মেইন ম্যেনু

সেই ভয়াল পিলখানা ট্র্যাজেডি আজ

২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পিলখানার বিডিআর সদর দফতরে রাইফেলস সপ্তাহের উদ্বোধন হয়। পরেরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজনের দ্বিতীয় দিন। অনান্য দিনের মতোই সেদিন সকালটা শুরু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। সকাল ৯টায় যথারীতি পিলখানার দরবার হলে বসেছিল বার্ষিক দরবারও। ২৬ ফেব্রুয়ারি নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন নৈশভোজ আর উৎসবের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল রাইফেলস সপ্তাহ। কিন্তু কোথা থেকে কি ঘটে গেল তা স্বপ্নেও আঁচ করতে পারেনি এদেশের সাধারণ মানুষ। হঠাৎই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পিলখানার আশপাশের এলাকা; যা আরো দুইদিন আতঙ্ক হয়ে ভর করেছিলো এদেশের প্রতিটি মানুষের বুকে।

পিলখানায় বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হয়েছিলেন। সেদিন পিলখানার বিপথগামী জওয়ানদের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশের ৫৭টি ইউনিটে। টানা একদিন একরাত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ২৬ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

জানা যায়,২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ৫ মিনিটে তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল দরবার হলে প্রবেশ করেন। এরপর ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিবুল হক তার কাছে প্যারেড হস্তান্তর করলে ডিজি ও ডিডিজি মঞ্চে নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করেন। এরপরই শুরু হয় বার্ষিক দরবারের আনুষ্ঠানিকতা। পিলখানা জামে মসজিদের ইমাম সিদ্দিকুর রহমানের কোরআন তেলাওয়াতের পর দরবারের সবাইকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন মেজর জেনারেল শাকিল। প্রথমেই তিনি ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কার্যক্রম প্রসঙ্গে কথা বলেন।

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই দরবার হলের আলোকিত পরিবেশ রূপ নেয় ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে। ঘড়ির কাঁটা ১০টা না পেরুতেই ভয়ের অন্ধকার ছড়িয়ে দিয়েছিল সর্বত্র। হঠাৎ করেই একজন দাঁড়িয়ে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করে। দুই-একজন এগিয়ে যায় মঞ্চের দিকে। কেউ তাদের থামাতে দৌঁড়ে আসেন, আবার অন্যরা পেছন থেকে দ্রুত মঞ্চের দিকে আসতে থাকেন। সবাইকে লক্ষ করে শুরু হয় গুলিবর্ষণ। গুলি চলে অবিরাম। গোলাবারুদের গর্জন ও গ্রেনেডের বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল বিডিআর দরবার হলসহ গোটা পিলখানা এবং সংলগ্ন পুরো এলাকা। হতচকিত হয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র সাধারণ মানুষও। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী হচ্ছে। বিডিআর সদর দফতরের অভ্যন্তরে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সুবাদে কেবল বারবার দেখা যাচ্ছিলো পিলখানার বিভিন্ন গেটের রেলিংয়ের কাছাকাছি হলুদ-লাল নানারঙের কাপড়ে মুখবাঁধা বিদ্রোহী বিডিআর জওয়ানদের ছোটাছুটি আর গোলাগুলির গা ছমছমে দৃশ্য।

এ সময় বিদ্রোহীদের ঠেকাতে গেলে কর্নেল মুজিব, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এনায়েত এবং মেজর মকবুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর বিপথগামীরা তৎকালীন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমদকে দরবার হল থেকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় নিয়ে আসে এবং নির্মমভাবে হত্যা করে। একই সময় ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় আরও ৬ সেনা কর্মকর্তাকে। অস্ত্রাগার ভেঙে ভারী অস্ত্র নিয়ে সদর দফতরের ভেতরে কর্মকর্তাদের বাসায় বাসায় ঢুকে হামলা ও লুটপাট চালায় বিপথগামীরা। যেসব সেনা কর্মকর্তা প্রাণ বাঁচাতে এদিক-ওদিক পালিয়ে যান, তাদেরও খোঁজা শুরু হয়। যাকে যেখানে পায়, তাকে সেখানেই হত্যা করা হয়। এমনকি ডিজির বাসায় ঢুকে তার স্ত্রী নাজনীন শাকিল ও গৃহপরিচারিকাকে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। তার বাসায় বেড়াতে আসা স্বজনরাও রক্ষা পাননি বিদ্রোহীদের হাত থেকে। সেদিন বিদ্রোহীদের কয়েকটি অংশ ভারী অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় বিভিন্ন গেটে। পিলখানার প্রবেশপথগুলোতে আর্মডকারসহ গোলাবারুদের গাড়ি ও এসএমজি বসিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি চালানো হয়।

