মেইন ম্যেনু

শাবিতে ওই দিন রাতে যা ঘটেছিল (অডিও)

শাবিতে ছাত্রলীগকর্মী খুনের নেপথ্যে :

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) গত কয়েক মাসে সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনার পেছনে ছাত্রলীগের অভ্যন্তর‍ীণ দ্বন্দ্ব। গত বৃহস্পতিবার এই দ্বন্দ্বের জেরেই সুমন নামে এক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না নিয়ে যথেষ্ট তৎপর না হওয়ার অমন অস্ত্রবাজি এবং খুনের ঘটনা ঘটে। যার ফলশ্রুতিতে ক্লাস, পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

চলতি বছরের ১৯ মে শাবিপ্রবি অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে ছাত্র হলে লুট ও ভাঙচুর চালায় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। ওই দিন (রোববার) রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলের ৪টি কক্ষ থেকে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ২টি ডেস্কটপ কম্পিউটার, ২টি ল্যাপটপ, ৪টি মোবাইল ফোন ও নগদ ২০ হাজার টাকা লুটে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছিল।

সেদিন দিন রাত ৮টার দিকে মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক পিযুষ কান্তি দে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যান। তার উপস্থিতিতে বহিরাগত কয়েকজন ক্যাডার ছাত্রলীগের উত্তম-অঞ্জন গ্রুপের কর্মী বিবিএ মাস্টার্সের ছাত্র শফিকুল ইসলাম শফিকের শরীরে অস্ত্র ঠেকিয়ে চড়-থাপ্পড় মারে। এসময় পিযুষের ক্যাডারদের সঙ্গে যোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আসাদ গ্রুপের নেতাকর্মীরা। খবর পেয়ে অঞ্জন-উত্তম গ্রুপের নেতারা এসে বিষয়টি পিযুষের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু সমঝোতা না করেই পিযুষ ক্যাম্পাস থেকে চলে যান। তার চলে যাওয়ার পরই উত্তম-অঞ্জন গ্রুপের ক্যাডাররা বিভিন্ন হল থেকে বের হয়ে ক্যাম্পাসে জড়ো হয়। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিমাদ্রি শেখর প্রক্টরিয়াল বডির অন্য সদস্যদের নিয়ে অঞ্জন ও উত্তমের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করেন। রাত ১০টার দিকে শাহপরাণ ও বঙ্গবন্ধু হলের মাঝপথে প্রক্টর ও ছাত্রলীগ নেতা অঞ্জনসহ অন্যদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।

সেই বাকবিতণ্ডার একটি অডিও পাওয়া গেছে। যাতে ছাত্রলীগের দ্বন্দ্ব, ক্যাম্পাসে প্রশাসনেও তাদের প্রভাব এবং বেপরোয়া সহিংস রাজনীতির চিত্রটি উঠে এসেছে।

 

ওই দিন রাতে যা ঘটেছিল :

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি অঞ্জন রায়সহ কয়েক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় প্রক্টর হিমাদ্রি শেখরের। এসময় ছাত্রলীগ নেতারা প্রক্টরকে গালিগালাজ ও হুমকি-ধামকি দেন। এ সময় প্রক্টরকে উদ্দেশ করে তারা বলেন- দোষতো আপনাদের স্যার। আপনারা দোষ করেন। দুষ্টু ছেলেদের বিরুদ্ধে আপনারা মামলা করেন না। বহিরাগতরা যে হামলা করেছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কি কোনো ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন? নষ্ট করেছেন আপনারা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক শামছুজ্জামন চৌধুরী সুমন (সুমন ভাই) বললে তো আপনারা ব্যবস্থা নিতেন। সুমন ভাইয়ের কথায় তো আমাদের বিরুদ্ধে মামলাও দিয়েছে আপনারা।

