রাজশাহী বিভাগে বুধবার হরতাল

সহিংস জামায়াত-শিবির

রাজশাহী অঞ্চলে সহিংস হয়ে উঠেছে জামায়াত-শিবির। অবরোধে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে ধারাবাহিকভাবে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে উগ্রবাদি এ সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। আর এ সহিংসতা মূলত তাদেরই নেতৃত্বে সংঘটিত হচ্ছে।

৫ জানুয়ারি থেকে এ অঞ্চলে সহিংসতায় মারা গেছেন ৪ জন, পেট্রোল বোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন অন্তত ২০ জন। এদের মধ্যে নারী ও শিশুসহ ১৫ জন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহতদের একজনের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হলে তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।

এ ছাড়া ঘটনা ঘটেছে গাড়িবহরে পেট্রোল বোমা হামলা। অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে অর্ধশতাধিক বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে। মন্ত্রী ও সাংসদের জনসভায় ঘটানো হয়েছে হাতবোমার বিস্ফোরণ। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের কার্যালয়।

তবে অবরোধে সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। অবরোধে নাশকতা ঠেকাতে গিয়ে তারা হামলার শিকার হন। এর মধ্যে পুলিশের ওপর হামলা করে অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও আছে।

এ পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ১০টি। এ সব হামলার বেশিরভাগই ঘটেছে পুঠিয়া ও নগরীর বাইপাস সড়কের সংযোগস্থলে। পরে পুলিশ প্রশাসন নাশকতা ঠেকাতে বাধ্য হয়ে বাইপাস সড়কটি বন্ধ করে দেয়।

শুক্রবার তানোর উপজেলা সদরের ব্র্যাক মোড়ে যাত্রীবাহী বাসে ভয়াবহ পেট্রোল বোমা হামলা চালায় জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা। এ ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ১৫ যাত্রী মারাত্মকভাবে আহত হন। আহতরা বর্তমানে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এদের মধ্যে এক শিশু ও নারীসহ তিনজনের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।

একই দিন বিকেলে পবা উপজেলার তেঘর এলাকায় যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা হামলা চালায় শিবির-ছাত্রদলের ক্যাডাররা। এ সময় বাসটিতে পেট্রোল ঢেলে দেওয়া হয়। এর ফলে বাসটি সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়। এক পর্যায়ে বাসের যাত্রীরা ধাওয়া দিয়ে শিবির ক্যাডার মশিউর ও ছাত্রদল নেতা আউয়ালকে ধরে গণধোলাই দেন। মশিউর ও আউয়াল রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকায় পুলিশ-বিজিবি পাহারায় নিয়ে যাওয়া গাড়ি বহরে বোমা হামলা চালায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৫টি যানবাহন। এ সময় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ২০টি শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এর মধ্যে ১০ থেকে ১২টি বোমা ছোঁড়া হয় গাড়ি বহরের বিভিন্ন ট্রাকে।

এ সময় মুখোশধারী শিবির ক্যাডারদের স্থানীয় জনতা ধাওয়া দিলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ঘটনাস্থল ত্যাগের সময় শিবির ক্যাডাররা দুটি শক্তিশালী হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় মাসেম ও কাজেম নামের দুই সহোদর আহত হন। তারা রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

অন্যদিকে একই সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় গাড়িবহর লক্ষ্য করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা একটি পেট্রোল বোমাসহ কয়েকটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়।

২১ জানুয়ারি নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় আসা গাড়ি বহরে পেট্রোল বোমা হামলা চালায় শিবির ক্যাডাররা। তবে বোমাটি বিস্ফোরিত না হওয়ায় কোনো ক্ষতি হয়নি।

এর আগে ২০ জানুয়ারি নগরীর রেশম ভবন সংলগ্ন এলাকায় ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। পেট্রোল বোমায় একজন নারীসহ তিনজন দগ্ধ হন। আহত নারীর নাম আম্বিয়া বেগম (৪৫)। তাকে প্রথমে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।raj1-1422282206

