মেইন ম্যেনু

না.গঞ্জে সাত খুন

গ্রিন সিগন্যাল পেলেই গডফাদারদের জিজ্ঞাসাবাদ

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় দুই কর্মকর্তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালকসহ রাজনৈতিক গডফাদারের নাম প্রকাশ করায় বিপাকে পড়েছে পুলিশ।
এছাড়া চাঞ্চল্যকর ওই হত্যা মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপ করে তাকে ভারতে পালাতে সহায়তা করায় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, আদালতে র‌্যাবের অবসরপ্রাপ্ত দুই কর্মকর্তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়ার বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে পুলিশ। জবানবন্দি ও রিমান্ডে থাকার সময়ে পুলিশকে দেয়া তথ্য নিয়ে তদন্ত কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

সূত্রমতে, সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেলে প্রয়োজনে রাঘব বোয়ালদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।

আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত র‌্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা মেজর আরিফ হোসেন ও এসএম রানা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও তদন্তকারী সংস্থা অপেক্ষা করছে র‌্যাব-১১ এর তৎকালীন অধিনায়ক (সিও) তারেক সাঈদের জন্য। তারেক সাঈদ জবানবন্দি দিলেই বদলে যাবে আলোচিত এ মামলার তদন্ত কাজ। তবে এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে র‌্যাবের চাকরিচ্যুত তিনজন ও শীর্ষ এক কর্মকর্তা জড়িত থাকলেও এর পেছনে ছিলেন একজন রাজনৈতিক গডফাদার ও তার ছেলে।

প্রসঙ্গত, এর আগে বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম বলে আসছিলেন, সাত খুনের সঙ্গে সরকারের ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও তার ছেলে দিপু চৌধুরী জড়িত। এজন্য মায়ার পদত্যাগও চেয়েছিলেন তারা। এছাড়া র‌্যাবের অতিরিক্তি মহাপরিচালক (অপারেশন) জিয়াউল আহসানকেও দোষারোপ করা হয়।

সর্বশেষ গত ৫ জুন এসএম রানার জবানবন্দির পরেও অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন জোর দিয়ে বলেছিলেন এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে একজন রাজনৈতিক গডফাদার জড়িত।

এছাড়া সাত খুনের ঘটনার জন্য এমপি শামীম ওসমানকেও অভিযুক্ত করা হয়। সাত হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের সঙ্গে এমপি শামীম ওসমানের কথোপকথনের অভিও রেকর্ড প্রকাশের পর অভিযোগ ওঠে শামীম ওসমান নূর হোসেনকে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন। এ কারণে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করারও বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হয়।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানান, সাত খুনের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে প্রতিটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেয়া হবে। তদন্তের স্বার্থে যে কাউকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, জবানবন্দিতে রানা ও আরিফ স্বীকার করেছেন যে, র‌্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে ও কতিপয় রাজনৈতিক গডফাদারের সমন্বয়ে এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। রানা তাদের বিস্তারিত পরিচয়ও প্রকাশ করেছে। যা এখনই প্রকাশ করা যৌক্তিক হবে না।

আদালতে রানা জানিয়েছেন, নূর হোসেনের সঙ্গে তার তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। কারণ সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাটি র‌্যাব-১১ এর স্পেশাল ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানির আওতায় ছিল না। এ কারণে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে অবস্থিত র‌্যাব-১১ এর প্রধান কার্যালয়ের আরিফের সঙ্গে ছিল নূর হোসেনের ভালো সম্পর্ক। আরিফের সঙ্গেই কয়েকবার নূর হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন তিনি। সেই সুবাধে তার সঙ্গে পরিচয় ছিল বটে, তবে সেটা দৃঢ় ছিল না। এর মধ্যে মেজর আরিফ নিজেই তাকে ফোন করে নজরুলকে অপহরণের বিষয়টি জানান। প্রথমে রানা কিছুটা আপত্তি করতে চাইলেও র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদের নির্দেশে সংযত হন। এর মধ্যে র‌্যাবের তৎকালীন উপ- মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসানও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন বলে রানাকে নিশ্চিত করেন আরিফ। পরিকল্পনা মোতাবেক রানার ওপর দায়িত্ব পড়ে নজরুলকে অপহরণের।

গত ২৭ এপ্রিল ওই পরিকল্পনা মোতাবেক নারায়ণগঞ্জ আদালতে সাদা পোশাকের লোকজন পাঠায় রানা। কিন্তু সেখানে নজরুলকে ফলো করতে গিয়ে ওই সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিকে কোর্ট পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এ কারণে রানা কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। পরে রানা ও আরিফ হোসেন মিলে ফতুল্লা স্টেডিয়ামের সামনে নজরুলকে বহন করা গাড়ি আটকে তাদের জোর করে নামিয়ে র‌্যাবের গাড়িতে তোলে। ওই সময়ে চন্দন সরকারের গাড়িটি ছিল ঠিক পেছনে। তিনি মোবাইলে দৃশ্যটি ধারণ করার সময়ে গাড়ি থেকে নেমে রানা বাধা দেন। তখন তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়।

এক পর্যায়ে চন্দন সরকারের মোবাইল হাতে নিয়ে ভিডিও রেকর্ড মুছে ফেলার চেষ্টা করেন রানা। ওই সময়ে বিষয়টি তারেক সাঈদকে ফোন করে জানান রানা। বলেন, ‘একজন ল ইয়ার ঝামেলা করছে।’ উত্তরে তারেক সাঈদ বলেন, ‘তাকেও পিকআপ করো।’ এ বক্তব্যের পরেই সাতজনকে গাড়িতে তুলে নেয় র‌্যাবের টিমটি।

রানা আদালতে আরো জানান, দুটি গাড়ি থেকে সাতজনকে র‌্যাবের দুটি গাড়িতে তুলে নেয়া হয় অস্ত্র দেখিয়ে। গাড়িতে ওঠানোর পর তাদের প্রথমে অচেতন হওয়ার স্প্রে করা হয় যাতে তাৎক্ষণিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। জ্ঞান হারানোর পর সাতজনকে বহন করা গাড়ি র‌্যাবের সাদা পোশাকের লোকজন নিয়ে যায় অন্য গন্তব্যে। পথিমধ্যে তাদের শরীরে আবারো অচেতন হওয়ার ইনজেকশন পুশ করা হয়।

রানা আদালতকে বলেন, মূলত আমার দায়িত্ব ছিল নজরুলকে অপহরণ করা। আমি সেটাই করেছি। কিন্তু পরে তারেক সাঈদ আমাকে নির্দেশ দেয় পুরো মিশনে থাকতে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি আমি জানি এবং প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু তাতে আমার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না।

উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে একসঙ্গে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজন অপহৃত হন। গত ৩০ এপ্রিল বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে আরেকজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় র‌্যাব-১১ এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের পরিবারের সদস্যরা।
নজরুল ইসলামের শ্বশুর অভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন নূর হোসেন। এ অভিযোগের পর গত ৬ মে র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, সাবেক অধিনায়ক মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ১৭ মে রাতে ঢাকার সেনানিবাস থেকে মিলিটারি পুলিশ ও ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ এবং নৌ বাহিনীর গোয়েন্দারা এমএম রানাকে আটক করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের কাছে তুলে দেয়।






মন্তব্য চালু নেই