মেইন ম্যেনু

২৫ মার্চ কেন গণহত্যা দিবস?

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায় ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর ওপর। অপারেশন ‘সার্চলাইট’ নামে পরিচালিত ওই অভিযান শুরুর আগে প্রতিটি বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়। স্থানীয় প্রচারমাধ্যমের উপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। এরপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক লুকিয়ে থাকেন। তাদেরই একজন সাইমন ড্রিং। তিনি ৩১ মার্চ লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’এ তার প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। দীর্ঘ প্রতিবেদনের শুরুটা এ রকম-

‘২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর ঢাকা মহানগরী মুহুর্মুহু তোপধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকে। সর্বত্র বোমা-বারুদের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। টিক্কা খান বর্বর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নির্মমভাবে গণবিদ্রোহ দমনে সচেষ্ট হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের প্রধান কার্যালয় পিলখানা সেনা-অভিযানে বিধ্বস্ত হয়। নিরস্ত্র মানুষের ওপর সেনাবাহিনী নির্বিচারে ভারী আর.আর.গান, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ব্যবহার করে। ইকবাল হলকে তারা প্রধান আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। সেখানে প্রথম ধাক্কাতেই ২০০ ছাত্র নিহত হয়।’

‘একদিকে হলগুলোর দিকে উপর্যপুরি শেল নিক্ষেপ করা হতে থাকে, অন্যদিকে চলতে থাকে মেশিনগানের গুলি। দু’দিন পর্যন্ত পোড়া ঘরগুলোর জানালা-দরজায় মৃতদেহ ঝুঁলে থাকতে দেখা যায়। পথে-ঘাটে মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। জগন্নাথ হলেও বর্বরোচিত আক্রমণ চালানো হয়। কয়েক’শ ছাত্র, যারা প্রায় সবাই হিন্দু ধর্মালম্বী, নিহত-আহত হয়। সৈন্যরা মৃতদেহগুলোকে গর্ত খুড়ে গণকবর দেয়। এরপর ট্যাংক চালিয়ে মাটি সমান করে।’

রিপোর্টটির একটি অংশ ছিল এ রকম-
“আল্লাহ ও পাকিস্তানের ঐক্যের নামে ঢাকা আজ এক বিধ্বস্ত ও সন্ত্রস্ত নগরী।”
ঢাকার মাটিতে একমাত্র ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তান বাহিনীর হাতে এক লাখ মানুষ নিহত হয় বলে ‘Sydney Morning Herald’ বিবরণ দেয়। নয় মাসব্যাপী বর্বরতায় পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের দোসররা তিন লক্ষাধিক নারীকে ধর্ষণ করে, ধ্বংস করে জনপদ।

১৯৮১ সালে জাতিসংঘ সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয় “Among the genocides of human history, the highest number of people killed in lower span of time is in Bangladesh in 1971. An average of 6000 (six thousand) to 12 000 (twelve thousand) people were killed every single day…This is the highest daily average in the history of genocide’s.”

মাত্র ৯ মাসে এবং যে দ্রুততায় মানুষ মারা হয়েছে বাংলাদেশে, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দৈনিক গড়ে ৬,০০০ মানুষ খুন করা হয়েছে মাত্র ২৬০ দিনে। কমোডিয়ার এ হার ছিল ১,২০০। একমাত্র চুকনগরেই ২০ মে ১৯৭১ সালে এক দিনে আট থেকে ১০ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়।

এ কথা সকলের কাছে পরিষ্কার যে, নয় মাসে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হওয়া নিয়ে কোনো বিতর্ক চলতে পারে না। কারণ রবার্ট পেইন তার ‘Massacre, The Tragedy of Bangladesh’ গ্রন্থে ইয়াহিয়া খানের উদ্ধৃতি দেন এভাবে-

‘Kill three million of them and the rest will eat out of our hands’ পাকিস্তানি শাসকদের এ সিদ্ধান্তের কারণে দৈনিক গড়ে ছয় হাজারের বেশি মানুষ খুন হয় সারা বাংলাদেশে। এ জন্য ১৯৭১ সালে মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সরাসরি গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনেন।

‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’- এ বাংলাদেশের হত্যাযজ্ঞকে বিশ শতকের পাঁচটি ভয়ঙ্কর গণহত্যার অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিরাপত্তা বিষয়ক আর্কাইভ’ তাদের অবমুক্তকৃত দলিল প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশের নারকীয় হত্যালীলাকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন কূটনীতিকরা সেসময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক গণহত্যার বর্ণনা দিয়ে ওয়াশিংটনে বার্তা প্রেরণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা একাধিক লেখায় এবং বিশ্বখ্যাত পত্রিকা টাইম, নিউইয়র্ক টাইমস প্রভৃতি পত্রিকার সম্পাদকীয়তে পাকিস্তানিদের গণহত্যা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়।

১৯৭২ সালে পাকিস্তানে গঠিত ‘হামিদুর রহমান কমিশন’ তাদের পরাজয় অনুসন্ধান করতে গিয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও নারী নির্যাতনের ঘটনার প্রমাণ পায়। আর এ ভয়ঙ্কর গণহত্যায় কেঁপে উঠেছিল বিশ্ববিবেক।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘দ্যা রেপ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ‘গণহত্যা’ অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘সারা প্রদেশ জুড়ে হত্যাকাণ্ডের সুব্যবস্থার নমুনার সঙ্গে জেনোসাইড বা গণহত্যা শব্দটির আভিধানিক সংজ্ঞার হুবহু মিল রয়েছে।’ তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার মুখ থেকে জেনেছিলেন গণহত্যার লক্ষ্যবস্তু ছিল—ক) বাঙালি সৈনিক, পুলিশ, আনসার প্রভৃতি; খ) হিন্দু সম্প্রদায়; গ) আওয়ামী লীগের লোক; ঘ) কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; ঙ) অধ্যাপক ও শিক্ষক যারা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তবে তিনি এটাও লক্ষ্য করেছিলেন যে সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ছিল নির্বিচার। নিরপরাধ, সাধারণ মানুষকেও শত্রু হিসেবে গণ্য করেছিল তারা। এছাড়া তাদের গণহত্যা ছিল ‘শোধন প্রক্রিয়া’ যাকে শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান বলে মনে করত। সেই সঙ্গে এ বর্বরোচিত উপায়ে প্রদেশটিকে উপনিবেশে পরিণত করাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকার মার্কিন কনসাল আর্চার কে ব্লুাড ‘দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ (ইউপিএল ঢাকা ২০০০) গ্রন্থে লিখেছেন, সাতসমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী বালুচিস্তানের কসাই জেনারেল টিক্কা খানের অধিনায়কত্বে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলির নিয়ন্ত্রণে, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার অধীনে ৫৭নং ব্রিগেডের ১৮নং পাঞ্জাব, ৩২নং পাঞ্জাব, ২২নং বালুচ, ১৩নং ফ্রন্টিয়ার ফোর্স, ৩১নং ফিল্ড রেজিমেন্ট, ১৩নং বিমান বিধ্বংসী রেজিমেন্ট এবং তিনটি কমান্ডো কোম্পানি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে যে অভিযান পরিচালনা করে তার মধ্যে ১৮ ও ৩২ পাঞ্জাব এবং ২২ বালুচ লে. কর্নেল তাজের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে ‘এথনিক ক্লিনিজং’- এর উদ্দেশ্যে যখন রক্তগঙ্গা, ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা ও ব্যাপক অগ্নি সংযোজনের মাধ্যমে প্রজ্বলিত নরকে পরিণত করেছিল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উপাচার্যবিহীন। তৎকালীন উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি তিন বছরের জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সপরিবারে জেনেভা যান। জেনেভার একটি পত্রিকায় ঢাকায় দু’জন ছাত্রের মৃত্যু সংবাদ দেখে বিচলিত হয়ে ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা সচিবকে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেরিত এক পত্রে লেখেন, তোমরা নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলি চালনার পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তাই আমি পদত্যাগ করলাম। (স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, রেডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশন, লন্ডন, এপ্রিল, ১৯৮৯)।

