মেইন ম্যেনু

২০১৪: ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের বছর

ছরের একবোরে শেষ দিনটিতে এসে আবারো হতাশ হয়েছে ফিলিস্তিনিরা। কেননা গত ৩০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ওপর আনা প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে গেছে যেখানে আগামী তিন বছরের মধ্যে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব অবসানের কথা উল্লেখ ছিল। মঙ্গলবার ওই প্রস্তাবটি ভোটাভুটিতে হেরে যায়। এ সম্পর্কে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। এর আগে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস অবশ্য বলেছিলেন, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ওপর জাতিসংঘে তারা যে খসড়া প্রস্তাব আনতে যাচ্ছে, সেটি ব্যর্থ হলে তারা তেল আবিবের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করবেন।

২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে আসছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যপ্রাচ্যে দুই রাষ্ট্রের সহাবস্থান সংক্রান্ত প্রস্তাবকেও স্বাগত জানিয়েছিলেন তিনি।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে। তখন ফিলিস্তিনিরা আলোচনার জন্য একটি সময়সীমা বেঁধে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু তাদের সে অনুরোধ মেনে নেয়া হয়নি। ফলে ইসরায়েল যেমন সময়সীমা মেনে চলেনি তেমন আলোচনা শুরুর প্রধান শর্ত পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণও বন্ধ করেনি। এছাড়া শর্তানুযায়ী ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়নি। যদিও ফিলিস্তিনি সংগঠন পিএলও(প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন)কে তারা স্বীকৃতি দেয়েছে।

ঊর্ধ্বতন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বরাবরই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষোদগার অব্যাহত রেখেছে। ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর অর্থমন্ত্রী নাফতালি বেনেত বলেছিলেন, তিনি কখনোই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে সমর্থন করেন না। তার ভাষায়, ‘এই রাষ্ট্র হলে জেরুজালেমকে ভাগ করতে হবে, ইসরায়েলকে ভাগ করতে হবে। এসব ভাগাভাগি আমার পছন্দ নয়। কেননা এর ফলে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি নাজুক হয়ে পড়বে।’

b43cp53r ২০১৪: ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের বছর

২০১৪ সালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, ফিলিস্তিনের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল হামাস ও ফাতাহর মধ্যে সমঝোতা। গাজা উপত্যকার শাসনকার্য পরিচালনার জন্য ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে উভয় পক্ষই একটি ঐকমত্যের সরকার গঠনের ব্যাপারে  সম্মত হয়। যদিও বাস্তবে এই সমঝোতার ফলে তেমন বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। জুন মাসে কাগজে কলমে একটি সরকার গঠিত হয় এবং গত অক্টোবরে তাদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে কার্যতঃ গাজা এখনো হামাসের অধীনে রয়েছে যে দলটি গত জুলাই-আগস্টের ইসরায়েলি হামলাকে মোকাবেলায় সফল হয়েছে। যদিও মাহমুদ আব্বাসের সরকার আশা করেছিল, ইসরায়েলি হামলা হামাসকে রাজনেতিকভাবে দুর্বল করে ফেলবে বিশেষত প্রতিবেশী মিশর যখন তাদের রাফা সীমান্তটি বারবার বন্ধ করে দিচ্ছে। কিন্তু কার্যতঃ এই হামলা গাজার বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে পশ্চিমতীরে একটি নতুন সংগ্রামের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে।

জুনে ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্য ছিল পবিত্র নগরী জেরুজালেম বিশেষ করে আল আকসা মসজিদটি। কিন্তু ইসরায়েলি সেনাদের গাজা গণহত্যা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন চেতনাবোধ তৈরি হয়েছে।

গত ৬০ বছর ধরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে চলেছে ফিলিস্তিনিরা। এবার ইসরায়েলি যুদ্ধের পর তাদের সে চেষ্টায় নতুন উদ্যম তৈরি হয়েছে। তাদের প্রতিরোধের শক্তিটি আরো জোরদার হয়েছে। যদিও এ যু্দ্ধে প্রায় ২২শ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১১শ আহত হয়েছে। আর ইসরায়েলের পক্ষে মারা গেছে মাত্র ৭০ জন যাদের মধ্যে ৬০ জনের বেশি সেনা সদস্য।

