মেইন ম্যেনু

যেভাবে বাড়ছে টাকা পাচার

বেড়েই চলছে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচারের পরিমাণ। এক বছরের ব্যবধানে এর পরিমাণ তিন গুণ বেড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ না থাকা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণেই ব্যক্তিবিনিয়োগ উৎসাহিত হচ্ছে না। আর কীভাবে এই পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে তা চিহ্নিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের সমন্বয় নেই। এ কারণে অর্থ পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন দেশের প্রবীণ অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, হুন্ডি, রপ্তানিক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং (কম মূল্য দেখানো) ও আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিংয়ের (বেশি মূল্য দেখানো) মাধ্যমে দেশের টাকা পাচার করা হচ্ছে। কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন ও তাদের অনুসারী ব্যবসায়ীরা অর্থ পাচারে জড়িত থাকেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

উল্লেখ্য, ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) অর্থ পাচার বিষয়ে মঙ্গলবার প্রকাশিত রিপোর্টে উঠে এসেছে, ২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে ১৭৮ কোটি ডলার পাচার হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১১ সালে পাচার হয়েছিল ৫৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৪ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা।

দেশে থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের কারণ জানতে চাইলে প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এম সাইদুজ্জামান বলেন, অসাধু অর্থের মালিকরা হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ পাচার করে আসছেন। রপ্তানিক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং ও আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দেশের টাকা পাচার হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

অর্থ পাচারের প্রবণতা বন্ধে দেশে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যক্তিবিনিয়োগ বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক আমদানি পণ্যের ওপর গভীর নজরদারির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের কাজের সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও তাগিদ দেন প্রাক্তন এই অর্থমন্ত্রী।

জিএফআই প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১২ সালে পাচার হওয়া অর্থ বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেটের চেয়েও বেশি বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেকেই দেশের বাইরে অর্থ পাচার করেন। আবার কর ফাঁকি দিতেও বিদেশের ব্যাংকে গোপনে টাকা রাখেন। ক্ষমতাসীনরাই এসব কাজে জড়িত থাকেন।’

মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়ে থাকতে পারে। কারণ রাজনৈতিকসহ নানা কারণে গত বছরগুলোতে দেশে তেমন বিনিয়োগ হয়নি। বাড়েনি শিল্প উৎপাদনও। তবু বেড়েছে শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি। অথচ দেশে বিনিয়োগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন এই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ।

অর্থ পাচারের এই প্রবণতা প্রতিরোধে মানি লন্ডারিং আইনের শক্ত প্রয়োগ এবং তা আরো যুগোপযোগী করাসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার তাগিদ দেন এই প্রবীণ দুই অর্থনীতিবদ।

এ ছাড়া, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মূলধনি যন্ত্রপাতি ও খাদ্যপণ্য আমদানিতে কোনো শুল্ক নেই। কাজেই এসব পণ্য আমদানিতে বাড়তি মূল্য দেখিয়ে টাকা পাচার হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। আবার রপ্তানির অর্থ পুরোটা সঠিকভাবে দেশে না এনে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার সুযোগ আছে। এটাও টাকা পাচার। জিএফআই যে ট্রেড মিস-ইনভয়েসিংয়ের কথা বলেছে, তা যথেষ্ট যৌক্তিক।

প্রসঙ্গত, মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ : ২০০৩-১২’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে মঙ্গলবার এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। জিএফআই অর্থ পাচারের হিসাব নির্ণয় করে থাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে।

জিএফআই রিপোর্টে যা বলা হয়েছে
২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ১৩ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা (১৭৮ কোটি ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে। আগের বছর ২০১১ সালে পাচার হয়েছিল ৪ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা (৬০ কোটি ডলার)। এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে টাকা পাচার তিন গুণ বেড়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় অর্থ পাচার বাড়ে। এ কারণেই ২০০৫ ও ২০০৬ সালে অর্থ পাচার বেড়েছে। এই প্রবণতা রাজনীতিকদের মধ্যে বেশি। কারণ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অর্থের পাহাড় গড়ার পর তারা সরকার পরিবর্তনের আশঙ্কায় টাকা পাচার করেন। অনেক শিল্পপতি ও বড় ব্যবসায়ীও নিজেদের পরিবার এবং সন্তানদের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার জন্য বিভিন্নভাবে অর্থ পাচার করছেন। তাদের ধারণা, তারা যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন, তাদের ছেলেমেয়েরা তা পারবে না।

এর আগে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে ২০০২-২০১১ সালের টাকা পাচারের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল জিএফআই । বর্তমান প্রতিবেদনটি সেটিরই হালনাগাদ রূপ। হিসাবে কিছুটা সংশোধন হওয়ায় গতবারের চেয়ে এবারের হিসাবে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের পরিমাণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা গেছে।

গতবারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২৮০ কোটি ডলার পাচার হয়েছিল। এবার হালনাগাদ হিসাবে ৬০ কোটি ডলার দেখানো হয়েছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে পাচার হয় ৬৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। গতবারের হিসাবে ছিল ২১৯ কোটি ডলার। আর ২০০৯ সালে পাচার হয়েছে ১০৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আগের হিসাবে ছিল ১৪০ কোটি ৬০ লাখ ডলার। তবে ২০০৫ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত টাকা পাচারের তথ্যে গতবারের প্রাক্কলনের সঙ্গে নতুন প্রাক্কলনে খুব বড় পার্থক্য নেই।

জিএফআইয়ের যোগাযোগ পরিচালক ক্লার্ক গাসকোয়ান জানান, জিএফআই অর্থ পাচারের হিসাব নির্ণয় করে থাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে। আইএমএফ নিয়মিতই এসব পরিসংখ্যান সংশোধন ও হালনাগাদ করে। ফলে জিএফআইকেও হালনাগাদ পরিসংখ্যান ধরে অর্থ পাচারের প্রাক্কলন করতে হয়। আর তাই এক বছরের ব্যবধানে সর্বশেষ চার বছরের পাচার হয়ে যাওয়া টাকার পরিমাণে অনেক পার্থক্য দেখা দিয়েছে। তবে পুরোটাই রক্ষণশীল হিসাব। পাচার করা অর্থের প্রকৃত পরিমাণ আরো বেশি হবে।

জিএফআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভ কার ও অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্পানজারস উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে টাকা পাচারের হিসাব নির্ণয় করেছেন। তারা বিভিন্ন দেশের লেনদেনের ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেছেন। এসব পরিসংখ্যান নেওয়া হয়েছে আইএমএফের কাছ থেকে। ডেভ কার এর আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থনীতিবিদ ছিলেন।

নতুন প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে অন্তত ১ হাজার ৩১৬ কোটি ডলার (১ লাখ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। তার মানে এই সময়ে গড়ে প্রতিবছর পাচার হয়েছে ১৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

এক দশকে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০০৬ সালে। এর পরিমাণ ২৬৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ২০ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। ২০০৭ সালে পাচার হয় ২৪৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ১৮ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা।

জিএফআই বলছে, ২০০৩-২০১২ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অন্তত ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার পাচার হয়েছে। শুধু ২০১২ সালেই পাচার হয়েছে ৯৯ হাজার ১২০ কোটি ডলার। এটি আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি।

জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৩-২০১২ সময়কালে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে চীন থেকে। এর পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি ডলার। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রাশিয়া। রাশিয়া থেকে পাচার হয়েছে ৯৭ হাজার ৩৮৬ কোটি ডলার। তৃতীয় স্থানে থাকা মেক্সিকো থেকে পাচার হয়েছে ৫১ হাজার ৫২৬ কোটি ডলার। পঞ্চম স্থান অধিকারী ভারত থেকে ৪৩ হাজার ৯৪৯ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। পঞ্চম স্থানে থাকা মালয়েশিয়া থেকে পাচার হয়েছে ৩৯ হাজার ৪৮৭ কোটি ডলার।
অবশ্য, গত নভেম্বর মাসে সেকেন্ড হোম বা দ্বিতীয় আবাস গড়ার নামে বিদেশে অর্থপাচারকারী ৬৪৮ ব্যক্তির নামের তালিকা করে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য সেকেন্ড হোম প্রকল্পে নতুন করে আবেদন করেছিলেন ৬৪৮ জন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৮৭ জন, বিএনপি-জামায়াতের ৯৬ জন এবং অবশিষ্ট ২৬৫ জন সুবিধাভোগী শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও আমলা। তাদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে মালয়েশিয়া। এর পরই রয়েছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ। এ দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে বিনিয়োগকারী উদ্যোক্তা ও স্বকর্মসংস্থান কোটায় সহজেই ভিসা দিচ্ছে।

এ তালিকার ব্যক্তিরা নানাভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। যারা গত পাঁচ বছরে অন্তত ৪ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করেছেন। ওই অভিযোগ আমলে নিয়ে কয়েক দিন আগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

সেকেন্ড হোম প্রকল্প বর্তমানে মালয়েশিয়ায় চালু রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে অনেক বিত্তশালী বাড়ি বানিয়েছেন বা বাড়ি বানানোর আবেদন করেছেন, এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। প্রাথমিকভাবে মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা ও কাতার দূতাবাসের মাধ্যমে সেসব দেশে সেকেন্ড হোম নির্মাণকারীদের তথ্য চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে আরো জানা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার উদ্দেশ্য নিয়েই এ ধরনের তৎপরতা শুরু হয়। নেপথ্যের মূল কারণ হলো কালো টাকা বিদেশে পাচার করা। অর্থ পাচারের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো মানি চেঞ্জার। ঢাকায় টাকা ডলারে রূপান্তরিত করার পর একই মানি চেঞ্জারের একটি নির্দিষ্ট শাখা থেকে ডলারের পরিবর্তে ওই দেশীয় মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়। আইনগত পদ্ধতিতে এ ধরনের লেনদেনের সুযোগ নেই। যা হচ্ছে তা বেআইনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ পাচার নিয়ে গবেষণা করে থাকে গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি বা জিএফআই।






মন্তব্য চালু নেই