মেইন ম্যেনু

হকারদের দোকান বরাদ্দের ফাইল উধাও

সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাজধানীর নির্ধারিত ২০টি স্থানে অস্থায়ী ভিত্তিতে ফুটপাতে দোকান বসানো ও মালামাল বিক্রির অনুমতি দিয়েছিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের কথা যেনো ভুলেই গেছেন বিভক্ত সিটি করপোরেশেনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা!

সংস্থার ফাইলে দোকানগুলো বৈধতার তালিকায় থাকলেও এখন কর্মকর্তারা বলছেন সেগুলো অবৈধ! কেবল করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের চাঁদা না দেয়ায় বিনানোটিশে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট ও দোকান ভেঙে দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে।

জানা গেছে, এক এগারোর পর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ফুটপাতে অবৈধ হকার উচ্ছেদ অভিযান করে। এতে হাজার হাজার হকার বেকার হয়ে পড়ে। উচ্ছেদ করা হকারদের দুঃখ কষ্ট লাঘবে ও তাদের জীবিকা নির্বাহের স্বার্থে ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বর সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাজধানীর নির্ধারিত ২০টি স্থানে অস্থায়ীভাবে ফুটপাতে দোকান বসা ও মালামাল বিক্রির অনুমতি দিয়ে সচিবের স্বাক্ষর সংবলিত গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে তৎকালীন অবিভক্ত সিটি করপোরেশন। বিষয়টি গণমাধ্যমেও ফলাও করে প্রচারও হয়েছে তখন।

অনুমতি দেয়া স্থানগুলো হচ্ছে- জুরাইন পোস্তগোলার আলম মার্কেট এলাকার খালি জয়গা ও রাস্তার উভয় পার্শ্বে নির্দিষ্ট স্থান, যাত্রাবাড়ী সামাদ সুপার মার্কেটের সামনে শহীদ ফারুক সড়কের খানকা শরীফ পর্যন্ত রাস্তার উভয় পার্শ্ব ও যাত্রাবাড়ী রাস্তার উত্তর পাশে ফটপাতের নির্দিষ্ট স্থান, মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের উত্তর পার্শ্বের খালি জায়গার নির্দিষ্ট স্থান ও সোনালী বাংকের প্রধান কার্যালয়ের পশ্চিম পার্শ্বের রাস্তা সংলগ্ন দুইটি খালি জায়গা, গুলিস্তান এলাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউ লিংক রোড ফুটপাতে নির্দিষ্ট স্থান, বায়তু্ল মোকাররম লিংক রোড ও মুক্তাঙ্গন এলাকার নির্দিষ্ট স্থান, শাহবাগ থানার উত্তর পাশের ফুটপাতের ফুল মার্কেটের নির্দিষ্ট স্থান, দোয়েল চত্বরের পূর্ব পার্শ্বের (মৃৎ শিল্প ও গাছের চারার হকারদের জন্য) নির্দিষ্ট স্থান, নিউমার্কেট এলাকার পূর্ব পার্শ্বে ফুটপাত, গাউছিয়া মার্কেটের পশ্চিম পাশের খালি জায়গা, ফার্মগেট এলাকার ইন্দিরা রোডের দিকে যাওয়ার পথে হাতের ডান পাশের ফুটপাতের নির্দিষ্ট স্থান, মিরপুর রোকেয়া সরণী এলাকার অবহাওয়া অফিস সংলগ্ন রাস্তার নির্দিষ্ট স্থান, মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার নির্দিষ্ট স্থান, মিরপুর ১১নং এলাকার পূরবী সিনেমা হলের সামনের নির্দিষ্ট স্থান, মিরপুর ১নং এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের সামনে রাস্তার ফুটপাতের নির্দিষ্ট স্থান, মিরপুর ইসলামী বাংকের সামনে ফুটপাতে নির্দিষ্ট স্থান, মহাখালী আমতলী এলাকায় রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের খালি জায়গা, গুলশান ১ নম্বর এলাকার ডিসিসি মার্কেট সংলগ্ন স্থান ও উত্তরা রাজউক মাঠের নির্দিষ্ট স্থান।

