মেইন ম্যেনু

সড়কে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে

মহাসড়ক ধরে চলতে গেলেই এখানে সেখানে সাইনবোর্ডে লেখা দেখা যায়, ‘সাবধান, সামনে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা’ পথ চলতে গিয়ে এমন সাবধানবানী অবশ্য গাড়ির চালকরা কমই মানেন। ফলে প্রায় প্রতিদিনই আসে মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনার খবর। গাড়ি চালকদের এই উদাসীনতায় মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে সরকার কী করছে, সে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা সেন্টারের একটি হিসাব অনুযায়ী যানবাহনের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার পুরো পৃথিবীতে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে বাংলাদেশে বছরে মৃত্যু হয় ৮৫টি। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় এ হার প্রায় ৫০ গুণ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপির অন্তত দুই শতাংশ হারিয়ে যায়।

দুর্ঘটনার কারণগুলো

বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনা গবেষণা সেন্টার-এআরআই দেখেছে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা; অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গাড়ি চালানো; নির্দিষ্ট গতিসীমা না মানা; মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য পরিবহণ; গাড়ি চালানোর আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকা; বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করা; প্রতিযোগিতা করা, সামনের গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখা; ত্রুটিপূর্ণভাবে গাড়ি চালানো; চালকের বদলে সহকারী দিয়ে গাড়ি চালানো; ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে অসচেতনভাবে গাড়ি চালানো; যথাসময়ে যথোপযুক্ত সঙ্কেত দিতে ব্যর্থতা; যথাযথ লেনে গাড়ি না চালানো; প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না নিয়ে অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় একটানা গাড়ি চালানো; নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো; মানসিক অস্থিরতা বা অতিরিক্ত চাপ ও শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে গাড়ি চালানো; দৈহিক অযোগ্যতা নিয়ে গাড়ি চালানো, শিক্ষার স্বল্পতা, পেশাগত জ্ঞানের অপর্যাপ্ততা ইত্যাদিই দায়ী বেশিরভাগর দুর্ঘটনা পেছনে।

এআরআই এর সাবেক পরিচালক এবং বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাসীব মোহাম্মদ হাসান ঢাকাটাইমসকে বলেন, আমাদের দেশে সড়কে অতিরিক্ত বাঁক, পরিবহণের কাঠামোগত ত্রুটি, চালকদের অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানো প্রভৃতি দুর্ঘটনার মূল কারণ।

হাসীব মোহাম্মদ হাসান বলেন, অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে সড়কের ত্রুটির কারণে। মহাসড়কের সাথে সংযোগ সড়কগুলো পরিকল্পনাহীনভাবে নির্মিত হচ্ছে। কোনও বাঁকে সংযোগ সড়কগুলো যোগ হচ্ছে সে বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনা নাই। আর এতে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

মালিকরা বেশি যাত্রী বা পণ্য পরিবহণের জন্য বাস ও ট্রাকের পরিধি পাল্টে এর আকার বাড়ান। ফলে চালক যানবাহনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

অধ্যাপক হাসিব আরও বলেন, পরিসংখ্যান দেখলে বুঝা যায় আমাদের দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ঈদে সড়ক দুর্ঘটনার হার বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এর অন্যতম কারণ, মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফার আশায় অতিরিক্ত ট্রিপ চালানো। কোনও কোনও সময় চালকরা ২৪ ঘন্টা গাড়ি চালায়। বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই ঘটে ভোরে বা রাতে। স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত চাপের কারণে চালক ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

মহাসড়কে নসিমন, ভটভটি, মোটরসাইকেল, সাইকেল, রিকশা, অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করতে না পারলে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন হবে বলেও মনে করেন ওই বিশেষজ্ঞ।

গবেষণা বলছে, যাত্রী নয়, বেশিরভাগ দুর্ঘটানায় পথচারিরাই মৃত্যুর শিকার হন। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে শতকরা ৫৪ ভাগ দুর্ঘটনায়ই পথচারিরা মৃত্যুর শিকার হন। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩ শতাংশ, পেছন থেকে ধাক্কায় ১১ শতাংশ এবং উল্টে যাওয়ার কারণে নয় শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে।

রাস্তায় নসিমন, করিমন, ভটভটির মতো অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ায়। এছাড়া গাড়ির চাকা, ব্রেক, হর্ন, সংকেত বাতি, ওয়াইপার ইত্যাদির ত্রুটি, ইঞ্জিনের ত্রুটি, গাড়িতে ঝুঁকিপূর্ণ টায়ার ব্যবহার, পুরোনো টায়ারের ওপর রাবার লাইনিং করা, গাড়ির আয়ুষ্কাল অতিক্রান্ত হওয়ার পরও অতিপুরোনো গাড়ি মেরামত করে রাস্তায় নামানোও এজন্য দায়ী।

মৃত্যু বাড়ছে

পুলিশের হিসাবে প্রতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র বলছে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ১২ হাজার থেকে ২০ হাজারও হতে পারে।

দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র আরও বলেছে, প্রতি বছরই আগের বছরের তুলনায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এর কারণ হচ্ছে, ঝুঁকি কমাতে কার্যকর তেমন কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যা হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে। সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর ৪৬ শতাংশই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত।