তখন প্রক্টর বলেন, ‘আমি যেটা বুঝি, তোমাদের নিয়ে যে যাই অভিযোগ দিক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ না। এটা আইনিভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তোমরা নিজেরা নিজেরা সমস্যা করবে আর আমাদের ওপর দোষ দিবে। এটা হতে পারে না।’

প্রক্টর তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘যে যাই দল করুক আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তখন ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, ‘স্যার আমরা চাইসলাম (চাইনি) না।’ তখন প্রক্টর বলেন, ‘এটা প্রসাশন ইনভলবড হওয়ার সুযোগ খুব কম। ছাত্রলীগের নিজেদের সমস্যা নিজেদের সমাধান করতে হবে। আগেই একবার বলেছি। আগেও একবার তোমাদের মধ্যে সমস্যা হয়েছে। তোমাদের সমস্যা তোমাদের মিটাতে হবে।’

এর পর আসেন ছাত্রলীগ নেতা উত্তম। এসেই তিনি তার নিজ কর্মীকে ধমক দিয়ে সরতে বলেন। তিনি প্রক্টরকে উদ্দেশ করে উচ্চস্বরে চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘আপনার কারণেই এ ঝামেলা হয়েছে।’ উত্তম তিন তিন বার চিৎকার করে বলেন, ‘আপনার কারণেই ঝামেলা হয়েছে। আপনে মামলা দিতে বাধা দিয়েছেন। আপনে আপনার ডিপার্টমেন্টের বিধায় আপনে এসব করেছেন। কোনো মার্ডার হলে আপনে সব লায়াবিলিটি (দায়) নিবেন।’

তখন অন্য শিক্ষকরা উত্তমকে থামানোর চেষ্টা করেন। এসময় উত্তম-অঞ্জন গ্রুপের আরেক নেতা বলেন, ‘আমাদের ১০ উইকেট ফেলার মতো এবিলিটি (শক্তি) আছে।’

তখন প্রক্টর নীরব হয়ে যান। শুরু হয় হট্টগোল। এক পর্যায়ে প্রক্টর বলেন, ‘মামলা করা হবে না এ কথা কি আমি বলেছি?’ এ কথা বলার পর শুরু হয় উত্তম ও প্রক্টরের তর্কাতর্কি। উত্তম বলেন, ‘মামলা না নেয়ার জন্য প্রক্টর নির্দেশ দিয়েছে। আর প্রক্টর তা অস্বীকার করেন।’ তখন অন্য শিক্ষকরা মামলা হবে বলে উত্তমকে আশ্বাস দেন।

এরপর উত্তম প্রক্টরকে বলেন, ‘আমরা আপনাকে কীভাবে চেয়ারে রাখছি তা কি জানেন আপনে?’ এসময় আরেক নেতা বলেন, ‘বহিরাগতরা এতদিন ক্যাম্পাসে ঢুকার অনুমতি পায়নি। এখন প্রত্যেক দিন তারা ঢুকবে। এখন অনুমতি দেয়া হবে।’

আবার উচ্চস্বরে কথা বলা শুরু করেন উত্তম। তিনি বলেন, ‘যে ছেলে ছাত্রলীগ করে তাদের ওপর মামলা দেন। আর যে ছেলে ছাত্রলীগ করে না তাদের ওপর আপনারা মামলা দেন না। তখন পিযুষ কেন ক্যাম্পাসে ঢুকলো। আপনারা তাকে ঢুকার অনুমতি দেন।’

তখন শিক্ষকরা এক সুরে বলেন, আমরা কোনো সময় অনুমতি দেই না।

এসময় ছাত্রলীগের আরেক নেতা বলেন, ‘ও রাজনীতি শিখছে কার কাছ থেকে? ওই যে পিযুষ, কার কাছ থেকে রাজনীতি শিখেছে। আপনারা জানেন?’