২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। দুই দিনের বিভীষিকা থামিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করে বিপথগামীরা। তখনও কেউ কল্পনা করেননি যে কী ভয়াবহ নৃশংসতার দৃশ্যপট সৃষ্টি হচ্ছে এই গোলাগুলির অন্তরালে। পরদিন পিলে চমকানো সব খবর প্রচার হতে শুরু করে। বিদ্রোহীরা প্রায় দুই দিন ধরে বিডিআরে প্রেষণে কর্মরত মহাপরিচালকসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, র‌্যাবে কর্মরত একজন সেনা কর্নেল গুলজার আহম্মেদ, অবসরপ্রাপ্ত একজন সেনা কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী, বিডিআর মহাপরিচালকের স্ত্রী, বিডিআরের আট সদস্য এবং পিলখানার ভেতরে দুজন ও বাইরে চারজন বেসামরিক লোকসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করে।

কলঙ্ক মুছতে বিডিআর থেকে বিজিবি
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) নাম রাখা হয়েছিল। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিডিআর সদর দফতরসহ দেশের সব ব্যাটালিয়নে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে বিডিআরের নাম, পোশাক, লোগোসহ সার্বিক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেয় সরকার। পড়ে বিজিবি’র বিল ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিলে সই করেন। পরে বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) নাম পরিবর্তন করে ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর নতুন নাম রচিত হয়। এর মধ্য দিয়েই বিডিআরের (বাংলাদেশ রাইফেলস) নাম হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিডিআর বিদ্রোহের পর বিডিআরের নাম ও পোশাক পরিবর্তন এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয় এই বিলে।

সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের নানা উদ্যোগ
জানা গেছে, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্রোহের পর বিজিবির সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে গত ৮ বছরে বিজিবির অপারেশনাল সক্ষমতাসহ সীমান্তে অপরাধ দমন ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবিতে যুক্ত হয়েছে ডগ স্কোয়াড,এয়ার উইং ও সীমান্ত ব্যাংকের লেনদেন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সীমান্ত এলাকার চেকপোস্টগুলোতে বিজিবি’র নারী সৈনিক নিয়োগের মাধ্যমে সন্দেহভাজন মহিলাদেরকে তল্লাশি করা হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়াতে সংযোজিত হয়েছে আইসিটি ব্যাটালিয়নও।

বিজিবির কর্মকর্তারা জানান, বিজিবি’র সাংগঠনিক কাঠামোতে চারটি রিজিয়ন সৃষ্টির মাধ্যমে কমান্ডিং স্তরের বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে নতুন করে গঠিত চারটি সেক্টর, ১৫টি ব্যাটালিয়ন ও ৯০টি বিওপিসহ ১৬টি সেক্টর, ৫৭টি ব্যাটালিয়ন ও ৬৫০টি বিওপি (বর্ডার আউট পোস্ট) নিয়ে বিজিবি সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে ১২৮টি বিএসপি (বর্ডার সেন্ট্রি পোস্ট)। আরও ৬০টি বিওপি এবং ১২৪টি বিএসপি স্থাপনের পরিকল্পনাধীন রয়েছে। সাতক্ষীরার সুন্দরবন এলাকায় দুইটি ভাসমান বিওপি নির্মিত করা হয়েছে।
অরক্ষিত সীমান্তে নতুন ৫৫টি বিওপি নির্মাণ করার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার ৪৭৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে ৩৭০ কিলোমিটার এলাকা ইতোমধ্যে বিজিবির নজরদারির মধ্যে চলে এসেছে। অবশিষ্ট অরক্ষিত সীমান্তে পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন বিওপি স্থাপন করা হবে। সীমান্তে বিজিবির টহল সুবিধার্থে ভারত সংলগ্ন সীমান্তে ৯৩৫ কিলোমিটার এবং মায়ানমার সংলগ্ন সীমান্তে ২৮৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া, সীমান্তে রাস্তা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিজিবির দুইটি কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। সীমান্তে অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সর্বাধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ, চোরাচালান প্রতিরোধে ডগ স্কোয়াড সংযোজন এবং অবৈধ দ্রব্য তল্লাশির জন্য আধুনিক স্ক্যানার মেশিন যুক্ত করা হয়েছে।

পার্বত্য এলাকার দুর্গম সীমান্তে বিওপি নির্মাণ এবং সেগুলোতে নির্বিঘ্নে অপারেশনাল ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে বিজিবির নবগঠিত নিজস্ব এয়ার উইং চালু এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। সীমান্তে কার্যকর নজরদারির লক্ষ্যে বিওপিগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব ৫/৬ কিলোমিটারে নামিয়ে আনতে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন নতুন বিওপি। ২০০৯ সালের বিদ্রোহের পর এ পর্যন্ত বিজিবিতে ২৪ হাজারেরও বেশি লোক নিয়োগ করা হয়েছে। বাহিনীর সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড স্কুল (বিজিটিসিঅ্যান্ডএস)-এর পাশাপাশি রিজিয়ন, সেক্টর এবং বিজিবি’র গোয়েন্দা সংস্থা বর্ডার সিকিউরিটি ব্যুরোর (বিএসবি) মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে নিয়মিত ভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক প্রশিক্ষণ বাড়ানো হয়েছে।






মন্তব্য চালু নেই