এসব এলাকার হকারদের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্তৃক নির্দিষ্ট ফরমে রেজিস্ট্রেশন ও আইডি কার্ডের ব্যবস্থা করা হয় বলেও গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা খালিদ আহমেদ বলেন, ‘করপোরেশনের এমন সিদ্ধান্তের কোনো ফাইল আমার কাছে নেই। বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটা হকারদের সাজানো। ফুটপাতের সব মার্কেটই অবৈধ। যে যাই বলুক, ফুটপাতের সব দোকানের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের ওই গণবিজ্ঞপ্তিতে শাহবাগ থানার উত্তর পাশের ফুটপাতের ফুলের দোকানগুলোও ছিল। কিন্তু গত শনিবার দুপুরে ‘অবৈধ’ বলে মার্কেটটি উচ্ছেদ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বিষয়টি নিয়ে হকারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে।

শাহবাগ বটতলা ছিন্নমূল ফুল ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, ‘দোকান করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন আমাদেরকে অনুমতি দিয়েছে। আমাদের কাছে বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। কিন্তু তারা কিছুতেই আমাদের কথা শুনেনি। নোটিশ ছাড়াই তারা অভিযান চালিয়ে ছিন্নমূল মানুষের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি করেছে। এতে আমাদের কমপক্ষে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার ফুল নষ্ট হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনে ট্যাক্স দেবো। আমাদেরকে একটি জায়গা নির্ধারণ করে দেয়া হোক। আমরা যাতে ফুলের ব্যবসা করে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে পারি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযান পরিচালনাকারী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কবির মোহাম্মদের বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের অনুমতি দেয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। ফাইল দেখেই আমাকে এ ব্যাপারে বলতে হবে। তবে করপোরেশন অনুমতি দিলেও দিতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চাইলে উচ্ছেদ চালিয়ে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ হাজার লোককে বেকার করে দিতে পারি। কিন্তু এতেই কি সমস্যার সমাধান? না। আসলে এখানের (ডিসিসি) ম্যানেজমেন্ট ভালো না। সিটি করপোরেশন চাইলেও হকারদের পুনর্বাসন করতে পারবে না। কিন্তু ভালো একটা ম্যানেজমেন্ট দিয়ে তদারকির মাধ্যমে তাদের বেকারত্ব দূর করতে পারে।’

ছিন্নমূল ফুল ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক গাঁজি নাঈমুর রহমান বলেন, ‘আগে এখানে অনেক গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হতো। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, খুন, ছিনতাইসহ নানা কর্মকাণ্ড চলতো। সন্ধ্যা হলেই এ এলাকা দিয়ে কেউ হাঁটতো না। দোকানগুলো হওয়ার কারণে এখানে একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। উচ্ছেদ চালানোয় এ পেশার সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। স্টকে এখনো ৫০ লাখ টাকার মতো ফুল রয়েছে। এগুলো বিক্রি করতে না পারলে পচে যাবে।’

সমিতির উপদেষ্টা কালাম বলেন, ‘আমরা ময়লা আবর্জনা সরানোর জন্য সিটি করপোরেশনকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে প্রতিমাসে ছয় হাজার টাকা দিয়ে থাকি। যদি আমাদের দোকান অবৈধ হয়ে থাকে তাহলে তারা আমাদের টাকা নেয় কেন?’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ফুল ব্যবসায়ী বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ হয়ে একাধিক ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সময়ে আমাদের কাছে চাঁদা দাবি করে আসছে। আমরা কেন চাঁদা দেবো? সরকার আমাদেরকে অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু আমরা তাদেরকে চাঁদা দিতে চাইনি বলেই আমাদের উচ্ছেদ করেছে।






মন্তব্য চালু নেই