মেইন ম্যেনু

বিমানের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ পাঁচজনের স্বীকারোক্তি

‘রাঘব বোয়ালদের’ ছত্রছায়ায় সোনা চোরাচালান

হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বেশ কিছু প্রভাবশালী ‘রাঘব বোয়াল’। তাদের ছত্রছায়ায় বিমানের কর্মকর্তা, কর্মচারীরা সক্রিয় হয়েছে সোনা চোরাচালানে। বাংলাদেশ বিমানের চার শীর্ষ কর্মকর্তাসহ পাঁচজন আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এমন তথ্য দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তারা সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের নাম ফাঁস করে দিয়েছেন। বিমানবন্দরে মুদ্রা পাচারের সঙ্গে জড়িত অনেকের নামও প্রকাশ পেয়েছে পাঁচজনের স্বীকারোক্তিতে।

আদালত ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ নভেম্বর তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তারা কৌশলে সোনা চোরাচালানের সঙ্গে নিজেরা জড়িত নন বলে দাবি করেছেন। প্রত্যেকেই অপরকে জড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

ঢাকা মহানগর পলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পাঁচ শীর্ষ চোরাকারবারির জবানবন্দি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যাদের নাম এসেছে তাদের গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তারা গ্রেপ্তার হলে সোনা ও মুদ্রা পাচারের সঙ্গে আর কারা জড়িত আছেন তা জানা যাবে।’

সূত্র জানায়, গত ১৮ নভেম্বর রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিমানের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এমদাদ হোসেন, ফ্লাইট ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মাদ আসলাম শহীদ, শিডিউল ইনচার্জ তোজাম্মেল হোসেন, বিমানের ঠিকাদার মাহমুদুল হক পলাশ এবং উত্তরার ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক হারুন অর রশিদকে  সোনা চোরাচালান মামলায় গ্রেপ্তার করে ডিবি।

এর আগে ১২ নভেম্বর বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে সোনা উদ্ধারের পর মাজহারুল আফসার নামের একজন কেবিন ক্রুকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে বের হয়ে আসে সোনা পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য। তাদের গ্রেপ্তারের পর বেকায়দায় পড়ে যান বাংলাদেশ বিমানের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দিন আহম্মেদ। বিশেষ করে সোনা পাচারকারীদের মধ্যে অন্যতম মাহমুদুল হক পলাশ পুলিশকে জানিয়েছেন, বিমান চেয়ারম্যানের ধর্মপুত্র তিনি। পুলিশও নিশ্চিত হয়েছে, চেয়ারম্যানকে ব্যবহার করে পলাশ কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। তিনি একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে দেদারসে পাচার করেছেন সোনার চালান। আর তার সঙ্গে আঁতাত করেছেন বিমানের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পাইলট, বিমান ক্রু, সিভিল এভিয়েশনের কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী।

রিমান্ড শেষে এমদাদ হোসেন, আসলাম শহীদ, তোজাম্মেল হোসেন, পলাশ ও হারুন অর রশীদকে আদালতে পাঠানোর পর তারা ১৬৪ ধারা স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেন। পরে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

আদালত ও পুলিশ সূত্র জানায়, বিমান কর্মকর্তাসহ পাঁচ আসামি অনেকের নাম প্রকাশ করে বলেছেন, তাদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরেই সোনা পাচার হচ্ছে। মুদ্রা পাচারের সঙ্গেও এই সিন্ডিকেট জড়িত বলেও আদালতকে জানান কেউ কেউ।

জানতে চাইলে ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘গত ২৪ নভেম্বর গ্রেপ্তার করা বিমান কর্মকর্তাসহ পাঁচ আসামি স্বেচ্ছায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তারা যাদের নাম বলেছেন সে ব্যাপারে তদন্ত চলছে। সোনা পাচারে জড়িতরা যত বড় শক্তিশালী হোক না কেন তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই।

বিমানের ডিজিএম এমদাদ হোসেন: এমদাদ হোসেনের বাবার নাম হাজী আমির উদ্দিন আকন্দ। গ্রামের বাড়ি ঢাকার দোহার। তিনি আদালতকে জানান, ৩৬ বছর আগে তিনি বাংলাদেশ বিমানে যোগদান করেন। ২০০৫ সালে ম্যানেজার ফ্লাইট সার্ভিস হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ২০০৭ সালে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে তিনি রিট আবেদন করেন। হাইকোর্টের নির্দেশে ২০০৮ সালে পুনরায় স্বপদে ফিরে আসেন।

