের অভিযোগ আছে কবিবুরের বিরুদ্ধে। সূত্র জানায়, পুরো কাজকে চারটি লটে ভাগ করে দেন তিনি। প্রতিটি লটে দুই কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করেন। এসব কাজের জন্য তিনি প্রতিটি ঠিকাদারপক্ষের কাছ থেকে উৎকোচ হিসেবে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা নেন। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তোফায়েল আহম্মেদকে প্রধান করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এই টাস্কফোর্স বিভিন্ন প্রকল্পের প্রি-ওয়ার্ক ও পোস্ট-ওয়ার্ক যাচাই করে অনিয়মের প্রমাণ পায়। পরে প্রতিটি লটে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, ‘কাজ করার আগে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছিলেন কাজ শেষ না করেই বিল পাইয়ে দেবেন। কিন্তু টাস্কফোর্সের তদন্তের পর আমরা বুঝতে পারি কাজ না করে তো দূরে থাক, কাজ করেও চুক্তি মোতাবেক সব বিল পাওয়া যাবে না। এ ঘটনায় ঠিকাদাররা কবিবুরের ওপর ক্ষিপ্ত হন। একপর্যায়ে ঘুষের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কবিবুর বলেন, ‘ঠিকাদাররা যতটুকু কাজ করেছে ততটুকুই তো বিল পাবে। কাজ না করে বিল চাইলে কি আর তা দেওয়া যাবে? যারা অভিযোগ করেছিলেন তারা কাজ না করেই বিল চেয়েছিলেন। কিন্তু পাননি বিধায় মিথ্যা বলে বেড়াচ্ছেন।’

সেচ খালের পাড়ে ঘাট নির্মাণে দুর্নীতি

বেড়ার পৌর এলাকার মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান সেচ খালসহ খালের পাড়ে পুরনো ঘাট পুনর্নির্মাণ, মেরামত এবং নতুন ঘাট নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় ঠিকাদার আমিরুল ইসলাম (আকু) এবং তার সহযোগী অন্য ১০ থেকে ১২ জন ঠিকাদারদের দিয়ে কাজটি করান কবিবুর রহমান। কিন্তু ঠিকাদারদের অভিযোগ, এই কাজের পর অনেক সময় পার হয়ে গেলেও বিল পাচ্ছেন না তারা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের অক্টোবর মাসে নির্বাহী প্রকৌশলী ঠিকাদার আকুকে মুঠোফোনে কল করে দুই লাখ টাকা নিয়ে আসতে বলেন। ঠিকাদাররা সেই টাকা কবিবুর রহমানের কাছে ঢাকায় পৌঁছে দেন। পরে ঘাট পুনর্নির্মাণের বিপরীতে বরাদ্দ এলেও ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ না করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে বরাদ্দের অর্ধেক টাকা চেয়ে বসেন। ঠিকাদাররা টাকা দিতে অস্বীকার করলে প্রকৌশলীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে যখন ঠিকাদারদের সঙ্গে কবিবুর রহমান পেরে উঠছিলেন না, তখন পাবনার বেড়া পৌরসভার মেয়র আব্দুল বাতেনের সহযোগিতা চান। তিনি বাতেনকে মুঠোফোনে বলেন, ‘বাদাই নদী প্রকল্পের ঠিকাদারদের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম। কিন্তু কোনো এক কর্মকর্তার অভিযোগের কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের টাস্কফোর্স গঠন করে দেয়। যে কারণে আমি ঠিকাদারদের বিশেষ কোনো সুবিধা দিতে পারছি না। ঠিকাদারদের প্রতিনিধিরা আমার কাছে এখন টাকা ফেরত দিতে চাপ দিচ্ছে। আমি তো এরই মধ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট কিনে টাকাটা খরচ করে ফেলেছি। এখন টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। আমি বেঁচে থাকলে পরবর্তী কাজের মাধ্যমে টাকা ফেরত দেব। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজি এবং এডিজি দুজন আমাদের প্রতি খুবই সদয় আছে। তারা আমাকে সাহায্য করবেন। তাই আমাকে বদলি করার ক্ষমতা কারো নেই। আপনি ঠিকাদারদের সঙ্গে আমার দ্বন্দ্ব মিটিয়ে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য কিছু সময় নিয়ে দিন।’

জানতে চাইলে আব্দুল বাতেন বলেন, ‘ঠিকাদারদের সঙ্গে জটিলতা ও সমস্যা সমাধানের জন্য গত ১৪ মে নির্বাহী প্রকৌশলী আমাকে নির্দেশ দেন। বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় আমি তার প্রস্তাবে রাজি হইনি। পরে তিনি বারবার আমাকে অনুরোধ করায় ওই দিন সন্ধ্যায় নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে যাই। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সীমার কুমার ভট্টাচার্য, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবুল হাশেমকে দেখি। আমি শুরুতেই ঠিকাদার আমিনুল ইসলামের কাজের বিল সম্পর্কে জানতে চাই। জবাবে আবুল হাশেম জানান, ঘাট নির্মাণে কোনো কার্যাদেশ বা বিল দেওয়া যাবে না। কারণ এখন পর্যন্ত নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র চাওয়া হয়নি। এই বিল দিলে তাদের চাকরির ক্ষতি হবে বলে জানান।’

বাতেন বলেন, ‘পরে আমি নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলি যদি বিল দিতেই না পারবেন কেন ঠিকাদারদের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নিলেন? কেন তাদের ব্যাংক থেকে দরপত্র শিডিউল কেনালেন? যদি বিল দিলে চাকরির সমস্যা হয় তা হলে ঘাটের বিলগুলো পৌরসভায় পাঠিয়ে দিন, আমি নিয়ম মেনে বিলগুলো দিয়ে দেব।’

বৈঠক সূত্র জানায়, পৌর মেয়রের এমন কথার পর নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘বিলের অর্ধেক টাকা দিলে কালই বিল দেওয়ার ব্যবস্থা করব।’ তখন আব্দুল বাতেন বলেন, ‘ঘুষ দিলে চাকরি থাকে, আর না দিয়ে চাকরি থাকে না- এমন কথা বললে তো ঠিকাদাররা উত্তেজিত হবেই।’ পরে এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। ঘটনা তদন্তে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি তদন্ত কমিটিও করেছে।

ঢাকার মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘আমি মোহাম্মদপুরে ভাড়া বাসায় থাকি। ফ্ল্যাট কিনলাম কবে?’

নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনে ভাড়া!

স্থানীয় সূত্র জানায়, পাবনায় নির্বাহী প্রকৌশলীর নিজস্ব বাসভবনে র‌্যাবের কর্মকর্তারা ভাড়া থাকেন। তিনি নিয়মিত কর্মস্থলেও যান না বলে অভিযোগ আছে। বেশির ভাগ সময় তিনি ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। কর্মস্থলে অধীনস্থদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও আছে কবিবুর রহমানে বিরুদ্ধে। তিনি বেড়ার পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সমীর কুমার ভট্টাচার্যকে সেখান থেকে ক্ষমতার জোরে বদলি করেছেন বলেও জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কবিবুর বলেন, ‘বাসা থাকলে তো ভাড়া দিতেই হবে। আর সেটা করেছি সরকারি নিয়ম মেনেই। এখানে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে সব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে এটা করা হয়েছে।’

-এই সময়ের জন্য






মন্তব্য চালু নেই