২০টি স্থান ভয়াবহ

সম্প্রতি পিপিআরসি ও ব্র্যাকের চালানো এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে নয়টি জাতীয় মহাসড়কের ৫৭ কিলোমিটার এলাকার মধ্যেই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। ওই গবেষণায় সড়ক-মহাসড়কের ২০৮টি স্থানকেই প্রধানত দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনার শতকরা ৪১ ভাগ ঘটে বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। ২৮ শতাংশ হয় বাজার এলাকায়। আর ৩৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বাস চালনায় ত্রুটির কারণে। আর সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ জেলা ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ।

সারা দেশের ২০টি স্পটকে ‘ব্ল্যাক লিস্টেড’ করা হয়েছে। এ জায়গাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। জায়গাগুলো হলো- ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর সেতু এবং দাউদকান্দি বাসস্ট্যান্ড, ঢাকা-আরিচা রোডসংলগ্ন তিতাস গ্যাস অফিসের আধা কিলোমিটার পরে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেখেরচর বাসস্ট্যান্ড, মাধবপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ১১ কিলোমিটার আগে, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের টঙ্গী মার্কেট, শালনা বাজার, ঢাকা-গাজীপুর-জামালপুর রোডের নবীনগর ইন্টারসেকশন, কুরুনীবাজার বাসস্ট্যান্ড, ঢাকা-আরিচা রোডের কাজলা বাসস্ট্যান্ড (পূর্ব ও পশ্চিম), হাটিকুমরুল বাসস্ট্যান্ড, বাঘোপাড়া বাসস্ট্যান্ড, ঢাকা-রাজশাহী রোডের দুলাই বাজার, বানেশ্বর বাজার, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের উজানচর প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে এক কিলোমিটার আগে, ঢাকা-বরিশাল রোডের ইস্ট ইকুরিয়া বাজার বাসস্ট্যান্ড, আবদুল্লাহপুর বাজার বাসস্ট্যান্ড, পশ্চিমে আড়িয়াল খাঁ ফেরিঘাট ও মালিগ্রাম বাসস্ট্যান্ড।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যমতে, ঢাকা শহরের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, ইটিভি ভবনের সামনের সড়ক, বিজয় সরণি, সায়েদাবাদ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সোনারগাঁও, শনির আখড়া, শাহবাগ, জসীমউদ্দীন রোড ক্রসিং, জিপিও মোড়, শাপলা চত্বর, শেরাটন মোড়, মগবাজার, কাজী নজরুল ইসলাম রোড, ইস্কাটন, বিজয় সরণিতেও কমবেশি দুর্ঘটনা ঘটে।

কীভাবে কমানো যায় মৃত্যু

গবেষণায় বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বেপরোয়া গাড়ি চালানোকে। অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে চালকের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না থাকা, ত্রুটিপূর্ণ যান, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দুর্বলতা আর দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়া।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গবেষণাপত্রে আটটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইন করা, সড়কের প্রকৌশলগত উন্নয়ন, সড়ক নিরাপত্তার জন্য একটি স্বতন্ত্র খাত তৈরি ও তহবিল গঠন, গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি।

বিপুল পরিমাণ ক্ষতির আশঙ্কা এবং সরকারের উদ্যোগ

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ২০২০ সালের মধ্যেই দেশে দুর্ঘটনার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সংস্থার সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০১৩-এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১.৬ শতাংশ।

এ নিয়ে বিভিন্ন মহলের বহু দাবি ও সুপারিশের পর উদ্যোগী হয়েছে সরকার। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করতে ১৬৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সড়ক বিভাগ। প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে মহাসড়কের বাঁকগুলো সোজা করা, পথচারীর পারাপার ব্যবস্থার উন্নয়ন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা অপসারণ, সিগন্যাল ও রোড মার্কিং স্থাপন করা হবে।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২০ সালের মধ্যে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। ২০১৫ সালের মধ্যে প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে দুর্ঘটনা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ এন সিদ্দিকী বলেন, ইতোমধ্যেই মানিকগঞ্জের আঁকাবাঁকা মহাসড়ক সোজা করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে এসেছে। এই সাফল্যই এ ধরণের উদ্যোগ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আইন প্রয়োগে কঠোর হওয়ার দাবি

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান সাবেক চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন ঢাকাটাইমসকে বলেন, আমাদের দেশের চালক পথচারি কেউই ঠিকমতো আইন মানেন না। আবার এই অপরাধের কোনও শাস্তিও হয় না।

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে একটি আইনও করতে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে আছে নিরক্ষর ব্যক্তিদের ড্রাইভিং লাইসেন্স না দেওয়া, দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য কারাদন্ড ও লাইসেন্স বাতিলসহ নানা বিধান।

তবে ইলিয়াস কাঞ্চন মনে করেন, আইন হলেও তার প্রয়োগ না হলে কোনও লাভ নেই। এখনও যেসব আইন আছে সেগুলোর প্রয়োগ হলেও দুর্ঘটনা অনেক কমে যেতো।

বুয়েট পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাসীব মোহাম্মদ হাসান বলেন, বেশির ভাগ দুর্ঘটনার পর এখন আর মামলা হয় না। কারণ, মামলা হলেও বিচার হয় না। তাই ভুক্তভোগীরা এই পথ মাড়াতে চায় না।






মন্তব্য চালু নেই