তিনি বলেন, ‘২০১০ সালে মাহমুদুল হক পলাশ হজ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য কাবো এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ বিমানের কাছে লিজ দেন। ওই সময় তিনি দেশে কাবোর প্রতিনিধি হয়ে কাজ করতেন। আস্তে আস্তে নিজেকে বিমানের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দিনের এলাকার লোক পরিচয় দিয়ে বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। শুরু করেন নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং তার ঘনিষ্ঠ লোকদের মধ্যপ্রাচ্যসহ পছন্দমতো ফ্লাইটে ডিউটি দেয়া। আর বর্তমান চিফ শিডিউলার ক্যাপ্টেন শহীদের সঙ্গে তিনি মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এ সম্পর্কের ভিত্তিতে শিডিউল বিভাগের আবদুল মতিন, শাহ আলম মিরন, সরোয়ার এবং নাসিরের সঙ্গে লেনদেনের ভিত্তিতে শিডিউল ম্যানেজ করে দিতেন। পলাশের স্ত্রী নুরজাহান, বিমান কর্মী রিমি আক্তার, রাসেল, রাজ, লিপি, মাসুদ, শফি, জেনি, নাহিদ, হোসনে আরা, কসমিক, শামা, শ্রাবণী, জুয়েলসহ অনেকে সোনা-মুদ্রা চোরাচালানের সিন্ডিকেট গড়ে তোলে বলে তিনি শুনেছেন।  তাদের নেতা ছিলেন মাহমুদুল হক পলাশ। তবে সোনা চোরাচালানের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না দাবি করে বলেন, পলাশের সঙ্গে তার কোনো লেনদেন হতো না।

মাহমুদুল হক পলাশ : বিমান চেয়ারম্যানের ধর্মপুত্র পরিচয় দিয়ে তিনি ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি বিমানের বিভিন্ন শাখায় তার অবাধ যাতায়াত, স্ত্রী কেবিন ক্রু নুরজাহানের মাধ্যমে অন্য ক্রুদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে বিমানে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি আদালতে বলেছেন, পাইলট হিসেবে লাইসেন্স নিতেই তিনি বিমানে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সার্টিফিকেট ভুয়া ও জাল থাকায় পাইলট লাইসেন্স দেয়নি সিভিল এভিয়েশন। এরপর থেকে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।
বিমানের চেয়ারম্যানের বাড়ি কুমিল্লায়। তার বাড়িও কুমিল্লায়। সেই সুবাদে চেয়ারম্যান ও তার ছেলে ফ্লাইট ক্যাপ্টেন যুবায়েরের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে। ফ্লাইট ক্যাপ্টেন যুবায়ের ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে কাজ করেন। যুবায়ের তার ঘনিষ্ট বন্ধু। বিমানের চেয়ানম্যানকে তিনি বাবা বলে ডাকতেন। যখন-তখন চেয়ারম্যানের কক্ষে চলে যেতেন। তবে তিনি বিমানে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করেননি। বিমানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার সঙ্গে বিমানের চেয়ারম্যানের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। মাঝে মধ্যে ঠিকাদারি ব্যবসায় ঝামেলা হলে চেয়ারম্যানের সহায়তা নেয়া হত।

আদালতকে তিনি আরো জানিয়েছেন, প্রায় ৫ বছর ধরে বিমানে ঠিকাদারি করে আসছেন তিনি। সোনা পাচারের সঙ্গে বিমানের অনেক কর্মকর্তা, কর্মচারী, পাইলটসহ অন্যান্যা সংস্থার লোকজন জড়িত আছে। বেশিরভাগ সোনা ভারতে পাচার করা হতো। ওই দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকতো। সোনা পাচারের আগে বিমানের সিডিউল ঠিক করতেন ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ। তার পছন্দের ক্রুদের বাছাই করে বিভিন্ন ফ্লাইটে সোনার চালান আনা হতো। পলাশ স্বীকার করেছেন, পাচারের ত্রিশ ভাগ সোনা উদ্ধার হয়। বাকি সোনার হদিস পাওয়া যায় না।

