মেইন ম্যেনু

রেকর্ড ভাঙা শীতের আশঙ্কা

বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ক্রমাগত কমে আসা আর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কাছাকাছি আসায় উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় তীব্র শীতের আলামত দেখা যাচ্ছে। যদিও মাস দেড়েক আগেই এ অঞ্চলে হিমেল হাওয়ার সঙ্গে শীত নামতে শুরু করেছে।

বর্তমানে সন্ধ্যার পরপরই কুয়াশার চাদরে বন্দী হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ। বেড়ে গেছে শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব। এ অবস্থাকে ‘ডেঞ্জার’ উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, চলমান আবহাওয়ার পরিবর্তন না ঘটলে এবার শীতের তীব্রতা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলের পৌনে এক কোটি  হতদরিদ্র মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে প্রাণহানীর আশঙ্কার কথাও বলেছেন তারা।

রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, কার্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগত কাছাকাছি আসছে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। সেই সঙ্গে কমছে বাতসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও। ফলে বাড়ছে আর্দ্রতার শতকরা হার। চলতি নভেম্বরের প্রথম দিন থেকে তা আরও নাজুক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড মতে, রংপুর অঞ্চলে গত ৯ নভেম্বর তাপমাত্রা ছিল সর্বোচ্চ ৩২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ২০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতা ছিল শতকরা সর্বোচ্চ ৯৮ ও সর্বনিম্ন ৫০। এর আগের দিন ৮ নভেম্বর তাপমাত্রা ছিল সর্বোচ্চ ৩১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ১৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে বাতাসে আর্দ্রতা ছিল শতকরা সর্বোচ্চ ৯৮ ও সর্বনিম্ন ৫১ শতাংশ।

গত ৭ নভেম্বর সর্বোচ্চ তাপামাত্রা ছিল ৩১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপামাত্রা ছিল ১৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া বাতাসে আর্দ্রতা ছিল শতকরা সর্বোচ্চ ৯৫ ও সর্বনিম্ন ৪৭ শতাংশ। এর আগের দিন ৬ নভেম্বর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল শতকরা সর্বোচ্চ ৯৪ ও সর্বনিম্ন ৫০ শতাংশ।

সূত্রমতে, গত ৫ নভেম্বর সর্বোচ্চ তাপামাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর সর্বনিম্ন ২০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওইদিন বাতাসের আর্দ্রতা ছিল শতকরা সর্বোচ্চ ৯২ ও সর্বনিম্ন ৪৭ শতাংশ।

WINTER-pic01 উত্তরাঞ্চলে রেকর্ড ভাঙা শীতের আশঙ্কাগত ৪ নভেম্বর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ২০ দশমিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন বাতাসের আর্দ্রতা ছিল সর্বোচ্চ ৯৬ শতাংশও সর্বনিম্ন ৪৯ শতাংশ। এর আগের দিন ৩ নভেম্বর তাপমাত্রা সর্বোচ্চ রেকর্ড করা হয় ৩২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ২০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওদিন বাতাসে আর্দ্রতা ছিল শতকরা সর্বোচ্চ ৯৬ ও সর্বনিম্ন ৪৬ শতাংশ।

সূত্রমতে, গত ২ নভেম্বর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ১৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন বাতাসের আর্দ্রতা ছিল শতকরা সর্বোচ্চ ৮৯ ও সর্বনিম্ন ৪৭ শতাংশ। এর আগের দিন ১ নভেম্বর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর সর্বনিম্ন ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিনে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল শতকরা সর্বোচ্চ ৯৬ ও সর্বনিম্ন ৪৯ ভাগ।

আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড থেকে জানা যায়, গেল বছর ৯ নভেম্বর উত্তরাঞ্চলে সর্বোচ্চ তামপাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ২০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তারও আগে ২০১২ সালের ৯ নভেম্বর তাপমাত্র ছিল সর্বোচ্চ ৩০ দশমিক ২ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ১৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এ বছর ১ নভেম্বর থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত আর্দ্রতা রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে শতকরা ৭৫,৭৩,৭০,৭৯,৭৫,৭৬,৭১,৭২ এবং ৭২ ভাগ।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সর্বোচ্চ সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কাছাকাছি আসা এবং সন্ধ্যায় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবের কারণে এবার দেড়মাস আগেই এ অঞ্চলে শীতে এসে গেছে। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসের তৃতীয় সপ্তায় এ অঞ্চলে শীত শুরু হতে দেখা যায়। কিন্তু এবার কার্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহেই শীত এসেছে উত্তরাঞ্চলে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আতিকুর রহমান বাংলামেইলকে জানান, ‘এবার কার্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষ থেকেই রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কাছাকাছি আসা শুরু করেছে। ফলে শীত ও কুয়াশাও পড়া শুরু হয়েছে আগে থেকেই। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ক্রমাগত কমার কারণে শীত অনুভবের পাশাপাশি আগাম কুয়াশা পড়াও শুরু হয়েছে’।

আতিকুর রহমান আরো বলেন, ‘এবার এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়েছে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। আবহাওয়ার এ অবস্থার উন্নতি না হলে এবার তীব্রতর শীত পড়বে। যার পদধ্বনি ইতোমধ্যেই লক্ষ করা যাচ্ছে’।

Winter-pic03 উত্তরাঞ্চলে রেকর্ড ভাঙা শীতের আশঙ্কাসরেজমিনে পাওয়া তথ্য মতে, কার্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই হালকা হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করেছে এ অঞ্চলে। বাড়ছে শীতের তীব্রতা। মাগরিবের নামাজের আগেই বিস্তীর্ণ জনপদে দেখা যায় কুয়াশার চাদর। ফলে এ অঞ্চলের নগর বন্দর, পাড়া মহল্লার আড্ডাস্থলগুলো ক্রমেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মানুষ শীতের গড়ম কাপড় পরে চলাফেরা শুরু করে দিয়েছে। বাসাবাড়িতে লেপ, কাঁথা বের করা হয়েছে। ভোরবেলাতেও কুয়াশার কারণে অনেক পরিবহন হেড লাইট জ্বালিয়ে যাত্রা অব্যাহত রাখছে।

পীরগঞ্জের চণ্ডিপুর গ্রামের কৃষক সাহেব উদ্দিন(৭৫) জানান, ‘এবার গত বছরের চেয়েও ১৫ দিন আগে শীত এসেছে। মনে হয় এবার ঠাণ্ডায় মানুষের খুব অসুবিধা হবে।’

আগাম উদ্যোগ নেই: সরকারি হিসেবে এ অঞ্চলে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০ লাখ। তাদের সরকার ভিজিএফ ভিজিডিসহ নানা প্রকল্পের মাধ্যমে সহযোগিতা করে থাকে। কিন্তু এসব অতিদরিদ্র মানুষের শীত নিবারণের জন্য গরম কাপড় কেনার তেমন একটা সামর্থ থাকে না। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার দেয়া শীত বস্ত্রই তাদের ভরসা হয়ে দাঁড়ায় ফি বছর।