১৯ জানুয়ারি নগরীর কাপাসিয়া এলাকায় তুষবাহী ট্রাকে আগুন দেয় হরতাল সমর্থকরা। ১৬ জানুয়ারি রাজশাহীর তানোরে যাত্রীবাহী বাসে বোমা হামলা চালায় অবরোধকারীরা। এ ঘটনায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

১৫ জানুয়ারি রাজশাহীর চারঘাট পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সাংসদ গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট চলাকালীন মাঠের মধ্যে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। তবে সেটা বিস্ফোরিত হয়নি। সেসময় মাঠে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সাংসদ শাহরিয়ার আলম।

১৪ জানুয়ারি নগরভবন এলাকা থেকে বিএনপি কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল হামলা চালায়। এ ছাড়া মনি চত্বর এলাকায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করার চেষ্টা করে বিএনপি কর্মীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পুলিশকে লক্ষ্য করে দুটি ককটেল নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায় তারা। তবে এ ঘটনায় কেউ আহত হয়নি।

গত ১৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার দিকে সিটি কলেজের সামনে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল হামলা চালায় ছাত্রশিবির কর্মীরা। সন্ধ্যায় শিবির কর্মীরা সিটি কলেজের সামনে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করলে পুলিশ সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। এ সময় ককটেল হামলা চালায় শিবির কর্মীরা। তবে এতে কোনো পুলিশ সদস্য আহত হয়নি।

একইদিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলা এলাকায় খড়ভর্তি ভটভটিতে অগ্নিসংযোগ করে ছাত্রশিবির কর্মীরা। অপরদিকে চারঘাটে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ককটেল ছুঁড়ে ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করে জামায়াত-বিএনপি কর্মীরা।
১২ জানুয়ারি নগরীর উপকণ্ঠে খড়খড়ি বাইপাস ও বিমানবন্দর এলাকায় দুইটি পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দেয় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। ১১ জানুয়ারি পুঠিয়ায় পুলিশের গাড়িতে ককটেল নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা। এতে কেউ আহত হয়নি।

গত ১০ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় আমদানিকৃত পণ্য বোঝাই ১১টি ট্রাকের ওপর ককটেল ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা।

গত ৬ জানুয়ারি নগরীর আলিফ লাম মিম ভাটার মোড় এলাকায় রাইফেল কেড়ে নিয়ে পুলিশ সদস্যদের বেধড়ক পেটায় ছাত্রশিবির কর্মীরা। ভাঙচুর করে পুলিশের পিকআপ ভ্যান। এতে পুলিশের চারজন সদস্য আহত হন।

এ ছাড়া নগরীর হেতেমখাঁ এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদল কর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় ছাত্রদল কর্মীরা পুলিশের গাড়িতে ককটেল হামলা চালায়। তবে এতে কেউ আহত হয়নি।

গত ৫ জানুয়ারি সহিংসতায় ৪ জন নিহত হন। রাজশাহীর বানেশ্বরে বিএনপি-পুলিশ-আওয়ামী লীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনায় একজন পথচারী নিহতসহ ১৫ জন আহত হন। নাটোরের তেবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই ছাত্রদল কর্মী নিহতসহ আহত হন ১০ জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষে একজন নিহত ও ৩০ জন আহত হন।

এ ছাড়া নগরীর উপকণ্ঠ কাটাখালিতে সাংসদ আয়েন উদ্দিনের জনসভায় ককটেল হামলা চালায় ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। একই দিনে নগরীর উপশহর আওয়ামী লীগের উত্তরাঞ্চলীয় কার্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় কেউ আহত না হলেও কার্যালয়ের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম জানান, জামায়াত-শিবির কর্মীরা সহিংস কর্মকা- অব্যাহত রেখেছে। তাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সজাগ রয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 

রাজশাহী বিভাগে বুধবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ২৪ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে বিএনপি।

বুধবার সকাল ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এ হরতাল চলবে। রাজশাহী বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হারুন-অর-রশিদ সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ হরতালের ডাক দেন।

রাজশাহী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল মনির এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কামরুল মনির জানান, যাত্রাবাড়ীতে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসনসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এ হরতালের আহ্বান করা হয়।



মন্তব্য চালু নেই