শিডিউলিং ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ: জবাবনবন্দির শুরুতেই তিনি নিজেকে নির্দোশ দাবি করেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে বিমানে চাকরি করেন বলে জানান তিনি। ওই সময়ে তিনি কখনো অবৈধ কাজে লিপ্ত ছিলেন না। শুরু থেকে কেবিন ক্রুদের শিডিউলিং নিয়ন্ত্রিত হতো ফ্লাইট সার্ভিস ডিরেক্টর থেকে। ২০১৩ সালের মে মাসে ক্যাপ্টেন ইসরাত, ডিরেক্টর ফ্লাইট অপারেশনে থাকা অবস্থায় প্রশাসনিক আদেশ দ্বারা কেবিন ক্রুদের শিডিউল ফ্লাইট অপারেশনের অধীনে আনে। মূলত ক্যাপ্টেন ইশরাত এবং বর্তমানে ডেপুটি চিফ অফ ট্রেনিং নজরুল শামীমের প্রচেষ্টায় এই কাজ হয়। ক্যাপ্টেন ইসরাত ফ্লাইট অপারেশন ডিরেক্টর থাকা অবস্থায় ককপিট ও ক্যাবিন ক্রুদের সিডিউলিং তার একক নিয়ন্ত্রণে যায়। এভাবে তিনি প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ কার্যকলাপের চক্র গড়ে তোলেন।

আসলাম শহীদ আদালতে আরো জানান, দশ থেকে এগার বছর আগে মাহমুদুল হক পলাশের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। পলাশের অনুরোধে তার স্ত্রী নুরজাহানকে জেদ্দা ফ্লাইটে দেয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। গত বছরের মে মাসে বিমানের সাবেক এমডি কেভিন স্টিলের নির্দেশে পরিচালক প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী কেবিন ক্রু, ককপিট ক্রু ও এয়ারক্রাফট শিডিউলিং একটি বিভাগের আওতায় আনা হয়। ক্যাপ্টেন ইশরাতকে শিডিউল বিভাগ থেকে সরিয়ে দেয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। পলাশ নানা অপকর্ম করে আসছে বলে তিনি আগে থেকেই জানতেন। পলাশ সোনা চোরাচালানে অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বিমানবন্দরে। তার স্ত্রী নুরজাহানও একই কাজ করে আসছেন বলে তথ্য রয়েছে।

মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী হারুন অর রশীদ: হারুন অর রশীদের বাবার নাম মৃত আজাহার আলী। গ্রামের বাড়ি বরিশাল। ২০০২ সালে উত্তরা এইচএ প্লাজায় ফারহান মানি এক্সচেঞ্জ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। সেই সুবাদে বিমানের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিমান ক্রুদের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। অনেকে তার প্রতিষ্ঠান থেকে বিদেশি মুদ্রা কেনাবেচা করতেন। তাদের মধ্যে রাসেল, রাজ, নিশি, বীথি, আরিয়ান, শ্রাবণীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হওয়ার সুবাধে তিনি জানতে পারেন, বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ অনেক ক্রু সোনা ও মুদ্রা পাচারে জড়িত। এদের মধ্যে ডিজিএম এমদাদ, ম্যানেজার তোজাম্মেল, শিডিউলার মতিন, সারোয়ার ও নাসির আর ঠিকাদার পলাশ এ সিন্ডিকেটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সোনা ও মুদ্রা পাচারের সঙ্গে উত্তরা এসবি প্লাজার রামাদা মানি এক্সচেঞ্জের এখলাস কাজী বাবু ও সাইদুর রহমান, উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের সাঈদ গ্র্যান্ড সেন্টারের আনন্দ মানি এক্সচেঞ্জের মেহেদী হাসান ও বিমান ক্রু রিটন, উত্তরা কুশল সেন্টারের আলামিন মানি এক্সচেঞ্জের সুমন, ধানমন্ডির প্রাইম ফরেন মানি এক্সচেঞ্জের শরীফ মাসুম বিল্লাহ জড়িত। বিমান ক্রুদের মাধ্যমে মানি এক্সচেঞ্জগুলো সোনা ও মুদ্রা চোরাচালান করে আসছে বলে আদালতকে জানান হারুন অর রশীদ।

ব্যবস্থাপক (শিডিউলিং) তোজাম্মেল হোসেন: প্রায় ৩০ বছর ধরে বিমানে চাকরি করে আসছেন বলে আদালতকে জানান তোজাম্মেল হোসেন। তিনি বলেন, বিমানের শিডিউলিংয়ের কারণে অনেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। প্রায় তিন বছর আগে ঠিকাদার পলাশের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ঠিকাদারের আড়ালে তিনি সোনা পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এ কথা তিনি আগে জানতেন না।

তিনি আদালতে আরও বলেন, ২০১৩ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কেবিন ক্রুদের শিডিউলিং কাস্টমার সার্ভিস বিভাগ থেকে পরিচালক, অপারেশনের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। ক্যাপ্টেন শহীদ, ম্যানেজার শাহ আলম মিরন, শিডিউল বিভাগের কর্মকর্তা আবদুল মতিন, সারায়ার, নাসির, হাই সিদ্দিকী সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত আছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাদেরকে মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন পলাশ।






মন্তব্য চালু নেই