অন্যদিকে, সেন্টার ফর স্ট্যাটিক্সটিক্স অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (সিএসডি) নামের একটি সংগঠন তাদের জরিপে বলেছে, উত্তরের ১৬ জেলায় সাড়ে ৮ হাজার বস্তিসহ প্রায় পৌনে এককোটি অতিদরিদ্র মানুষের বসবাস। প্রতি বছরই শীতে তাদের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ে। চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েন তারা। দেখা দেয় মানবিক বিপর্যয়। প্রতি বছরই এ অঞ্চলে শীতের তীব্রতায় প্রাণহানির ঘটনা দেশে বিদেশের প্রেস ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার ব্রেকিং নিউজে স্থান পায়। এবার এ অবস্থা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে বলা হলেও সরকারি ও বেসরকারিভাবে আগাম কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য: ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসোর্স ইনস্টিটিউট (ইরি) বাংলাদেশ-এর কনসালটেন্ট ড. এমজি নিয়োগী বাংলামেইলকে জানান, জলবায়ু পরিনবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে এবার দেড় মাস আগেই শীত এসেছে উত্তরাঞ্চলে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে শীতের তীব্রতা বাড়বে বহুগুণ। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতেও পারে। এ অবস্থার স্থায়ী সমাধানে কোনো সরকারই আগাম উদ্যোগ গ্রহণ করেন না। ফলে শীতের সময় জোড়াতালি দিয়ে সরকারি ভাবে প্রয়োজনের তুলনায় যৎ সামান্য সহযোগিতা করা হয়।
ড. এমজি নিয়োগী আরো বলেন, এখনই শীত মওসুমকে অগ্রাধিকার দিয়ে উত্তরাঞ্চলের জন্য সরকার পৃথক কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ না করলে এ পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ দীর্ঘদিন থেকে অতি দরিদ্র মানুষ, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর ওপর গবেষণা করেছেন। তিনি কে জানান, ‘এবার এ অঞ্চলে অনেক আগে থেকেই শীত নেমেছে। কিন্তু সরকারি তরফে শীত প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানার পর উদ্যোগ নেয়া হয়। তাও প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ফলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয় অতি দরিদ্র পরিবারগুলোতে। প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটে। এজন্য তিনি সরকারকে এখনই শীত মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতির পরামর্শ দিয়েছেন সরকারকে’।

winter-pic040 উত্তরাঞ্চলে রেকর্ড ভাঙা শীতের আশঙ্কাউত্তরাঞ্চলের জেলা প্রশাসক অফিস সূত্রগুলো জানায়, এখন পর্যন্ত এ অঞ্চলের ডিসি অফিসগুলো শীত মোকাবেলায় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এটা তাদের এখনও মাথাতেই আসেনি। কম্বল কিংবা শীতের কাপড় চেয়ে উপরে কোনো আবেদন করেন নি।
জেলাগুলোর ত্রাণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর শীতের মওসুমে এ অঞ্চলে সরকারিভাবে কম্বল বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ৭২ হাজার। কিন্তু তা দিয়ে শীত মোকাবেলা করতে না পারায় ডেপুটি কমিশনাররা প্রতি জেলায় ৩০ হাজার করে মোট সাড়ে ৪ লাখ ৮০ হাজার শীত বস্ত্রের চাহিদা দিয়ে দফায় দফায় ফ্যাক্সবার্তা পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু পরে যৎসামান্যই পাওয়া গেছে।

রংপুরের জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা আব্দুস সালাম কে জানান, ‘চলতি শীত মওসুমে এখন পর্যন্ত সরকার কোনো বরাদ্দ দেয় নি। আমরাও কোনো চাহিদাপত্র পাঠাইনি। পরিস্থিতি বুঝে তারপর চাহিদাপত্র পাঠানো হবে।’

শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব: রংপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শীতের তীব্রতা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলে শীত জনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল ছাড়াও জেলা ও উপজেলা সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বেসরকারি ক্লিনিক এবং লোকালয়ের হাতুড়ে ও পল্লী চিকিৎসকদের চেম্বারেও রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে ৭০ ভাগই নিউমোনিয়া, সর্দি, কাঁশি, শ্বাসকষ্টের রোগী। এদের মধ্যে আবার শতকরা ৮০ ভাগই বৃদ্ধ ও শিশু।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দুল কাদের খান  জানান, শীত আগাম আসায় এ অঞ্চলে নিউমোনিয়া, জ্বর, সর্দি কাঁশিসহ শীত জনিত রোগের মাত্রা বাড়া শুরু হয়েছে। এমন রোগীর সংখ্যা হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে।






মন্তব্য চালু নেই