তবে এই তুলনাটি করার সময় আমাদের মনে রাখা উচিৎ, ফিলিস্তিনিরা এমন এক শক্তির সঙ্গে লড়াই করেছে বিশ্বে সামরিক শৌর্যবির্যের জন্য যাদের খ্যাতি রয়েছে। এর আগেও কয়েকটি যুদ্ধে তারা আরবদের সম্মিলিত শক্তিকে পরাজিত করেছে।

vba3bit9 ২০১৪: ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের বছরফিলিস্তিনিদের দমিত করার জন্য নিজেদের সামরিক বিভাগটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে ইসরায়েল সরকার। কিন্তু ২০১৪ সালে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি হামলা পশ্চিমতীরের প্রতিরোধ শক্তি অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল যা ইসরায়েলের সামরিক খ্যাতিকে কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই লড়াইয়ের পর হামাসকে তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

২০১৪ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর  কূটনৈতিক দিক দিয়েও অনেকখানি এগিয়ে গেছে ফিলিস্তিনিরা। নানা সামজিক ও মানবিক সংগঠন, বিবেকমান মানুষ, বিজ্ঞানী এবং সেলিব্রেটিসহ বিশ্বের বিভিন্ন পেশার মানুষের সমর্থন লাভে সক্ষম হয়েছে তারা। গত ৩০ অক্টোবর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে সুইডেন। ফিলিস্তিনকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়ার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করেছে সুইডেন সরকার। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরো সাতটি দেশ যেমন: বুলগেরিয়া, সাইপ্রাস, চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি, মাল্টা, পোল্যান্ড এবং রোমানিয়া তাদের স্বীকৃতি দিয়েছিল।। এছাড়া গত ৪ ডিসেম্বর ফিলিস্তিনকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট। এই তৎপরতার কারণে বিশ্বে ইসরায়েল আজ অনেকখানি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে যা এর আগে কখনোই দেখা যায়নি।

তবে নিজেদের আগের অবস্থানে অটল রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ঐতিহ্যগতভাবেই বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চল যখন শর্তহীনভাবে ফিলিস্তিনিদের সমর্থন দিয়েছে পশ্চিমারা তখন ইসরায়েলের পক্ষ নিয়েছে। ইউরোপের সমর্থনের কারণেই ১৯৯৩ সালে ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিনের মধ্যে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।  ওই চুক্তিতে একটি দখলদার রাষ্ট্র এবং দখলকৃত জাতির মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা স্পষ্ট। আর এই সত্যিটি কেনা জানে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অস্ত্র ব্যবসার প্রধান ক্রেতা হচ্ছে ইসরায়েল। এদের কাছ থেকে কেনা অস্ত্রগুলোই পশ্চিমতীরের সাধারণ মানুষদের ওপর প্রয়োগ করছে ইসরায়েলি সেনারা যা যুদ্ধাপরাধ হিসেবেই স্বীকৃত।

যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন সমর্থন আর ইউরোপের কপটতাকে পুঁজি করেই তো দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনকে লেজে খেলাচ্ছে ইসরায়েল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনোদিন কোলাহলপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারায়,  সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েল তার একগুঁয়ে মনোভাব পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবে।
hc6xoxm2 ২০১৪: ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের বছর২০১৫ সাল মধ্যপ্রাচ্যে আশাব্যঞ্জক কিছু ঘটবে এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফিলিস্তিনিরা টিকে থাকার জন্য লড়াই করতেই থাকবে। ইসরায়েলের কাছ থেকে কিছু সুবিধা নেয়ারও চেষ্টা করবে তারা। বরাবরের মতই ইসরায়েলের প্রতি আমেরিকান তহবিল, নিঃশর্ত সমর্থন এবং সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

হ্যাঁ, আগামী বছর যে আরো হতাশা মোকাবেলা করতে হবে গত ৩০ নভেম্বরের ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। ২০১৪ ফিলিস্তিনিদের জন্য বেদনাদায়ক বছরগুলোর অন্যতম হলেও এটি কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিরোধের জন্য বিশেষ হয়ে থাকবে। তাদের ওই প্রতিরোধ এটিই প্রমাণ দেয় যে, ৬০ বছর ধরে লড়াই করার করার পরও তারা ভেঙে পড়েনি। তাদের এই অর্জনটি কিন্তু মোটেও হেলাফেলার নয়।






মন্তব্য চালু নেই