তখন প্রক্টর বলেন, ‘আরে বাবা পিযুষের চেয়ে বড় তোমরা।’

উত্তম বলেন, ‘পিযুষ …(লেখার অযোগ্য) পুলা আমরা হকলের সামনে আইয়া (এসে) হামলা করেছে। এর বদলা নিমু।’

পরে মামলার আশ্বাসে ছাত্রলীগ নেতাদের কাছ থেকে শিক্ষকরা উদ্ধার হন। এসময় শিক্ষকরা বলেন, ‘সব ভুল ধারণা।’

এদিকে ১৯ মের পর গত ৮ আগস্ট ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কর্মী রুহুল আমিন ও ১০ অক্টোবর সুবিদবাজারে অঞ্জন রায়কে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। ঘটনা দু’টির জন্যে ছাত্রশিবিরকে দায়ী করা হলেও এটা তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বলে সূত্র জানিয়েছে।

১৮ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যায় ফুটকোর্টের সামনে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) উত্তম-অঞ্জন গ্রুপের কর্মী সনি, মেহেদী, নজরুল, খলিলসহ কয়েকজন অন্তর্কোন্দলের জের ধরে নিজেদের মধ্যে মারামারিতে লিপ্ত হয়। এই সময় তাদেরকে থামাতে গেলে সহকারী প্রক্টর মিরাজুল ইসলামকেও তারা লাঞ্ছিত করে এবং তাদের আঘাতে মিরাজুল ইসলাম মাটিতে পড়ে যান ও তার পা কেটে যায়।

এর আগেও এদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো অভিযোগ ছিল। পরে ২১ অক্টোবর উত্তম-অঞ্জন গ্রুপের কর্মী ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল হক সনি, পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম ও একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী খলিলুর রহমানকে বহিষ্কার করে শাবি প্রশাসন।

এরপর গত ২৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে কুপিয়ে আহত করা হয় ছাত্রলীগ নেতা উত্তম কুমার দাসকে। এ ঘটনায় শিবিরের দিকে আঙ্গুল তোলা হলেও এটা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলেই ঘটেছে- এমনটাই ধারণা করা হয়।

গত ৯ নভেম্বর ছাত্রলীগ নেতা উত্তম কুমার দাসের অনুসারী ২০-২৫ জন কর্মী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহপরাণ হল ও সৈয়দ মুজতবা আলী হলে প্রবেশ করে ৭টি কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এসময় তারা ওইসব কক্ষে অবস্থানরত ছাত্রলীগ কর্মীদের অন্যত্র চলে যেতে হুমকি দেয়। ফলে তাদের দখলে চলে আসে হলগুলো।

মূলত সামগ্রিকভাবে এসব ঘটনার যোগসূত্রের জের ধরেই গত বৃহস্পতিবারে শাবিতে ছাত্রলীগের মধ্যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

উল্লেখ্য, ছাত্রলীগ নেতা উত্তম-অঞ্জনকে নিয়ন্ত্রণ করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বিধান কুমার সাহা। অন্যদিকে পার্থ-সবুজ গ্রুপকে নিয়ন্ত্রণ করেন সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক পীযুষ কান্তি দে। তবে পীযুষ একসময় বিধান কুমার সাহা গ্রুপের নেতা ছিলেন। আর ১৯ মের ঘটনার জন্য শায়েস্তা করতে গত ১ সেপ্টেম্বর মিসবাহ সিরাজ ও বিধানের ইশারাতেই পীযুষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ- এমন গুঞ্জন সিলেটে রয়েছে।

প্রায় একমাস জেল খাটার পর পীযুষ জামিনে মুক্ত হন। এরপর থেকে তিনি আবারও শাবির হল দখলের চেষ্টা চালান। আর এই উত্তম-অঞ্জন গ্রুপ এবং পীযুষ নিয়ন্ত্রিত পার্থ-সবুজ গ্রুপের মধ্যে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার ও হল দখলের রক্তাক্ত পরিণতি ঘটে গত বৃহস্পতিবার।






মন্তব্য চালু নেই