মেইন ম্যেনু

কেন একটি জামদানী শাড়ী কিনবেন ? জামদানী কিনে কেউ কোনোদিন ঠকে না

আমি আপনাকে একটা জামদানী শাড়ি কেনার জন্য অনুরোধ করছি – আপনার মা, মেয়ে কিংবা প্রিয়তমার জন্য। এটা মৃত্যু পথযাত্রী এক শিল্প। এভাবে চলতে থাকলে জামদানী শাড়ি নাও থাকতে পারে বিশ বছর পর।

আমাদের বাঙালির তৈরী কয়েকটা মাত্র মাস প্রোডিউসড জিনিস আমাকে বিস্মিত করে। জামদানি আমাকে বিস্মিত করে এর ভার্সেটায়েলিটি, সফিসটিকেশান আর সাবলাইম বিউটির জন্য। একটা সুন্দর জামদানী শাড়ি একটা পিস অফ আর্ট। আমার আশংকা এই বিশেষ ধরনের শাড়িটি খুব বেশীদিন টিকবে না।

কেন?

যেকোনো তাঁতীকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন তারা এই একই আশংকার কথা বলছে কি না? প্রথমেই বলে নি যে জামদানির উইভিং বা বুনট মেশিনে করা সম্ভব না। ভারতে করাও হয় মেশিনে। একটা ভয়াবহ কুৎসিত জিনিস তৈরী হয়। কিছু কিছু জিনিস হাতের ছোয়া ছাড়া তৈরী করা সম্ভব না। ইন ফ্যাক্ট অল দ্যা বেস্ট থিংস আর মেড বাই হ্যান্ড। জামদানীর মতো অনবদ্য শিল্প তাঁতীর হাত দিয়েই শুধু বের হওয়া সম্ভব, আর কোনো ভাবেই নয়।

jamdani

কী রকম খরচ হয় একটা জামদানীর জন্য। কাঁচামাল কটন সুতা এমন কোনো দামী জিনিস না। সেটার কথা আপাতত বাদ দিই। আমি একদম ক্রেম ডে লা ক্রেম – মানে ধরা যাক প্রধানমন্ত্রী নিশা দেশাইকে যে জামদানীটি উপহার দেবেন সেই শাড়িটার কথা বলছি। দু’জন তাঁতী দিনে ৮ থেকে ১২ ঘন্টা খাটবে – এর মধ্যে একজন হয়তো এপ্রেন্টিস আরেকজন এক্সপার্ট তাঁতী থাকবে। কতোদিন লাগবে ধারণা আছে আপনার? ৬ থেকে ৮ মাস। জ্বী ঠিক শুনছেন ৬ থেকে ৮ মাস দুজন আর্টিস্টের ফুল টাইম (আসলে তিনজনের – ওয়েস্টের ফুল টাইম ধরে বিচার করলে) শ্রমের শাড়িটার জন্য তাঁতী পাবে দেড় লক্ষ টাকার কাছাকাছি। যে শাড়ির জন্য তাঁতী পায় ৩০ থেকে ৫০ হাজার তার জন্য দু জনের সময় লাগে মোটামুটি তিন মাস (শাড়ির দাম বাড়ে উইভিংএর ডেনসিটি এবং ডিজাইনের জটিলতার জন্য। আপনাকে এক্সপার্ট হতে হবে না – ৫টা জামদানী হাতে ধরে ফিল করলেই বুঝবেন আমি কী বলছি)।

এইরকম শোষণ পৃথিবীতে কমই আছে। কেন বলি,

পানামা হ্যাটের কথা অনেকেই শুনেছেন নিশ্চই। মোটামুটি ভালো একটা হ্যাট আপনি দুশ থেকে পাঁচ শ ডলারের মধ্যে কিনতে পারবেন। বানানো হয় মূলত একোয়েডোরে। কাঁচামাল এক ধরনের গাছের বাকল থেকে তৈরী স্ট্র যা খুব একটা দামী না। জামদানীর মতোই এর দাম নির্ধারণ হয় তাঁতীর সময়ের জন্য।

একদম বেস্ট কোয়ালিটির পানামা হ্যাটের কথা বলি। এই হ্যাটকে বলে সুপারফিনো মনটিক্রিস্টো। সুপারফিনো কারণ এর একটা নির্দিষ্ট গ্রেডেশান আছে যেটা আমাদের জামদানীর নেই (কিন্তু অনায়াসেই করা যায়)। তা সুপারফিনোর গ্রেডেশান হয় কীভাবে? আপনি যখন উইভ করবেন তখন এক ইঞ্চের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ এমন কি ৬০ টি পর্যন্ত বুনট থাকবে। তার মানে এক বর্গ ইঞ্চে সর্বমোট ১৬০০ থেকে ২৫০০ বুনট থাকবে। এলাহী কারবার – বুঝতেই পারছেন – সুপারফিনোর বুনট এতোই সূক্ষ ও জমাট যে দেখলে মনে হবে এটা কাপড়, স্ট্র এর তৈরী না । এই উইভিংপুরোটাই হাতে করতে হয়। কাজটা করতে এতোই উচু পর্যায়ের স্কিল দরকার যে পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকজন উইভারই শুধু সুপারফিনো মনটিক্রিস্টো তৈরী করতে পারে। সময় লাগবে ৩ থেকে ৪ মাস। বোঝাই যাচ্ছে এই হ্যাটটা দামী। কতো দাম হতে পারে কল্পনা করুন তো?

২৫ হাজার ডলার। হ্যা ঠিকই শুনেছেন। একজন উইভারের ৪ মাসের কাজের ফলাফল সুপারফিনো মনটিক্রিস্টোর দাম ২৫ হাজার ডলার (উইভার পায় ৬ থেকে ১০ হাজার ডলার) আর দুইজন উইভারের ৮ মাসের কাজের ফলাফল আলা জামদানীর দাম ২ থেকে ৩ হাজার ডলার।

sujan_mondal_2014_09_01_001_17

বলাই বাহুল্য তাঁতীরা সংখ্যায় লোপ পাচ্ছেন, খুব দ্রুত লোপ পাচ্ছেন। কারণ একটা ডিসেন্ট জামদানীর দাম হওয়া উচিত এক লাখ টাকা কিন্তু আপনি কিনছেন তিরিশ হাজার টাকায়। স্বভাবতই তাঁতীরা তাদের ছেলেদের এই পেশায় আনছেন না। পাগলে না কামড়ালে আনার কথাও না। একবার নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন তো জামদানী যদি বাংলাদেশে তৈরী না হয়ে ইন্ডিয়ায় তৈরী হতো শুধু আপনি কি এই মানের শাড়ি এক লাখ টাকায় কিনে বলতেন না যে দাও মারলাম ভাই দারুণ একটা।

হ্যা ঠিকই বলছি আমি। জামদানীর সবচেয়ে বড় সমস্যা – এটা বাংলাদেশে তৈরী। এরকম আর্ট ইন্ডিয়ায় তৈরী হলেই কেবল আপনি এর মর্ম বুঝতেন। আপনি যদি চান যে আপনার মেয়েটিও বড় হয়ে জামদানীর সৌন্দর্যের তরফদার হবে তাহলে আজকেই একটা জামদানী কিনুন, সম্ভব হলে কোনো একজন উইভার থেকে। সে যে দামটি চায় সে দামেই কিনুন। বিশ্বাস করুন আপনি ঠকবেন না।

জামদানী কিনে কেউ কোনোদিন ঠকে না।






মন্তব্য চালু নেই