মেইন ম্যেনু

পার্বতীপুরে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবহান ১৮ বছর ধরে বসবাস গাছের নিচে

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবহান (৬৬)। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও মাথা গোঁজার জন্য একখন্ড জমি পাননি। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে রেললাইনের ধারে গাছের নিচে ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেল স্টেশন থেকে আড়াইশ মিটার উত্তরে ৩ নম্বর লেভেল ক্রসিং পার হয়ে পার্বতীপুর-সৈয়দপুর রেল লাইনের পশ্চিম পাশে এবং বধ্যভূমি-গণকবর স্মৃতিস্তম্ভের পূর্বধার ঘেঁষে একটি বটগাছ রয়েছে। এই বটগাছের নিচে বাঁশের চাটাইয়ের সঙ্গে পলিথিন দিয়ে চারপাশ ঘেরা এবং ওপরে টিনের ছাউনি দেয়া ৬ ফুট দীর্ঘ, ৫ ফুট প্রস্থ ও ৫ ফুট উচ্চতার ছোট্ট ঝুপড়ি ঘর। ঝুপড়ির মধ্যে একটি চৌকি ছাড়া কোনো আসবাবপত্র নেই। এই ঝুপড়ি ঘরেই বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবহান ও তার স্ত্রী জমিলা (৫০) ১৯৯৬ সাল থেকে বসবাস করছেন। ঝুপড়ির বারান্দায় চলে রান্নার কাজ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পার্বতীপুর বধ্যভূমি ও গণকবর স্মৃতিস্তম্ভের ছবি তুলতে গিয়ে সন্ধান মেলে আব্দুস সোবানের। ঝুপড়িতে কথা হয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবহান ও তার স্ত্রী জমিলার সঙ্গে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জীবনের মায়া ত্যাগ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে আব্দুস সোবহান অস্ত্র হাতে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তার এফএফ নম্বর-৪০৭৯, মুক্তি বার্তা নং ০৩০৮০৮০২২২। আব্দুস সোবানের পৈতৃক নিবাস শহরের পুরাতন বাজারে। ১৯৭৩ সালে অভাবের কারণে পৈতৃক ভিটা বিক্রি করে দিয়ে তিনি যাযাবর জীবনযাপন করতে থাকেন। এক সময় পুরাতন বাজার কবরস্থানের জায়গায় থাকতেন। ১৯৯৬ সাল থেকে নিঃসস্তান এই দম্পতি বধ্যভূমির পাশে ঝুপড়ির মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এরপর একে একে সেখানে ছিন্নমূল মানুষের ৩০টির মতো ঝুপড়ি গড়ে ওঠে।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবহান বলেন, ২০০৩ সালে বধ্যভূমি ও গণকবর স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের সময় সে সময়ের দিনাজপুর জেলা প্রশাসক আব্দুস সাত্তার পার্বতীপুর রেল হেড অয়েল ডিপো-সংলগ্ন আমেরিকান ক্যাম্প এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করে তাকেসহ সেখানে বসবাসকারী ৩০টি ছিন্নমূল পরিবারকে পুনর্বাসন করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তা ছাড়া একই বছর পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কল্লোাল কুমার চক্রবর্তী বধ্যভূমি এলাকায় মহিলা কলেজের কাছে তাকে বাড়ি নির্মাণ করে দিতে চেয়ে ছিলেন। কিন্তু কল্লোল কুমার চক্রবর্তী বদলি হয়ে যাওয়ায় সে সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে পার্বতীপুর উপজেলা প্রশাসন আর তার কোনো খোঁজ খবর নেয়নি। তিনি বলেন, সরকার থেকে ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি নির্মাণ করে দিয়ে পুনর্বাসন করা হচ্ছে- এ কথা লোকমুখে শুনে তিনি পার্বতীপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কাছে যান। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড থেকে তাকে বলা হয়, নিজের ৪ শতক জায়গা থাকলে সেখানে সরকার বাড়ি নির্মাণ করে দেবে। কিন্তু ৪ শতক জমি তিনি কোথায় পাবেন। তার একমাত্র সম্বল মুক্তিযোদ্ধা ভাতার ৫ হাজার টাকা। যা দিয়ে অতিকষ্টে তিনি জীবিকা নির্বাহ করছেন। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হলো। অনেকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও তার মাথা গোঁজার নিরাপদ ঠাঁই হলো না।

এ বিষয়ে পার্বতীপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ডেপুটি কমান্ডার ছিদ্দিক হোসেন বলেন, আব্দুস সোবহানকে পুনর্বাসনের জন্য উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে অনেক আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে নেশাদ্রব্য খেয়ে সব টাকা উড়িয়ে গাছতলায় শুয়ে শুয়ে ঘুমালে কার করার কী আছে?

এ ব্যাপারে পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট রাহেনুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবহান গাছতলায় বসবাস করেন তা তার জানার পরও। কিন্তু আব্দুস সোবহানের খোঁজখবর নেয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনের লোক পাঠানোর প্রয়োজন মনে করলেন না। তিনি আরো বলেন, সে আজ পর্যন্ত ইউএনও ও এসিল্যান্ড অফিসে কোন আবেদন করেনি। তাহলে সে কিভাবে পাবে।






মন্তব্য চালু নেই