‘অপারেশন সার্চলাইট’ সম্পর্কে পাকিস্তানি পরিকল্পনার কথা জানা যায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে ইস্টার্ন কমান্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক লিখিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থ থেকে। সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ২৫ মার্চ রাজনৈতিক আলোচনার ফলাফল জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন। সকাল প্রায় ১১টার সময় তার সবুজ টেলিফোন বেজে উঠল। লে. জেনারেল টিক্কা খান লাইনে ছিলেন। তিনি বললেন, খাদিম এটা আজ রাতে। এ খবর খাদিমের মনে কোনো উন্মাদনার সৃষ্টি করল না, তিনি হাতুড়ির আঘাত পড়ার অপেক্ষায় ছিলেন। খাদিম তার অধীনস্থ মহলে আদেশটি বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দিলেন।

খবর যতই নিচের দিকে যাচ্ছিল, ততই উত্তেজনা বাড়ছিল। আমি দেখলাম, কয়েকজন জুনিয়র অফিসার কয়েকটি অতিরিক্ত রিকয়েললেস রাইফেল (ট্যাঙ্কবিধ্বংসী) ও অতিরিক্ত গোলাবারুদ সংগ্রহ এবং একটি ত্রুটিপূর্ণ মর্টার বদলানোর চেষ্টা করছে। কয়েক দিন আগে রংপুর থেকে আনা ২৯নং ক্যাভালরির ৬টি এম-২৪ ট্যাঙ্কে রাতে ব্যবহারের জন্য জ্বালানি বোঝাই করা হচ্ছে। ঢাকার রাস্তায় ভীতি প্রদর্শনের জন্য ওই ট্যাঙ্কগুলো যথেষ্ট। ১৪শ ডিভিশনের সদর দপ্তর থেকে ঢাকার বাইরে অবস্থিত সব গ্যারিসনে আক্রমণের সময় বা এইচ আওয়ারের কথা জানিয়ে দেয়া হয় একটি গোপন সংকেতের মাধ্যমে, যাতে সব গ্যারিসন একসঙ্গে অভিযান শুরু করতে পারে। এই ‘এইচ আওয়ার’ নির্ধারিত হয়েছিল ২৬০১০০ ঘণ্টা অর্থাৎ রাত ১টা, ২৬ মার্চ।

২৫ মার্চের গণহত্যার প্রতিবাদে সারা বাংলাদেশে ২৭ মার্চ সর্বত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়- খবর দৈনিক ইত্তেফাক।

২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানার তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্প, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল ও জহরুল হক হল সহ সারা ঢাকা শহরে তারা (পাকিস্তানি বাহিনী) হত্যাযজ্ঞ চালায়। এক রাতের মধ্যেই ঢাকা শহরকে মৃত্যুকূপ বানিয়ে ফেলে। দৈনিক ইত্তেফাকে ‘গণহত্যা বন্ধ কর’ নামে হেড লাইনে সংবাদ প্রকাশিত হয়ে এবং ২৭ মার্চে সমগ্র বাঙলাদেশে হরতালের ডাক দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের সেই কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে পাকিস্তানি বাহিনী ভয়াল হত্যাযজ্ঞ চালায়। পাকিস্তানি সেনাদের নারকীয় তাণ্ডবের শিকার হন ওই হলের ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মচারী-কর্মকর্তারা। “দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ” থেকে জানা যায়, সে রাতে রোকেয়া হলে আগুন ধরান হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হবার সময় মেশিন গান দিয়ে গুলি করা হয়। ২৬ মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথোপকোথন হয় তা থেকে জানা যায়, ক্যাম্পাসে প্রায় ৩০০ ছাত্র নিহত হয়।

শুধু ইতিহাস রক্ষাই নয়, পাকিস্তানি অপপ্রচারের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে জানাতে এবং ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের মধ্য দিয়ে ফের ঐক্যবদ্ধ হবে বাঙালি জাতি।






মন্তব্য চালু নেই